সরকার ও ব্যবসায়ীদের ধারাবাহিক আশ্বাসের মধ্যেও দেশের বাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সংকট কাটেনি। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় এখনও এলপি গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও সিলিন্ডার মিলছে না। পাওয়া গেলেও এক হাজার ৩০৫ টাকার ১২ কেজি এলপিজি কিনতে হচ্ছে দুই হাজার ২০০ থেকে দুই হাজার ৬০০ টাকায়। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ব্যয় চাপে পড়েছে। তবে সরকার রমজান সামনে রেখে তিন লাখ ৫১ হাজার ৭০০ টন এলপিজি আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে গ্রাহক ভোগান্তি শিগগির কমে যাওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশের (লোয়াব) হিসাবে, বর্তমানে মোট এলপিজি চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশই ব্যবহৃত হচ্ছে শিল্পে।
বিইআরসির তথ্যমতে, দেশে এলপিজি ব্যবসার লাইসেন্স রয়েছে ৫২টি প্রতিষ্ঠানের। এর মধ্যে ৩২টির নিজস্ব সিলিন্ডার প্লান্ট রয়েছে। আমদানির সক্ষমতা আছে ২৩ প্রতিষ্ঠানের। এলপিজি ব্যবসার প্রতিটি ধাপেই সরকারের অনুমোদন দরকার হয়।
দেশে এলপিজি আমদানি হয় চট্টগ্রাম বন্দর, মোংলা বন্দর ও সীতাকুণ্ডের জেটি দিয়ে। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত সাড়ে ছয় মাসে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছে ১০ লাখ ৮৩ হাজার টন। এ আমদানি করেছে ১৬টি প্রতিষ্ঠান। অন্যরা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান থেকে এলপিজি কিনে সিলিন্ডারে ভরে বাজারে বিক্রি করে।
এদিকে, আসন্ন রমজানে ভোগান্তি কমাতে বিপুল পরিমাণ এলপিজি আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
২০২৬ সালে ১২টি প্রতিষ্ঠান জানুয়ারিতে এক লাখ ৬৭ হাজার ৬০০ টন এলপিজি আমদানি করবে। এসব প্রতিষ্ঠান হলো– নাভানা এলপিজি লিমিটেড, টিএমএসএস এলপিজি লিমিটেড, এসকেএস এলপিজি, বিএন এনার্জি (বিডি) লিমিটেড, পেট্রোম্যাক্স এলপিজি লিমিটেড, জেএমআই ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্যাস লিমিটেড, ওমেরা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড, যমুনা স্পেকটেক জয়েন্ট ভেঞ্চার লিমিটেড, লাফ্স গ্যাস লিমিটেড, ডেলটা এলপিজি লিমিটেড, ইউনাইটেড আইগ্যাজ এলপিজি লিমিটেড এবং মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি লিমিটেড। এসব কোম্পানি আসছে ফেব্রুয়ারিতে আমদানি করবে এক লাখ ৮৪ হাজার ১০০ টন এলপিজি।
নীতি–সহায়তা না বাড়লে খরচ কমবে না
বাংলাদেশে এলপিজির ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশই আমদানিনির্ভর। আর বেসরকারি খাতই মূলত এলপিজি আমদানি করে। সর্বশেষ ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে এলপি গ্যাস আমদানি হয় ১৭ লাখ ৫৪ হাজার টন। এ সময় সরকারি খাতে এলপিজির সরবরাহ ছিল ১৯ হাজার ৪৭৯ টন, অর্থাৎ সরকারি খাতে বাজার অংশীদারি ১ শতাংশ। এর বাইরে তিনটি বেসরকারি রিফাইনারিতে উৎপাদিত এলপি গ্যাস বাজারে সরবরাহ করা হয়।
খাত–সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেসরকারি খাতের কোম্পানিগুলো ছোট জাহাজে করে মধ্যপ্রাচ্য, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলপিজি আমদানি করে। এতে পরিবহন ব্যয় বেশি পড়ে।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি আমিরুল হক বলেন, বড় জাহাজে এলপিজি আনা গেলে টনপ্রতি ২০–২৫ ডলার সাশ্রয় হবে। ভোক্তারাও সুফল পাবেন। এ জন্য বেসরকারি খাতে টার্মিনাল তৈরির জন্য নীতি দরকার। এটি করা গেলে ভবিষ্যতে সংকট হবে না।
রমজানের আগে স্বস্তির আশ্বাস
লোয়াব সূত্রে জানা গেছে, মাসে গড়ে এলপিজির চাহিদা থাকে এক লাখ থেকে এক লাখ ২০ হাজার টন। শীতকাল ও রমজানে আট হাজার থেকে ১০ হাজার টন চাহিদা বাড়ে। গত রমজানে চাহিদা ছিল এক লাখ ৫০ হাজার টন। এবার তা বেড়ে এক লাখ ৬০ হাজার টন হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে চলতি জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে তিন লাখ ৫১ হাজার ৭০০ টন এলপিজি আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার ঢাকার রেল ভবনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের সঙ্গে এলপিজি অপারেটরদের সংগঠন লোয়াবের জরুরি বৈঠকে এ পরিকল্পনার কথা জানানো হয়।
ব্যাংকের ছাড়, বাস্তবতা অনিশ্চিত
সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক এলপিজিকে শিল্প কাঁচামাল হিসেবে বিবেচনা করে সর্বোচ্চ ২৭০ দিনের ঋণ সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। তবে বাজারে এলপিজির সরবরাহ ও দামে এসব সিদ্ধান্তের প্রভাব কবে পড়বে, তা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা কাটেনি।
তবে এলপিজি পরিবেশক সমিতির সভাপতি সেলিম খান সমকালকে বলেন, কয়েকটি জাহাজ আসার খবর পেয়েছি। দু–একদিন গেলে বোঝা যাবে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে কিনা।
চব্বিশ ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ কম থাকবে
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ শুক্রবার জানিয়েছে, আজ শনিবার দুপুর ১২টা থেকে রোববার দুপুর ১২টা পর্যন্ত এলএনজি টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণ কাজ চলবে। এ সময় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কম থাকবে। তিতাসের আওতাধীন আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতের গ্রাহক প্রান্তে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিকের তুলনায় কম থাকবে।



