বৃহস্পতিবার সপ্তাহের শেষ কর্মদিবস। স্বাভাবিকভাবেই মানুষের ছোটাছুটি বেশি হয়। দুই দিনের ছুটির আগে মানুষ তাদের হাতের কাজ শেষ করতে চায়। কিন্তু গত ১৫ জানুয়ারির শেষ কর্মদিবসটা ছিল অনেকের জন্য বিভীষিকাময়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকা মানুষের আহাজারি শুনলে যে–কেউ কষ্ট পাবেন। এদিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা কলেজ থেকে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে বের হন। ১২টা ৪০ মিনিটে তারা সায়েন্সল্যাব মোড় অবরোধ করেন। তাদের সঙ্গে যুক্ত হন আরও ছয়টি কলেজের শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনরত সাতটি কলেজ হলো ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ ও তিতুমীর কলেজ। শিক্ষার্থীদের অবরোধের কারণে মিরপুর সড়ক ও আশপাশের অন্যান্য সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে ভোগান্তিতে পড়ে হাজারো মানুষ। গাড়ি না পেয়ে তারা হেঁটে গন্তব্যে যায়। বিকাল ৫টায় আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা শিক্ষার্থীদের একজন নাঈম হাওলাদার অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে নতুন কর্মসূচি দেন। তিনি বলেন, রবিবারের মধ্যে সরকার ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অধ্যাদেশ জারি না করলে সোমবার তাঁরা সায়েন্সল্যাব মোড়ে আবারও অবরোধ করবেন। অধ্যাদেশ জারি না হলে সেদিন শিক্ষার্থীরা অধ্যাদেশ মঞ্চ তৈরি করবেন। পরবর্তী কর্মসূচি সেই মঞ্চ থেকে ঘোষণা করবেন। রাজধানীতে সড়ক অবরোধ করে দাবি আদায়ের আন্দোলন এখন নতুন কিছু নয়। প্রতিদিনই কোনো না কোনো সংগঠন দাবি আদায়ের জন্য রাজপথে অবস্থান নিচ্ছে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। সংবাদপত্রের খবর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৮ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত ঢাকায় বিভিন্ন দাবি আদায়ের জন্য ১ হাজার ১৩০টি সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। এসব অবরোধের অন্তত ৬০ শতাংশই ছিল শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের আন্দোলন।
সংবাদগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কারণে ৪২৩ বার সড়ক অবরোধ করেছেন। একই দিনে বিভিন্ন দাবিতে সর্বোচ্চ আটটি সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে ঢাকায়। কিছু কিছু সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে দুই পক্ষের সংঘর্ষের কারণে। ঢাকা কলেজ ও সিটি কলেজ শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের কারণেই ২৩ দিন মিরপুর সড়ক অবরুদ্ধ হয়ে ছিল। সিটি কলেজ বনাম আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় আট দিন একই সড়ক অচল হয়ে পড়ে ছিল। সবচেয়ে বেশি সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে শাহবাগে। ঢাকার অন্যতম এই ব্যস্ত সড়কটি গত ১৭ মাসে অন্তত ৩৫০ দিনই বন্ধ ছিল। এ রাস্তায় বারডেম, পিজি হাসপাতালসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অফিস এবং হাসপাতাল রয়েছে। এসব অবরোধের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হয়েছে হাসপাতালে আসা রোগী এবং তাদের স্বজনরা। এ শহরে এখন ভোগান্তিই যেন মানুষের নিত্যসঙ্গী। একজন মানুষ জানে না কোথায় সড়ক অবরোধ হবে। তারা তাদের কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে কি না। সড়ক অবরোধের এ সংস্কৃতি শুরু হয়েছে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে। আগস্টের গণ অভ্যুত্থানের পর তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে যেকোনো দাবি আদায়ের জন্য সড়ক অবরোধ সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। তাই কখনো পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে, কখনো অটোপাসের দাবিতে তারা সড়ক অবরোধ করছেন।
সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন। অন্তর্র্বর্তী সরকারও এ ধরনের চাপের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করছে। সচিবালয় ঘেরাও হলেই অটোপাসের ঘোষণা আসছে। রাস্তা অবরোধ করলেই কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। সড়ক অবরোধ এখন দাবি আদায়ের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। ফলে শিক্ষার্থীরা এখন শ্রেণিকক্ষের চেয়ে রাজপথেই সপ্রতিভ। চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে এসেছিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বন্ধ ছিল পাঠদান। ১৭ মাসেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিক হয়নি। শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশেই শিক্ষাঙ্গনে বিরাজ করছে চরম বিশৃঙ্খল অবস্থা। শিক্ষার্থীদের হাতে লাঞ্ছিত হচ্ছেন শিক্ষক। অনেক শিক্ষক ক্লাস নিতে যাচ্ছেন না মবের ভয়ে। ক্ষমতার পালাবদলের সুযোগে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী শিক্ষাঙ্গনগুলোতে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। তারা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের স্কুল ও কলেজের শিক্ষক পদাধিকারীদের চাপ সৃষ্টি করে পদত্যাগে বাধ্য করছে। তাঁদের মধ্যে উপাচার্য, অধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষক যেমন আছেন, তেমন আছেন সাধারণ শিক্ষকও। এই স্বার্থান্বেষী মহল শিক্ষকদের পদত্যাগে বাধ্য করার পাশাপাশি তাঁদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করছে, কোনো কোনো শিক্ষক সন্ত্রাসী হামলায় আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হয়েছেন। এমনকি নারী শিক্ষকও আক্রমণ থেকে রেহাই পাননি। বিচলিত হওয়ার বিষয় হলো, স্বার্থান্বেষী মহল তাদের এই হীনস্বার্থ উদ্ধার করতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। কেউ কেউ নিগৃহীতও হয়েছেন।
এর মধ্যে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু শিক্ষকরাও রয়েছেন। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ছাত্রঐক্য পরিষদের নেতারা সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছেন, ৪৯ জন ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু শিক্ষককে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। অস্বীকার করার উপায় নেই যে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় বিবেচনায় স্বেচ্ছাচারী কায়দায় নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতি হয়েছে। অনেক মেধাবী শিক্ষককে পেছনে ফেলে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি হয়েছে। এসব কারণে শিক্ষকদের একাংশের মধ্যে বঞ্চনাবোধ ও ক্ষোভ জন্ম হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু একটি অন্যায়ের প্রতিকার তো আরেকটি অন্যায় দিয়ে হতে পারে না। আইনি পথেই এর প্রতিকার খুঁজতে হবে। এখানে গায়ের জোর দেখানোর সুযোগ আছে বলে মনে করি না। এ ধরনের ঘটনার কারণে শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করতে ভয় পাচ্ছেন। শিক্ষাজীবন স্বাভাবিক হয়নি এতদিন পরেও। একেই তো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে আসেনি শিক্ষার পরিবেশ, অন্যদিকে দ্বিতীয় বছরের মতো অন্তর্র্বর্তী সরকার সময়মতো পাঠ্যবই সরবরাহ করতে পারেনি। জানুয়ারির অর্ধেক পেরিয়ে গেলেও এখনো প্রায় ৩ কোটি বই শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছেনি। বর্তমান সরকার শিক্ষাকে কতটা অগ্রাধিকার দিচ্ছে সেই প্রশ্নও উঠেছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্র্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য বিভিন্ন কমিশন গঠন করলেও শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।
অথচ নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে মানসম্পন্ন তথা বিশ্বমানের শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। আমরা যদি বিশ্বের ইতিহাস পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখব বিপ্লবের পর সেসব দেশই এগিয়ে গেছে যারা শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। গৃহযুদ্ধের অবসানের পর আব্রাহাম লিংকন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষাকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। গড়ে তুলেছিলেন দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা পরিকল্পনা। সেই পরিকল্পনার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন করে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র। সে কারণেই তাদের শিক্ষা আজ বিশ্বসেরা। বলশেভিক বিপ্লবের পর লেনিন শিক্ষাকে সবার ওপরে স্থান দেন। গড়ে তোলেন একটি শিক্ষিত জাতি। ভারতের স্বধীনতার পর জওহরলাল নেহরু শিক্ষার আমূল সংস্কার করেন। বিশ্বমানের শিক্ষাব্যবস্থা তৈরির জন্য নেন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। যে কারণে ভারতের শিক্ষার্থীরা এখন বিশ্ব প্রতিযোগিতায় দাপট দেখাচ্ছেন। গুগলের সিইও সুন্দর পিচাইয়ের মতো বিশ্ব করপোরেটপ্রধান তৈরি করছে ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা। চীনের বিপ্লবের পর মাও সে তুং শিক্ষায় ব্যয় বাড়ান ব্যাপকভাবে। রক্ষণশীল চীনের শিক্ষার্থীরা এখন হার্ভার্ড, এমআইটিসহ বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আলো ছড়াচ্ছেন। এ রকম উদাহরণ দেওয়া যায় ভূরিভূরি। শিক্ষা ছাড়া বিশ্বের কোনো জাতিরাষ্ট্র উন্নতি করতে পারেনি। কোনো দিন পারবেও না। আমাদের দুর্ভাগ্য স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও আমরা আমাদের দেশের শিক্ষার মান উন্নত করতে পারিনি। আমাদের শিক্ষা বিশ্বের মানদণ্ডে অনেক পিছিয়ে। মেধাবী শিক্ষার্থীরা নিজেদের উদ্যোগে উন্নত শিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমাতেন।
কিন্তু গত ১৬ মাসে সেই সুযোগও কমে এসেছে। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে অনেক দেশেই। যুক্তরাজ্যসহ অনেক উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। এসব নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। উদ্যোগ নিতে হবে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সবচেয়ে বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছে শিক্ষায়। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে আমাদের আর্থসামাজিক অবস্থার ওপর। শিক্ষায় যদি আমরা শৃঙ্খলা ফেরাতে না পারি, তাহলে নতুন বাংলাদেশ দূরের কথা, একটি সুস্থ জাতি হিসেবেও আমরা বিকশিত হতে পারব না। শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতেই হবে। বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনের সমসময়ে আরও দুটি দেশ–নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে আন্দোলন হয়েছে, সরকারের পতন ঘটেছে। কিন্তু আন্দোলনের বিজয়ের পর শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাজীবনে ফিরে গেছেন। বাংলাদেশে তেমনটা হয়নি। এ ব্যর্থতা আমাদের সবার। সামনে নির্বাচন। আমরা আশা করি খুব শিগগিরই রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করবে। এ ইশতেহারে যেন শিক্ষা গুরুত্ব পায়। নির্বাচনে জয়ী হয়ে যে দলই সরকার গঠন করুক না কেন, তারা যেন শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরাতে উদ্যোগ নেয় সবার আগে। মানসম্মত শিক্ষার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখন আইসিইউতে। শিক্ষাকে বাঁচাতে দরকার রাজনৈতিক উদ্যোগ এবং জাতীয় ঐকমত্য। আমরা কি পারব শিক্ষাকে বাঁচাতে?


