আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে পাহাড়ে সক্রিয় হচ্ছে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট–ইউপিডিএফ (মূল)। নির্বাচনে তারা কোন প্রার্থী দেয়ার সুযোগ না পেলেও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সমর্থনে ইতোমধ্যে মাঠে নেমে গেছে। পার্বত্য তিন জেলায় যেসব স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন, তাদের সঙ্গে ইউপিডিএফ‘র সংযোগ স্থাপনের খবরে এলাকায় উদ্বেগ–শঙ্কা বিরাজ করছে। বাড়ছে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের আনাগোনা। পাহাড়ের বাসিন্দারা বলছেন, ইউপিডিএফ ইতোমধ্যেই একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে কুখ্যাতি অর্জন করেছে। ভারতের প্রত্যক্ষ সহযোগীতায় তারা নিয়মিতভাবে পাহাড়ি জনপদে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি, খুন, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়সহ আইনবহির্ভূত ও মানবাধিকার লঙ্ঘনমূলক কর্মকা–ে লিপ্ত রয়েছে। এই অবস্থায় নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সমর্থন দেয়ার মাধ্যমে তারা যদি রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত বা প্রভাবশালী হয়ে ওঠে, তাহলে এসব অপকর্মের মাত্রা ও তীব্রতা আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেইসাথে পাহাড়ে দীর্ঘমেয়াদে সংঘাত–সহিংসতার আশঙ্কা আরো বেশি প্রবল হয়ে উঠবে। এছাড়া এসব সন্ত্রাসীরা নির্বাচনে সক্রিয় হলে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার এবং সংঘাত–সহিংসতার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে সমতলেও।
এ অবস্থায় নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত, পাহাড়ে শান্তি স্থিতিশীলতা সর্বোপরি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় অখন্ডতার স্বাথে এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে নিষিদ্ধ করারও দাবি ফের জোরদার হচ্ছে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার ও পিসিজেএসএস‘র মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বিরোধিতা করে ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বে আঞ্চলিক দল হিসেবে ইউপিডিএফ নামক সংগঠনটি আত্মপ্রকাশ করে। কাগজে–কলমে দলটির মূল উদ্দেশ্য পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘পূর্ণ আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার বা স্বায়ত্তশাসন’ প্রতিষ্ঠা করা। তবে বিগত দিনে তাদের বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক এবং উস্কানিমূলক কর্মকা–ে এটা সুস্পট যে তারা তিন পার্বত্য জেলায় পাহাড়ি–বাঙ্গালী বিদ্বেষ ছড়ানো আর দেশের মোট ভূ–খন্ডের এক দশমাংশ পার্বত্য জেলায় দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর কার্যক্রমকে কোণঠাসা এবং বিতর্কিত করে তুলতেই কাজ করে যাচ্ছে। তাদের এই রাষ্ট্রঘাতি অপকর্মে সরাসরি সহযোগী হয়েছে মুখচেনা কিছু গণমাধ্যম, দেশি–বিদেশি এনজিও এবং বামপন্থি সংগঠন। রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন না থাকলেও দলটি বিভিন্ন ইস্যুতে পার্বত্যাঞ্চলের প্রত্যন্ত অঞ্চল ও জেলা শহরে প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করে যাচ্ছে। পাশাপাশি, প্রতিষ্ঠার পর হতে দলটি পার্বত্য চট্টগ্রামে হত্যা, অপহরণ, গুম, চাঁদাবাজি, অন্যান্য সশস্ত্র দল এবং সেনাবাহিনীর সাথে সংঘর্ষ ও গুলি বিনিময়, সেনাবাহিনী প্রত্যাহার, রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন অপপ্রচার ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টিসহ উপজাতি স্বার্থান্বেষী মহলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার অপতৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে। ইউপিডিএফ (মূল) দলের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী নেতা প্রসীত বিকাশ খীসা, মাইকেল চাকমা, সচিব চাকমা, অর্কিড চাকমা, উজ্জল কুমার চাকমা ও রবি শংকর চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি নানাবিধ নাশকতামূলক অপরাধের কারণে বিভিন্ন মামলায় ফৌজদারী অপরাধে অভিযুক্ত। তারা পার্বত্যাঞ্চলের বাইরে বিশেষ করে ঢাকা ও ভারতে অবস্থান করে পার্বত্য চট্টগ্রামকে অস্থিতিশীল করতে দেশে ও বিদেশে অবস্থানরত ইউপিডিএফ (মূল) দলের অনলাইন একটিভিস্টদের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে উস্কানিমূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
পাশাপাশি, পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত বিভিন্ন অপ্রমাণিত ও অসত্য ঘটনাকে ইস্যু হিসেবে উপস্থাপন করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মাধ্যমে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যা পার্বত্যাঞ্চলের প্রশাসনিক কার্যক্রমকে আরোও জটিল ও বিঘিœত করছে। স্থানীয়রা জানান, প্রতিষ্ঠার পর থেকে দলটি পার্বত্যাঞ্চলে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে বিভিন্ন আন্দোলন কর্মসূচী পালন করে যাচ্ছে। বিশেষ করে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় সংঘটিত বিভিন্ন সংবেদনশীল ও অসত্য ঘটনাকে ইস্যু করে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন কর্মসূচী পালনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনাবাহিনী ও বাঙালি প্রত্যাহারের অযৌক্তিক দাবি জানিয়ে আসছে। ইউপিডিএফ (মূল) দলের ঘোষিত মূল উদ্দেশ্য পার্বত্য চট্টগ্রামে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং দলটি তার নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা ও স্কুলসমূহে বাংলাদেশের কোন জাতীয় দিবস পালন করে না। বিগত ২০১০ সালের ১৯ ও ২০ ফেব্রুয়ারি তারা উপজাতিদের ভাষার উপর ৫ দফা দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নানিয়ারচরের সকল স্কুলের উপজাতি ছাত্র–ছাত্রীরা ইউপিডিএফ (মূল) দলের প্ররোচনায় মাতৃভাষা দিবসের প্রতিবাদে ক্লাস বর্জন করে। একই ইস্যুতে ইউপিডিএফ (মূল) দল ২০১১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রাম জুড়ে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস বর্জন করার পাশাপাশি গত ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ কর্মসূচী থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দেয়। স্থানীয়রা জানায়, ইউপিডিএফ (মূল) দলের ইন্ধনে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোমলমতি শিক্ষার্থীদের রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমে অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন সময়ে জাতীয় দিবস উদযাপন না করার জন্য বাধ্য করছে।
গত বছরের ৭ মার্চ নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক রাঙ্গামাটি জেলার কাউখালী উপজেলার পানছড়িতে বিশেষ অভিযান পরিচালনাকালে জানা যায়, সেখানে অবস্থিত পানছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হয় না এবং উক্ত স্কুলের দেয়ালে ইউপিডিএফ (মূল) দলের পতাকা সম্বলিত গ্রাফিতি অঙ্কিত ও রাষ্ট্রবিরোধী ব্যানার, পোস্টার প্রদর্শিত অবস্থায় পাওয়া যায়। এছাড়া, বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, রাঙ্গামাটি জেলার নানিয়ারচর, কাউখালী ও বাঘাইছড়ি এবং খাগড়াছড়ি জেলার লক্ষীছড়ি ও সিন্দুকছড়ি এলাকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ ইউপিডিএফ (মূল) দলের মনোভাবাপন্ন ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে যেখানে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিবসসমূহ পালন করা হয় না এবং ইউপিডিএফ (মূল) দলের সাথে সম্পৃক্ত শিক্ষকেরা বিভিন্ন বিতর্কিত ও অসত্য বিষয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে দীক্ষিত ও প্রভাবিত করে থাকেন। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর তথ্য হলো– ইউপিডিএফ (মূল) দল কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্কুল–কলেজের শিক্ষা ব্যবস্থার উপর আধিপত্য বিস্তার করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের রাষ্ট্রবিরোধী এবং সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণে বাধ্য করা হয়ে থাকে। এর ফলে, ইউপিডিএফ (মূল) দল কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত পার্বত্যাঞ্চলের প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুল–কলেজের শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের অখণ্ডতা বিরোধী মনোভাব নিয়ে বেড়ে উঠছে।
এছাড়া, দলটি তাদের দূরদর্শী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের একটি বিপক্ষ শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ইউপিডিএফ (মূল) দল এবং এর অঙ্গ সংগঠনসমূহ কর্তৃক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিনিয়ত সরকার, বাঙালি জনগোষ্ঠী ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত রয়েছে। দলটি অনলাইন বিভিন্ন প্লাটফর্ম ব্যবহার করে পক্ষপাতদুষ্ট, বিকৃত ও অসত্য খবর প্রকাশের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দলটির অঙ্গ সংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি), হিল উইমেন্স ফেডারেশন (এইচডব্লিউএফ), গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম (ডিওয়াইএফ)সহ অন্যান্য সংগঠনসমূহ প্রতিনিয়ত খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায় বিভিন্ন অযৌক্তিক ও অপ্রমাণিত ইস্যুকে কেন্দ্র করে সাধারণ উপজাতি নারী–পুরুষকে সম্পৃক্ত করে মিছিল, সমাবেশ, মানববন্ধন, লাঠি মিছিল, মশাল মিছিলের পাশাপাশি সড়ক অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করে থাকে। এ সকল কর্মসূচীতে বক্তারা সেনাবাহিনী ও বাঙালি বিরোধী বিভিন্ন বক্তব্য প্রদান করে সাধারণ উপজাতিদের উস্কানি ও বিভ্রান্তি সৃষ্টির পাশাপাশি সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির অপচেষ্টা করে থাকে। এছাড়া, দলটি ও তাদের অঙ্গ সংগঠনসমূহের সদস্যরা পার্বত্যাঞ্চলের বিভিন্ন সংবেদনশীল এলাকায় সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনী বিরোধী পোস্টারিং ও দেয়াল লিখন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।



