দেশে জ্বালানি ব্যবস্থায় সংকট কাটানোর কোনো লক্ষণ নেই। পাইপলাইনের গ্যাসে চাপ খুবই কম। রাজধানীতে বিতরণ লাইনের ভাল্ব বিস্ফোরণ ও নদীতলে পাইপলাইনের ক্ষতির কারণে গ্যাস সরবরাহ ভয়াবহভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এদিকে সিলিন্ডার গ্যাসেও ব্যাপক অস্থিরতা। সারাদেশে এলপিজির সংকট ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে ভোগান্তি ছড়িয়েছে ঘরে ঘরে। তিতাস গ্যাস সূত্রে জানা গেছে, গতকাল শনিবার রাজধানীতে গণভবনের উল্টো দিকে থানা রোডের মুখে চার ইঞ্চি বিতরণ লাইনের ব্যাসের একটি ভাল্ব হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়ে বড় ধরনের লিকেজ সৃষ্টি করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আশপাশের একাধিক সেকশনের ভাল্ব বন্ধ করে গ্যাসের চাপ সীমিত করা হয়। এর ফলে রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকায় গ্যাস সরবরাহ হঠাৎ কমে যায়। এছাড়া গত রোববার তুরাগ নদের তলদেশে ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইনটি জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করা হলেও কাজের সময় পাইপের ভেতরে পানি ঢুকে পড়ে। এতে অনেক এলাকায় লাইনে প্রথমে পানি বের হচ্ছে, পরে অল্প গ্যাস আসছে। এই সমস্যায় সবচেয়ে বেশি ভুগছেন পশ্চিম ও উত্তর ঢাকার বাসিন্দারা। ধানমন্ডির বাসিন্দা গৃহিণী শিরিন আক্তার বলেন, ‘গত চার দিন ধরে দিনভর চুলায় আগুন থাকে না। গভীর রাতে একটু গ্যাস এলে তখন রান্না করি। তিন দিনে ঠিকমতো এক বেলাও রান্না হয়নি।’ মিরপুরের বেসরকারি চাকরিজীবী ফারহান ইসলাম জানান, গ্যাসের অভাবে বাধ্য হয়ে ইন্ডাকশন চুলা কিনেছেন।
বিদ্যুৎ বিল নিয়ে এখন আলাদা দুশ্চিন্তা শুরু হয়েছে। তিতাস কর্তৃপক্ষ গতকাল রাতে জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত ভাল্বটি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে এবং ধাপে ধাপে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার কাজ চলছে। তবে পুরো নেটওয়ার্কে ভারসাম্য ফিরতে সময় লাগবে। নদীতলে পাইপলাইনে ঢুকে পড়া পানি পুরোপুরি অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত কিছু এলাকায় স্বল্পচাপ থাকবে। ঢাকার বাইরেও গ্যাস সংকট চলছে। কিশোরগঞ্জের তিতাসের লাইনে গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে প্রায় দুই বছর ধরে। চুলায় আগুন জ্বলে মোমবাতির মতো টিমটিম করে। ডাবল বার্নার থাকলে একটি বন্ধ করে একটি জ্বালাতে হয়। এরপরও আধা ঘণ্টার রান্না শেষ করতে লাগছে দুই ঘণ্টা। গ্রাহকদের মাসে মাসে তিতাসের বিলও দিতে হচ্ছে, আবার দোকান থেকে সিলিন্ডারও কিনতে হচ্ছে। সরবরাহ না বাড়া পর্যন্ত গ্যাসের সংকট পুরোপুরি দূর হওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন তিতাসের একজন ব্যবস্থাপক।
এলপিজির দিকে ঝুঁকেও স্বস্তি নেই
পাইপলাইনের গ্যাস না থাকায় বহু পরিবার বিকল্প হিসেবে এলপিজির দিকে ঝুঁকছে। রাজধানী ছাড়িয়ে এই সংকট এখন সারাদেশেই। কোথাও সিলিন্ডার মিলছে না, আবার কোথাও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ থেকে হাজার টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। রাজধানীর কদমতলীর বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনেছি ২২০০ টাকায়। এত দামে না কিনে উপায় ছিল না। পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ায় এলপি গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে। নিয়মিত এলপি গ্যাস সরবরাহ না থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছে অনেক পরিবার। এ সুযোগে শহরের অসাধু ব্যবসায়ীরা সিলিন্ডারপ্রতি ২শ থেকে ৪শ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়িয়েছেন।
কুষ্টিয়ার খোকসা প্রতিনিধি জানান, হঠাৎ সিলিন্ডার গ্যাসের কৃত্রিম সংকট ও দাম বাড়ার ফলে কাঠখড়ির (লাকরি) চুলার চাহিদা বেড়েছে। ফেনীর সোনাগাজী সংবাদদাতা জানিয়েছেন, দোকানে দোকানে ঘুরেও কোথাও মিলছে না গ্যাস সিলিন্ডার। দোকানিরা বলছেন ডিলারদের পক্ষ থেকে সিলিন্ডার সরবরাহ বন্ধ থাকায় দোকানে গ্যাস সিলিন্ডারের সংকট দেখা দিয়েছে। এতে করে পৌর শহরের বাসাবাড়িতে রান্নার বিকল্প হিসেবে অনেকেই ইলেকট্রিক চুলা কিনছেন। সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সিলিন্ডার গ্যাসের অস্বাভাবিক দাম বাড়াতে অসহনীয় ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তারা। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অতিরিক্ত দাম আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এই খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন করে এলপিজি জাহাজ না আসা পর্যন্ত এই সংকট দূর হবে না। চলতি মাসে একটি জাহাজ আসার কথা রয়েছে। সেটি এলে আপাততত ভোগান্তি খানিকটা কমতে পারে। তা না হলে এই দুর্ভোগ ফেব্রুয়ারি মাসেও থাকতে পারে।
পরিবহন খাতে চাপ
এলপিজি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে। সারাদেশে প্রায় এক হাজার অটোগ্যাস স্টেশনের বড় অংশে পর্যাপ্ত গ্যাস নেই। ফলে এলপিজিচালিত গাড়ি, অটোরিকশা ও মাইক্রোবাস চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে অটোগ্যাস স্টেশন মালিকেরা জানান, চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহ অনেক কমে গেছে। স্টেশন চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক যানবাহনে বাধ্য হয়ে অকটেন ব্যবহার করা হচ্ছে।
সিএনজির জন্যও দীর্ঘ অপেক্ষা
পাইপলাইনের স্বল্পচাপের প্রভাব পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় স্টেশনের সামনে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় চালকেরা পূর্ণ গ্যাস পাচ্ছেন না।
একজন অটোরিকশা চালক বলেন, ‘ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও অর্ধেক গ্যাস পাই। দিনে কয়েকবার লাইনে দাঁড়াতে হয়, আয় অর্ধেকে নেমে গেছে।’ বেড়েছে বৈদ্যুতিক চুলার চাহিদা।
গ্যাসের এই সংকটে হঠাৎ বেড়েছে বৈদ্যুতিক চুলার বিক্রি। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ইন্ডাকশন ও ইনফ্রারেড চুলার চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। বিক্রেতারা জানান, কিছু মডেলের চুলা কয়েক দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।



