গত বুধবার টাঙ্গাইলের মধুপুর বনাঞ্চলের জাতীয় সদর উদ্যান রেঞ্জের লহুরিয়া বিটে এভাবেই পতঙ্গের প্রাসাদখ্যাত উইপোকার ঢিবি ধ্বংস করতে দেখা যায়। শীতের কুয়াশা চারদিকে ভর করেছে। নিশ্চল গাছপালার লতাপাতা চুঁইয়ে বনতলে টুপটাপ করে পড়ছে হিম শীতল জল। ভোরের নীরবতা আর কুয়াশা ভেদ করে ধুপধাপ শব্দ কানে এলো। কাছে গিয়ে দেখা গেল, একদল শ্রমিক কোদাল চালিয়ে বনতলের উইপোকার উঁচু ঢিবি কাটছেন। খুদে পতঙ্গের পরম যত্নে গড়া মাটির প্রাসাদ তছনছ করে মালামাল লুট করছে। কাদা মাটির ঢিবিগুলো এভাবে কাটায় বনের অপার সৌন্দর্য ম্লান হচ্ছে। দুই শ্রমিক মধুপুর উপজেলার শোলকুড়ির আরিফুল এবং জামালপুর সদরের রশিদপুরের জলিল জানায়, উইপোকার ঢিবির ভেতরে অনেক প্রকোষ্ঠ থাকে। কোনোটিতে রাণী, কোনোটিতে সৈনিক বা শ্রমিকরা থাকে। আবার কোনোটি খাদ্য গুদাম। কোনোটিতে বিষ্ঠা, ডিম বা বাচ্চা থাকে। বড় ঢিবি থেকে দুই–আড়াই মণ বিষ্ঠা, ডিম বা বাচ্চা মেলে। এগুলো মাছ, হাঁস–মুরগির পুষ্টিকর খাবার। পোলট্রি ও ডেইরির কৃত্রিম খাবারের দাম বাড়ায় দিন দিন এসবের চাহিদা বেড়েছে। অনেকেই ঢিবির লোভে জঙ্গল চষে বেড়ায়।
জামালপুর সদরের শ্রীপুর গ্রামের মৎস্যখামারি মুত্তালিব হোসেন জানান, উইপোকার বিষ্ঠা ও ডিম পুষ্টিকর খাবার। তবে ক্রমাগত নিধনযজ্ঞে সংরক্ষিত বনের ঢিবি কমে গেছে। টাঙ্গাইলের মধুপুর জাতীয় সদর উদ্যান রেঞ্জের ফরেস্টার মোশারফ হোসেন জানান, এখনো উইপোকার কিছু ঢিবি দেখা যায়। বনজঙ্গল হচ্ছে হাজারো কীটপতঙ্গের নিরাপদ স্থান। ঢিবি নিধন বন অপরাধের মধ্যে পড়ে। অবসরপ্রাপ্ত বনকর্মকর্তা আতোয়ার হোসেন জানান, মধুপুরে গজারি বন সাবাড় করে বিদেশি গাছের উডলট মডেলের বৃক্ষায়ন সরকারি বনভূমিতে আনারস ও কলার অবৈধ বাণিজ্যিক আবাদ সম্প্রসারণের সুযোগ দিয়েছে। সেখানে নির্বিচারে বিষ, সার ও হরমোন প্রয়োগে উইপোকাসহ হাজারো কীটপতঙ্গ মারা যাচ্ছে। বাঁচার তাগিদে উইপোকারা জঙ্গল ছেড়ে আশপাশের জনপদে ছড়িয়ে পড়ায় অনেকের ঘরগৃহস্থালি যন্ত্রণাময় হয়ে উঠেছে। নওগাঁ জেলার ধামইরহাট উপজেলার আলতাদীঘি জাতীয় সদর উদ্যান সংলগ্ন সাড়ে ৬০০ একর গজারি বনে কয়েকটি বড় উইপোকার ঢিবি দেখা যায়। এখানকার বিট অফিসার আনিসুর রহমান বলেন, ‘এসব ঢিবি দেখে মনে হয় যেন মাটির রাজপ্রাসাদ।
উইপোকার মাটির ঢিবি শালবনের সৌন্দর্য। দূরদূরান্তের পর্যটকরা এখানে বেড়াতে এসে উঁচু ঢিবি দেখে পুলকিত হন। ছবি তোলেন, কবিতা বা গল্প লেখেন। ভার্চুয়াল জগতে ভাইরাল করেন।’ শেরপুর ও নেত্রকোনা ভ্রমণকালে গারো পাহাড়ের গজারি বনে উইপোকার ঢিবির দেখা মেলে। শেরপুরের বালিজুড়ির ফরেস্ট রেঞ্জার সুমন মিয়া জানান, সেখানেও বিদেশি গাছের বনায়ন করায় উইপোকার ঢিবি কমে গেছে। রাংটিয়ার ফরেস্ট রেঞ্জার আব্দুল করিম জানান, কয়েক বছর ধরে বর্ষাকালে গারো পাহাড়ে প্রবল বর্ষণ ও ঢল বয়ে যায়। এতে উইপোকার ঢিবি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখন শুষ্ক মৌসুমেই শুধু ঢিবির দেখা মেলে। হাতির বিচরণেও উইপোকার ঢিবি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নেত্রকোনার দুর্গাপুর এবং কলমাকান্দার পাহাড়ি বনেও অল্প কিছু ঢিবি দেখা যায়। গাজীপুর ও ময়মনসিংহের শালবনে এসব ঢিবির ক্বচিৎ দেখা মেলে। একটি নামকরা কেমিক্যাল কোম্পানির কীটপতঙ্গ গবেষক ড. আরফান জানান, উইপোকা বাড়িঘর বা অফিস–আদালতে ক্ষতি করলেও এটি প্রাকৃতিক বনের গুরুত্বপূর্ণ পতঙ্গ। এরা প্রাণিজগতের বৈচিত্র্যময় জীবনধারার অংশ। এরা প্রয়োজনে মাটির নিচে দলবদ্ধভাবে চলাচলের জন্য সুন্দর রাস্তা তৈরি করে। এ রাস্তা মাটির আর্দ্রতা রক্ষা করে।
আর এ আর্দ্রতার দরুণ বনের গাছগাছালি মাটির নিচ থেকে সহজেই রস শোষণ করে বেঁচে থাকে। এভাবে গাছের বৃদ্ধি, বাস্তুতন্ত্র এবং জলজ প্রক্রিয়ায় উইপোকা ভূমিকা রাখে। সুতরাং ঢিবি নিধন প্রকৃতির ইকোসিষ্টেম নষ্ট করবে। অনেক বণ্যপ্রাণী যেমন—বনরুই, শিয়াল, খাটাস, ইঁদুর, টিকটিকি, ব্যাঙ এবং পিঁপড়া, বোলতা ও মাকড়সার মতো পতঙ্গকূল জঙ্গলের উইপোকা খেয়ে প্রকৃতিতে খাদ্যশৃঙ্খল রক্ষা করে। প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় উইপোকার ভূমিকা রয়েছে। বন শুধু বৃক্ষ আর গুল্মলতার আধার নয়, বন হলো হাজারো উদ্ভিদে ঘেরা জটিল পরিবেশ—যেখানে বন্যপ্রাণী ছাড়াও কীটপতঙ্গ ও অণুজীব জন্মে, বেড়ে ওঠে ও বাস করে।



