সারা পৃথিবী এখন একটি মাত্র গ্রাম, সারা পৃথিবী অভিন্ন বধ্যভূমি। বিদায় নেওয়া কলি কালের শেষ অবতার হিসেবে যাদের আমরা পেয়েছিলাম, মুনীর চৌধুরী কি তাদের একজন নন? বিদ্রোহের অমিত সাহস, চিরন্তন সাম্যের বোধ ও মহাজাতকীয় প্রেম তাঁর মনের ভিত্তি। বিজয়ী হবেন বলেই জন্মেছিলেন এবং নিয়তির ওপর চাপিয়ে দেওয়া মৃত্যু তাঁর বিজয় রুখতে পারেনি। আজ এই শক্তিধর বিজয়ীর শতবর্ষ অতিক্রম করার দিন। একশ বছর পূর্ণ হলো। শুভ জন্মদিন মুনীর চৌধুরী। মানুষ এক জীবনে একাধিক যুগ অতিক্রম করে। বাইরের নয়, এই যুগ গণনা তার ভেতরকার। তার মধ্যেই কেউ মনের শৈশবের অপমৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে লম্বা এক ঝাঁপ দিয়ে পড়েন প্রৌঢ়ত্বের উঠানে। কেউ আবার সৌভাগ্যবান। তারা মনের শৈশব ও কৈশোর কেটে গেলে ধারা মেনেই যৌবনে পদার্পণের পর হয়তো পেয়ে যান অনন্ত যৌবনের অমৃত। আমাদের কলির অন্যতম শেষ অবতারটি কি এমনই অমৃত পাওয়া মানুষ নন?
পাকিস্তান সরকার যখন তাঁকে জেলে আটকে রেখেছে, জানতেও কি পেরেছে, কারাগারের ‘কবর’ রচিত হতে চলেছে? নাটকটি লিখতে অনুরোধকারী রণেশ দাশগুপ্ত ও অনুপ্রাণক মার্কিন নাট্যকার আরউইন শ–কেও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে রবীন্দ্রনাথ গুহ, সরদার ফজলুল করিমদের সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়াটা ছিল কী অদ্ভুত শুভযোগ! আলো থেকে আলো জ্বলে ওঠার মতো ব্যাপার ঘটে গেল। বিদায় নিল একজন ‘আবু নয়ীম মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরীর’ সাজপোশাকের জাঁক। জেগে উঠল ‘মুনীর চৌধুরী’র অনন্ত জ্ঞানতৃষ্ণা। সেই তৃষ্ণা জাগিয়ে তোলার চেষ্টা তাঁর ছোটবেলা থেকেই করে চলেছিলেন বাবা খান বাহাদুর আবদুল হালিম চৌধুরী। মা আফিয়া বেগম ছিলেন প্রশান্তিময় প্রশ্রয়। তাই তো চারা রোপণের পর পরিচর্যার ভারসাম্য পরিবারে রক্ষিত হয়েছিল বলেই জাতি পেল কবীর চৌধুরী, মুনীর চৌধুরী, ফেরদৌসী মজুমদারকে। এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের পাঠ যখন গোটা চল্লিশ, পঞ্চাশ, ষাটের দশকের ওপর দিয়ে পাখির মতো উড়ে যায়, তখন অনেকেই বাংলাদেশের জন্মলক্ষণগুলো দেখতে পায়।
সেখানে কি মুনীর চৌধুরীকে একজন যুগাবতার হিসেবে দেখতে পায় না? পাকিস্তানের জন্মের পর ‘ইস্ট বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ কমিটি’ বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে পাকিস্তানের আরোপিত সংস্কৃতির অম্লে পোড়াতে চাইছে, যখন বাংলার মতো অতীব শক্তিশালী ভাষাকে করে তুলতে চাইছে এশিয়া মাইনর, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ–পশ্চিম ইউরোপের কিছু শক্তিশালী ভাষার তুচ্ছ অনুকার, তখন প্রকৃতিবিরুদ্ধ এই কাজের বিরুদ্ধে প্রকৃতির প্রতিনিধি হিসেবে মুনীর চৌধুরীই কি প্রতিরোধের দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে যাননি? আজ শতবর্ষের এপারে তিনি এলেন। তাঁর প্রিয় সাম্যবাদী রাজনীতি আজ দূষিত। তিনি হয়তো ‘ওপার’ থেকে হাসছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর নতুন পৃথিবীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের করায়ত্ব পাকিস্তানে আজকের জন্য অকল্পনীয় প্রতিকূলতার ভেতর দিয়ে তাঁকে আযৌবন সাম্যবাদী রাজনীতি করে যেতে হয়েছে। বিজাতির খড়্গের নিচে ঘাড় পেতে দেওয়া স্বজাতির সেই সময়ের তুলনায় আজ কি পরিস্থিতি আরও তরল নয়? এখন তো শত্রুমিত্র আরও সহজে চেনা যাচ্ছে।



