জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। সারাদেশ এখন নির্বাচনমুখী। এর মাঝেই বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গত ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দরের প্রকল্পাধীন লালদিয়ার চর টার্মিনাল এবং ঢাকার পানগাঁও নৌ টার্মিনাল বিদেশি দুই কোম্পানিকে ইজারায় দেয়ার চুক্তি করেছে। আগেই বিদেশি আরেক কোম্পানির হাতে ছেড়ে দেয়া হয় পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল (পিসিটি)। চট্টগ্রাম বন্দরের হৃৎপি– লাভজনক প্রধান স্থাপনা নিউমুরিং টার্মিনাল (এনসিটি) দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড কোম্পানিকে ইজারা প্রদানের জন্য ঝটিকা চুক্তির তোড়জোড় চলছে। বন্দরের প্রথম কন্টেইনার টার্মিনাল সিসিটি ইজারা পেতে তদবির–লবিং করছে বিদেশি একাধিক কোম্পানি। ‘আগামীর বন্দর’ বে–টার্মিনাল প্রকল্পের দুটি টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়া হবে একথা বলা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামে ১৯৭৬ সালে একটি জাহাজের ছয়টি কন্টেইনার খালাসের মধ্যদিয়েই সাবেক প্রেসিডেন্ট শহীদ জিয়াউর রহমানের আমলে প্রথম চট্টগ্রাম বন্দর কন্টেইনার–যুগে প্রবেশ করে। প্রেসিডেন্ট জিয়া চট্টগ্রাম বন্দরকে বিশেষত চীনের কারিগরি সহায়তায় কন্টেইনার–পোর্ট করার পরিকল্পনা করেন। পরবর্তীতে তা ধাপে ধাপে এগিয়ে চলেছে। আজকের চট্টগ্রাম বন্দর বার্ষিক প্রায় ৩৩ লাখ ইউনিট কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করছে। যা কন্টেইনার–শিপিং বাণিজ্যে দেশের মোট আমদানি–রফতানি পণ্যের ৯২ শতাংশ। এনবিআর খাতে রাজস্ব জোগান আসছে চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমেই এক লাখ কোটি টাকারও বেশি পরিমাণে।
এদিকে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের তিনটি টার্মিনাল ইতোমধ্যে ইজারায় দেয়া হয়ে গেছে। এরপর এনসিটি–সিসিটিসহ আরো চারটি মিলিয়ে মোট ৭টি কন্টেইনার টার্মিনাল বিদেশি কোম্পানিকে ২৫ থেকে ৪৮ বছর মেয়াদি ইজারায় চলে যাবে, যদি অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না হয়। সবগুলো কন্টেইনার টার্মিনাল বেহাত হয়ে গেলে থাকবে শুধুই বস্তার মালামালবাহী জেনারেল কার্গে বার্থ (জিসিবি)। এতে কার্যত মান্ধাতা আমলে ফিরে যাবে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম। বিদেশি কোম্পানিগুলো উচ্চহারে ট্যারিফ–ফি ইত্যাদি আদায় করবে। কেননা বিদেশি কোম্পানিগুলোর সুবিধার জন্য ইতোমধ্যেই বন্দরের মাশুল ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে বাড়বে আমদানি–রফতানি ও সার্বিকভাবে ব্যবসা–বাণিজ্য, শিল্প পরিচালনার ব্যয়। বৃদ্ধি পাবে নিত্যপণ্যের দামও। বন্দর–নির্ভর প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজকর্ম হারিয়ে বেকার হয়ে পড়বে হাজারো দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক–কর্মী। একের পর এক লাভজনক চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেইনার টার্মিনালগুলো বিদেশি কোম্পানির হাতে ইজারা প্রদানে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ–অসন্তোষ এবং ধারাবাহিক আন্দোলনের কর্মসূচিতে ফুঁসে উঠেছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। বিএনপি ও দলটির সমর্থিত শ্রমিক সংগঠন, জামায়াতে ইসলামী, গণতান্ত্রিক বাম জোটসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, শ্রমিক–কর্মচারী, পেশাজীবি ও নাগরিক সংগঠন এর বিরুদ্ধে একযোগে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। গ
তকাল
মঙ্গলবার বিএনপির
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান
তারেক রহমান
তার ভ্যারিফাইড
ফেসবুকে চট্টগ্রাম
বন্দরের টার্মিনাল
দীর্ঘমেয়াদি ইজারার
সিদ্ধান্ত গ্রহণের
এখতিয়ার বর্তমান
অন্তবর্তী সরকারের
নেই, এতে মানুষ
কাজকর্ম হারাবে
বলে এই
পদেক্ষেপ পরিহারের
আহ্বান জানিয়েছেন। এ
অবস্থায় সর্বাত্মক
প্রতিবাদ ও
প্রতিরোধে চ্যালেঞ্জের
মুখে পড়েছে
চট্টগ্রাম বন্দরের
টার্মিনাল ইজারার
সরকারি পদক্ষেপ।
এনসিটিসহ চট্টগ্রাম
বন্দরের লাভজনক
টার্মিনালগুলো বিদেশি
কোম্পানিকে ইজারার
বিরুদ্ধে এবং
গত ১৭
নভেম্বর দুটি
টার্মিনালের ইজারা
চুক্তি বাতিলের
দাবিতে সর্বদলীয়
জাতীয় শ্রমিক
জোট শ্রমিক–কর্মচারী ঐক্য
পরিষদের (স্কপ) ডাকে বন্দর
অবরোধ কর্মসূচি
পালন করা
হচ্ছে আজ
বুধবার। গতকাল
স্কপ চট্টগ্রামের
যুগ্ম আহ্বায়ক
রিজওয়ানুর রহমান
খান এক
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে
জানান, গত ২২
নভেম্বর চট্টগ্রাম
প্রেসক্লাবে স্কপ
চট্টগ্রাম জেলার
উদ্যোগে অনুষ্ঠিত
কনভেনশনে গৃহীত
সিদ্ধান্ত অনুসারে
আজ সকাল
১০টা থেকে
দুপর ১টা
পর্যন্ত অবরোধ
কর্মসূচি পালন
করা হবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের
অদূরে হালিশহর
বড়পোল, ইসহাক ডিপো
সংলগ্ন টোল
প্লাজা এবং
সল্ট গোলা
সী–মেন্স
হোস্টেলের সামনে
এই তিনটি
স্পটে সড়ক
অবরোধের কর্মসূচি
পালিত হবে।
বন্দর অবরোধ
কর্মসূচিকে সফল
করার জন্য
সর্বস্তরের শ্রমিক–কর্মচারী ও
সাধারণ জনগণের
প্রতি আহ্বান
জানানো হয়েছে।
আন্দোলনরত স্কপের
শীর্ষ নেতা
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক
দলের চট্টগ্রাম
বিভাগীয় সাধারণ
সম্পাদক সাবেক
চট্টগ্রাম বন্দর
সিবিএ সেক্রেটারি
কাজী শেখ
নুরুল্লাহ বাহার
বলেছেন, গণঅভ্যুত্থানে উৎখাত
পলাতক ফ্যাসিস্ট
হাসিনার আমলে
২০২৩–২৪
সালে চট্টগ্রাম
বন্দরের এনসিটিসহ
টার্মিনালগুলো বিদেশিদের
হাতে তুলে
দেয়ার লক্ষ্যে
জাতীয় স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত নেয়া
হয়েছিল। কিন্তু
এর বিরুদ্ধে
ব্যাপক প্রতিবাদের
মুখে সেটি
বাস্তবায়ন করতে
পারেনি।
অথচ বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার কেন ফ্যাসিস্টদের সেই সিদ্ধান্ত আজ বাস্তবায়ন করছে? অন্তবর্তী সরকারের এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের কোনো এখতিয়ার নেই। শ্রমিক–জনতাই তা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করবে। দেশের প্রধান চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেইনার টার্মিনালসমূহ বিদেশি কোম্পানির হাতে ইজারা দিয়ে হাতছাড়া করার বিরুদ্ধে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছে শ্রমিক–কর্মচারী, নাগরিক, পেশাজীবি, সামাজিক ও রাজনৈতিক মহল। আন্দোলনের কর্মসূচি নিয়ে মাঠে রয়েছে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদল, শ্রমিক–কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ), চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদসহ প্রতিনিধিত্বশীল বিভিন্ন সংগঠন। তারা বলছে, চট্টগ্রাম বন্দরের কোথাও এক ইঞ্চি জায়গাও বিদেশিদের হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবেনা। এর সঙ্গে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও ভূ–কৌশলগত নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত। চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনার জন্য বন্দর তথা দেশের দক্ষ–অভিজ্ঞ শ্রমিক–কর্মচারীসহ বৃহৎ জনসম্পদই যথেষ্টভাবে সক্ষম। বিদেশিদের সাথে ইজারা চুক্তির আগেই বন্দর এলাকায় মিছিল, সভা–সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আরো এক মাস বৃদ্ধি করেছে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি)। গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে আগামী ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়ানোর কথা জানানো হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ মূল স্থাপনা নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল এনসিটি বিদেশি কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার চুক্তি প্রক্রিয়া নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। চলতি মাসের শেষে অথবা আগামী ডিসেম্বরে দুবাই ভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির প্রস্তুতি চলছে।
এই লক্ষ্যে ৭ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটিও গঠিত হয়েছে। তবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক) এবং কাস্টমস কত হারে মাশুল–ফি–চার্জ–ট্যাক্স ইত্যাদি পাবে তা অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কিছুই প্রকাশ করা হয়নি। বরং বিদেশি কোম্পানিগুলোর সুবিধার্থে বন্দরের চার্জ–মাশুল আগেভাগেই সরকার ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি করায় বন্দর ব্যবহারকারীদের (স্টেক হোল্ডারগণ) মাঝে ক্ষোভ–অসন্তোষ অব্যাহত রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের প্রতি বছরের মুনাফা বাবদ নিজস্ব আয়েই গড়ে উঠেছে নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)। গত ১৬ বছর যাবত এনসিটি চট্টগ্রাম বন্দরের মোট আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ একক যোগান দিয়ে আসছে। মোট কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ৪৪ শতাংশই সামাল দিচ্ছে এনসিটি। এনসিটি চট্টগ্রাম বন্দরের মূল এবং অত্যাধুনিক স্থাপনা। আগের অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেকের হাতবদল হয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগাং ড্রাইডক লিমিটেডের মাধ্যমে গত ৭ জুলাই থেকে পরিচালিত হচ্ছে এনসিটি। দুর্নীতিমুক্ত এবং সুদক্ষ, সুশৃঙ্খল, গতিশীল, স্বচ্ছভাবে পরিচালনার ফলে এনসিটিতে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং ইতোমধ্যে বেড়েছে ২৭ শতাংশ। আমদানি–রফতানিকারক, ব্যবসায়ী, বন্দরব্যবহারকারী (স্টেক হোল্ডারগণ) এবং বন্দর কর্তৃপক্ষও এনসিটির পারফরমেন্সে সন্তুষ্ট। এনসিটি সুপার স্ট্রাকচারাল এবং সর্বাধুনিক গ্যানট্রি ক্রেনসহ যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ। এর ফলে এনসিটিতে নতুন করে বিনিয়োগের আর অবকাশ নেই। জোয়ার–ভাটা নির্ভর এবং আঁকাবাঁকা ও সাড়ে ৯ থেকে ১০ মিটার ড্রাফটের সীমিত চ্যানেলের ধারেই এনসিটির অবস্থান। এতে করে এনসিটিতে যথেচ্ছ ‘বড়সড়’ এবং ‘অগণিত’ জাহাজ বার্থিংয়ের (ভিড়ার) কোনো টেকনিক্যাল সুযোগই অবশিষ্ট নেই। তাছাড়া এনসিটির সঙ্গে লাগোয়া নেভির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা থাকায় এর সাথে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও ভূ–কৌশলগত গুরুত্বের প্রশ্ন জড়িত বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা অনেক আগেই সতর্ক করে আসছেন।



