জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুর চাঁদ উদ্যান এলাকায় ট্রাকচালক মো. হোসেনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের মা রীনা বেগম বাদী হয়ে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৬ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ৮০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
গতকাল সোমবার মামলাটির অভিযোগপত্র (চার্জশিট) আদালতে দাখিল করেছে পুলিশ। হত্যার ঘটনায় এই প্রথম চার্জশিট দাখিল করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। আজকালের মধ্যে আরও একটি হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিল করা হতে পারে। আরও কয়েকটি হত্যা মামলার চার্জশিট তৈরি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তদন্ত সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। মো. হোসেন হত্যা মামলাটি তদন্ত শেষ করে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ আদালতে যে অভিযোগপত্র দিয়েছে, তাতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ ৩০ জনের বেশি আসামি করা হয়েছে। এর আগে গত মার্চে ডিএমপি দুটি অন্য ধারার মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করে।
পুলিশ সদরদপ্তর ও ডিএমপি সূত্র জানিয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনায় সারাদেশে ১ হাজার ৭৮৫টি মামলা হয়। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে মামলা হয়েছে ৭৫৮টি। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৪৬৮টি এবং অন্য মামলা ২৯০টি। যার মধ্যে ডিএমপি ৩৩৪টি হত্যা মামলা এবং ২৬৫টি অন্য ধারার মামলা তদন্ত করছে। এসব মামলায় সাবেক মন্ত্রী, এমপি, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা এবং সাবেক সরকারি কর্মকর্তাসহ এ পর্যন্ত ১ হাজার ৯৮৯ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। গ্রেপ্তারের তালিকায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনসহ ২৩ পুলিশ কর্মকর্তা রয়েছেন।
ডিএমপির ১৬৯টি মামলা তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), এটিইউ এবং র্যাব। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় ছড়িয়ে পড়া সহিংসতা, সংঘর্ষ, গুলি ও হামলার প্রতিটি ঘটনার মধ্যে হত্যার সংখ্যা বেশি। রাজধানীতে দায়ের হওয়া হত্যা মামলাগুলোর বেশির ভাগই রাস্তায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু, সংঘর্ষের মধ্যে আটকা পড়ে কিংবা নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগে করা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ, কল রেকর্ড, ফরেনসিক পরীক্ষার পাশাপাশি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। হোসেন হত্যা মামলা সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছাত্র–জনতার আন্দোলন চলছিল। মো. হোসেন গাবতলীতে তাঁর ট্রাক পার্ক করে মোহাম্মদপুর থানাধীন চাঁদ উদ্যানের বাসায় ফিরছিলেন। চাঁদ উদ্যান এলাকায় পৌঁছলে তাঁকে গুলি করা হয়। বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই তিনি প্রাণ হারান।
এ ঘটনায় নিহতের মা রীনা বেগম ৩১ আগস্ট মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন। এতে ১৬ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ৮০ জনকে আসামি করা হয়। এজাহারনামীয় আসামিরা হলেন গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক, মোহাম্মদপুর এলাকার কাউন্সিলর আসিফ আহমেদ ও তারেকুজ্জামান রাজিব, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান, মোহাম্মদপুর স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা নূর মোহাম্মদ সেন্টু প্রমুখ। মামলাটি প্রথমে তদন্ত করেন মোহাম্মদপুর থানার এসআই ফারুকুল ইসলাম। পরবর্তী সময়ে তদন্তের দায়িত্ব পান একই থানার এসআই আকরামুজ্জামান। তদন্ত শেষে তিনি গতকাল আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছেন। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন মোহাম্মদপুর থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মফিজ উদ্দিন। মোহাম্মদপুর থানার দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, মোহাম্মদপুরে আরেক হত্যা মামলার চার্জশিট জমার অপেক্ষায় আছে। আজকালের মধ্যেই মো. সবুজ হত্যা মামলার এই চার্জশিট আদালতে দাখিল করা হবে।
দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানান, চার্জশিট প্রস্তুত। কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেই আদালতে জমা দেওয়া হবে। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট মোহাম্মদপুর থানা এলাকায় গুলি করে সবুজকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় তাঁর ভাই মনির হোসেন বাদী হয়ে একই বছরের ১ সেপ্টেম্বর হত্যা মামলা দায়ের করেন।



