প্রিয় দেশবাসি, হাজিরান, সুধীজন, এই বিশেষ দিনে আপনাদের সকলকে জানাই আন্তরিক অভিবাদন।
যখন কোনো রাজা মহারাজার সাথে আমাদের পরিচয় ঘটানো হয়ে থাকে তখন তেমন আনন্দঘন মুহুর্তটি সকলেই প্রাণভরে উপভোগ করে। নিজেদের ও বাড়িঘর যথাযোগ্য সাজিয়ে গুছিয়ে পরিপাটি করে রাখে। আজ আমি আপনাদের কাছে তেমন এক রাজার কথা বলব যিনি নিজের প্রাণের অধিক আমাদের মহব্বত করেন। কেবল মুখের কথায়ই নয়, স্বীয় পূতপবিত্র জীবন দানের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন, আমাদের প্রতি তাঁর প্রেমের আতিসহ্য। তিনি হলেন আল্লাহপাকের জীবন্ত কালাম ও পাকরূহ খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসীহ, কেবল হারিয়ে যাওয়া মানুষকে খুঁজে নিতে ধরাপৃষ্ঠে তিনি মানবরূপে হাজির হয়েছেন।
খোদার পথ, সত্য ও জীবন থেকে স্খলিত হবার ফলে মানুষের পতন ঘটেছে। তাই হারিয়ে যাওয়া মানুষ খুঁজে নিতে এবং তাদের কৃতপাপের কাফফারা পরিশোধ দেবার জন্য মসীহ হলেন একক নিখুঁত যথাযোগ্য মেষ, যাকে গুনাহগার মানবজাতির বিকল্প ঐশি মেষ হিসেবে সলীবে কোরবানি দেয়া হয়েছে।
মসীহের আগমনি বার্তা নিয়ে কালাম থেকে দু’টি স্থান তুলে ধরছি: “এই সমস্ত হবে, কারণ একটি ছেলে আমাদের জন্য জন্মগ্রহণ করবেন, একটি পুত্র আমাদের দেওয়া হবে। শাসন করবার ভার তাঁর কাঁধের উপর থাকবে, আর তাঁর নাম হবে আশ্চর্য পরামর্শদাতা, শক্তিশালী আল্লাহ্, চিরস্থায়ী পিতা, শান্তির বাদশাহ্” (ইশাইয়া ৯ : ৬), “এলিজাবেতের যখন ছয় মাসের গর্ভ তখন আল্লাহ্ গালীল প্রদেশের নাসরত গ্রামের মরিয়ম নামে একটি অবিবাহিতা সতী মেয়ের কাছে জিবরাইল ফেরেশতাকে পাঠালেন। বাদশাহ্ দাউদের বংশের ইউসুফ নামে একজন লোকের সংগে তাঁর বিয়ের কথাবার্তা ঠিক হয়েছিল। ফেরেশতা মরিয়মের কাছে এসে তাঁকে সালাম জানিয়ে বললেন, “মাবুদ তোমার সংগে আছেন এবং তোমাকে অনেক দোয়া করেছেন।” এই কথা শুনে মরিয়মের মন খুব অস্থির হয়ে উঠল। তিনি ভাবতে লাগলেন এই রকম সালামের মানে কি। ফেরেশতা তাঁকে বললেন, “মরিয়ম, ভয় কোরো না, কারণ আল্লাহ্ তোমাকে খুব রহমত করেছেন। শোন, তুমি গর্ভবতী হবে আর তোমার একটি ছেলে হবে। তুমি তাঁর নাম ঈসা রাখবে। তিনি মহান হবেন। তাঁকে আল্লাহ্তা’লার পুত্র বলা হবে। মাবুদ আল্লাহ্ তাঁর পূর্বপুরুষ বাদশাহ্ দাউদের সিংহাসন তাঁকে দেবেন। তিনি ইয়াকুবের বংশের লোকদের উপরে চিরকাল ধরে রাজত্ব করবেন। তাঁর রাজত্ব কখনও শেষ হবে না।” তখন মরিয়ম ফেরেশতাকে বললেন, “এ কেমন করে হবে? আমার তো বিয়ে হয় নি।” ফেরেশতা বললেন, “পাক–রূহ্ তোমার উপরে আসবেন এবং আল্লাহ্তা’লার শক্তির ছায়া তোমার উপরে পড়বে। এইজন্য যে পবিত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করবেন তাঁকে ইব্নুল্লাহ্ বলা হবে। দেখ, এই বুড়ো বয়সে তোমার আত্মীয়া এলিজাবেতের গর্ভেও ছেলের জন্ম হয়েছে। লোকে বলত তার ছেলেমেয়ে হবে না, কিন্তু এখন তার ছয় মাস চলছে। আল্লাহর কাছে অসম্ভব বলে কোন কিছুই নেই।” মরিয়ম বললেন, “আমি মাবুদের বাঁদী, আপনার কথামতই আমার উপর সব কিছু হোক।” এর পরে ফেরেশতা মরিয়মের কাছ থেকে চলে গেলেন ” (লুক ১ : ২৬–৩৮)।
খোদার নিজের সুরতে, নিজের সাথে মিল রেখে, তাঁর বাতেনী সত্ত্বা প্রকাশ্যে জাহির করার জন্য, নয়নের মণিতুল্য, স্বীয় প্রতিনিধি, মানুষ সৃষ্টি করেছেন। তাদের দোয়া করেছেন, প্রজাবন্ত ও বহুবংশ হয়ে গোটা বিশ্ব আবাদ করার জন্য। যেহেতু সকল মানুষ প্রথম আদমের ঔরষ হতে জাত, তাই আজ আমরা হযরত আদমকে ‘বাবা আদম’ বলে ডাকি। মনে রাখবেন, খোদা মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তিনি বিপরীতধর্মী কোন বিবদমান জাত–পাত সৃষ্টি করেন নি। মানুষ পতীত বিধায় তাদের উদ্ধারের জন্য এক চুড়ান্ত মূল্য পরিশোধ দিয়েছেন, স্বীয় কালাম কালেমাতুল্লাহর জীবন দিয়ে।
মসীহ ধরাপৃষ্টে আগমন করেছেন এবং নিজের পূতপবিত্র জীবন দিয়ে আমাদের পাপের কাফফারা পরিশোধ করেছেন, যে দাবি আজ আমরা প্রত্যয়ের সাথে দিকে দিকে ঘোষণা দিতে পারি।
তিনি যখন ধরাপৃষ্ঠে এসেছিলেন তখন না ছিল বৌদ্ধ জনগোষ্ঠি, না ছিল যৈন ধর্মের লোক, না ছিল হিন্দু মতাবলম্বী, না ছিল কোনো মুসলিম ধর্মবিশ্বাসী বলতে কোনো কিছু। তখন পৃথিবীটা ছিল পথভুলো অন্ধ জনগোষ্ঠিতে ভরা, যারা সত্য সুন্দরের পথ হাতড়িয়ে বেড়াত। মানুষের সাথে মানুষের কোনো মিল–তাল প্রেম সহমর্মীতা যে কতোটা ছিল তা বোধ করি ঐতিহাসিক গবেষক ব্যক্তিবর্গ অবগত আছেন।
মানুষের সাথে মানুষের কোনো মিলন ভ্রাতৃত্ত্বা বলতে কিছুই ছিল না, যেমনটা আজকে সমাজে পরিষ্কার দেখতে পাই। মানুষের হাতে মানুষের রক্ত ক্ষরিত হচ্ছে বিশ্বব্যাপী। জঘণ্য ঘটনা বলা চলে, কতিপয় বিভ্রান্ত ব্যক্তি মানুষকে জবেহ করা ঐশি আজ্ঞা বলে পালন করে আসছে। মানুষের পতনের পিছনে অভিশপ্ত ইবলিস যেভাবে নিয়ত কুমন্ত্রণা দিয়ে চলছে তা কিভাবে অস্বীকার করি বলুন।
খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসীহ হলেন বিশ্ববাসীর মুক্তিদাতা, মানুষের নাজাতদাতা, আর্তপীড়িত দুঃস্থ জনগোষ্ঠির মহানত্রাতা। তার কাছে আজ সকলেই সম–অধিকার লাভ করে থাকে। মসীহের কাছে কেউ কোনো বৈষম্য বা অসমতা দেখতে পায় নি। তিনি সকলকেই আত্মবত প্রেম করে থাকেন; তেমন পারষ্পারিক প্রেম তিনি আমাদের কাছ থেকেও প্রত্যাশা করেন ও প্রেরণা দিয়ে চলছেন। তিনিই হলেন আমাদের অনন্তকালীন রাজা, আশ্চর্য পরামর্শদাতা, শক্তিশালী আল্লাহ, চিরস্থায়ী পিতা ও শান্তির বাদশাহ। তাঁর মধ্যেই আজ আমরা জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলে ঐক্য ও প্রেমে হতে পেরেছি একাকার।



