ছাত্র–জনতার গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের স্থাবর–অস্থাবর সম্পত্তির বিবরণ জানার ব্যাপক কৌতূহল রয়েছে জনমনে। সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ফাঁসির দণ্ডাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেন। এরপর বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলাপ–আলোচনা শুরু হয়। কিভাবে কোন প্রক্রিয়ায় এবং কতদিনের মধ্যে সম্পদ বাজেয়াপ্ত হবে সে নিয়ে যেমন মানুষের কৌতূহল রয়েছে; তেমনি ওই সম্পদ জুলাই শহীদদের মালিকানায় কোন পদ্ধতিতে দেওয়া হবে তা নিয়ে জানার আগ্রহেরও কমতি নেই। এদিকে এখন পর্যন্ত নির্বাচনের জন্য হলফনামায় উল্লেখ করা সম্পত্তির বিবরণী ছাড়া প্রকৃত সম্পদের তথ্য জানা সম্ভব হয়নি। তবে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের জ্ঞাতআয়বহির্ভূত সম্পদের তথ্য অনুসন্ধান শুরু করেছে। ইতোমধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাজার কোটি টাকার অর্থ–সম্পদের ফিরিস্তি দুদকের হাতে চলে এসেছে। সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো যুগান্তরকে এমন তথ্য জানিয়েছে। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার রায়ে বলেন, শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামানের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হলো। এ মামলার জুলাই শহীদদের ‘কনসিডারেবল অ্যামাউন্ট অব কম্পেনসেশন’ (উল্লেখযোগ্য ক্ষতিপূরণ) দিতে সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হলো। আদালত এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে রায়ের কপি দেওয়ার নির্দেশ দেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, রায়ের কপি বের হওয়ার আগে সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া নিয়ে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা যাবে না।
কোন প্রক্রিয়ায় তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে এবং তা জুলাই আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্তদের বন্দোবস্ত দেওয়া হবে কিনা–তা রায়ের নির্দেশনায় যেভাবে থাকবে, ঠিক সেভাবেই বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে এসব সম্পদ নতুন করে কাউকে বন্দোবস্ত দিতে হলে সম্পদগুলো প্রথমে সরকারের অনূকুলে বাজেয়াপ্ত করে রেকর্ড সংশোধন করতে হবে। এরপর সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী এসব সম্পদ বন্দোবস্ত দেওয়া যাবে। জানতে চাইলে সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন যুগান্তরকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটা স্পেশাল ল’ আছে, সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার ক্ষেত্রে তারা সেটা ফলো করবেন। যেটা তারা পারবেন না, সেটা সিভিল প্রসিডিউর কোর্ট অনুসারে হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাজেয়াপ্ত করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনি প্রসিডিউর অনুযায়ী হবে। আমাদের ক্রিমিনাল ল’ অ্যামেনমেন্ট অ্যাক্টও আছে। এখন ট্রাইব্যুনাল পরিচালিত হয় স্পেশাল ‘ল’র মাধ্যমে। এই ‘ল’র মধ্যে হয়তো অ্যামেনমেন্ট হতে পারে। এই আইনের মাধ্যমেও তাদের প্রপার্টি অ্যাটাচমেন্ট করা যেতে পারে।’ বিভিন্ন সূত্রে খোঁজ নিয়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের সম্পদের সুনির্দিষ্ট তথ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা তাদের হলফনামা ও দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যে তাদের স্থাবর–অস্থাবর সম্পদের প্রাথমিক একটি চিত্র পাওয়া গেছে।
এরমধ্যে শেখ হাসিনার হলফনামায় উল্লিখিত সম্পদের তথ্য যে সঠিক নয় তা নিশ্চিত হয়ে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে গত মে মাসে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছে দুদক। জানা গেছে, ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন কমিশনে হলফনামা জমা দেন শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল। শেখ হাসিনা (গোপালগঞ্জ–৩) ও আসাদুজ্জামান খান কামাল (ঢাকা–১২) আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে জমা দেওয়া হলফনামায় তাদের ঘোষিত সম্পদের একটি চিত্র পাওয়া গেছে। হলফনামায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নিজের নামে ৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ দেখিয়েছিলেন। তখন নিজের হাতে নগদ অর্থ দেখান মাত্র সাড়ে ২৮ হাজার টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা টাকার পরিমাণ ছিল প্রায় ২ কোটি ৩৯ লাখ। এছাড়া ২৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ও ৫৫ লাখ টাকার স্থায়ী আমানত (এফডিআর) দেখানো হয়। শেখ হাসিনা তার হলফনামায় দেখানো তিনটি গাড়ির মধ্যে একটি উপহারের বলে উল্লেখ করেন। উপহারের গাড়িটির কোনো মূল্য দেখাননি। বাকি দুটির দাম উল্লেখ করেন সাড়ে ৪৭ লাখ টাকা। স্বর্ণ ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দাম দেখিয়েছেন ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং আসবাবের দাম ৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
এছাড়া নিজের নামে টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ সদর, গাজীপুর ও রংপুরে ১৫ দশমিক ৩ বিঘা কৃষিজমি দেখিয়েছেন। যার ক্রয়কৃত অংশের মূল্য দেখানো হয় ৬ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। হলফনামায় শেখ হাসিনা গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় তিনতলা ভবনসহ ৬ দশমিক ১০ শতক (আংশিক) জমির মালিকানা দেখিয়েছেন। এই জমির অর্জনকালীন মূল্য ৫ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়। দুদক জানায়, শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচনি হলফনামায় সম্পদের মিথ্যা তথ্য দেন। ওই সময় তিনি হলফনামায় নিজ নামে থাকা জমির পরিমাণ ৬ দশমিক ৫০ একর বলে ঘোষণা দেন। কেনার সময় এ জমির অর্থমূল্য দেখানো হয় ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। তবে অনুসন্ধানে দুদক জানতে পারে, ওই সময় শেখ হাসিনার নামে ২৮ একর ৪১ শতকের বেশি স্থাবর সম্পদ ছিল। দুদকের প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, গাজীপুর শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে মৌচাকের তেলিরচালা এলাকায় বাংলাদেশ স্কাউট প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পূর্ব পাশে ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়ক ঘেঁষে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের একটি বাগানবাড়ি আছে। স্থানীয় ভূমি অফিসের তথ্যমতে, ১৯৭০ সালের দিকে স্থানীয় এক ব্যক্তি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে এ জমি লিখে দেন। এরপর উত্তরাধিকার সূত্রে জমির মালিক হয়েছেন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। পরে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা জমির কিছু অংশ সন্তানদের লিখে দেন।
সেই সূত্রে মালিক হন শেখ হাসিনার সন্তান সজীব ওয়াজেদ ও সায়মা ওয়াজেদ এবং শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানার সন্তান রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ও আজমিনা সিদ্দিক। নথিপত্রে জমির পরিমাণ ২৯৭ শতক (৯ বিঘা)। এছাড়া ঢাকার পূর্বাচলে একটি প্লট রয়েছে শেখ হাসিনার নামে, যার দাম ৩৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তার নামে এবং তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ, ছোট বোন শেখ রেহানা (রেহানা সিদ্দিক), রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ও মেয়ে আজমিনা সিদ্দিকের (রূপন্তী) নামে পূর্বাচলে ১০ কাঠা করে ৬০ কাঠা প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে এসব প্লট বরাদ্দের অভিযোগে মামলা করেছে দুদক। আরও জানা গেছে, ঢাকার ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িটির মালিকানা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের হাতে রয়েছে। শেখ হাসিনার বাসভবন ধানমন্ডির সুধা সদনের মালিকানা রয়েছে সজীব ওয়াজেদ ও সায়মা ওয়াজেদের নামে।
কামালের যত সম্পদ : অবৈধপথে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে জানা যায়। তবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জমা দেওয়া হলফনামায় তার ঘোষিত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ খুব বেশি নয়। তখন হলফনামায় হাতে নগদ ৮৪ লাখ টাকার কিছু বেশি দেখান। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা দেখান ৮২ লাখ টাকার মতো। বন্ড ও শেয়ার ছিল প্রায় ২৪ লাখ টাকার। ডাকঘর, সঞ্চয়পত্র অথবা স্থায়ী আমানত দেখানো হয় ২ কোটি ১ লাখ টাকা। তার দুটি মোটরগাড়ির দাম ১ কোটি ৬১ লাখ টাকা। ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র ছিল ২ লাখ টাকার। তিনি ঋণ বাবদ ব্যবসার মূলধন দেখিয়েছিলেন ২ কোটি ২০ লাখ টাকা। স্বর্ণালংকার দেখান ১০ ভরি, তবে দাম উল্লেখ ছিল না। হলফনামা অনুযায়ী আসাদুজ্জামান খানের কৃষিজমির পরিমাণ ১৭১ শতাংশ (৫ বিঘার বেশি), যার অর্জনকালীন মূল্য ১ কোটি ৬ লাখ টাকা। অকৃষি জমি সাড়ে ১৮ শতাংশ, যার অর্জনকালীন মূল্য সাড়ে ৫৮ লাখ টাকা। তিনি বাড়ি ও অ্যাপার্টমেন্টের ঘরে দুটি সম্পদের মূল্য দেখিয়েছেন। একটি গ্রামের বাড়ি বলে উল্লেখ করেন, যার অর্জনকালীন মূল্য ৮০ লাখ টাকা।
আরেকটির মূল্য দেখান প্রায় ১৩ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে আসাদুজ্জামান খান কামালের মোট সম্পদের অর্থমূল্য ১০ কোটি ২৫ লাখ টাকা। তবে দুদকের প্রাপ্ত অনুসন্ধানে আসাদুজ্জামান খান কামালের জ্ঞাত আয়ের বাইরেও বিপুল সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। আদালতে জমা দেওয়া দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি অসাধু উপায়ে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ১৬ কোটি ৪২ লাখ টাকার সম্পদের মালিকানা অর্জন ও দখলে রেখেছেন।



