আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাঁর মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণাকে পক্ষপাতদুষ্ট ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে নিন্দা জানিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিষ্ক্রিয় করে দিতে অন্তর্বর্তী সরকারের একটি পন্থা হচ্ছে, তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া। এ রায় প্রত্যাখ্যান করেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। আজ মঙ্গলবার সারাদেশে সকাল–সন্ধ্যা শাটডাউন পালনের ঘোষণা দিয়েছে দলটি। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিক দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) এবং দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের ব্যানারে দেওয়া পৃথক বিবৃতিতে এই রায়কে ‘প্রহসনের রায়’ উল্লেখ করে প্রত্যাখ্যান করা হয়। ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা আগেই দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় এই বিচারকে প্রহসন বলে অভিহিত করেছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন তিনি। গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর শেখ হাসিনার পাঁচ পৃষ্ঠার একটি বিবৃতি আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রচারিত হয়। বিবৃতিতে শেখ হাসিনা বলেন, আমার বিরুদ্ধে আবারও যে রায় ঘোষণা করা হয়েছে, তা একটি কারচুপিপূর্ণ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রণীত এবং পরিচালিত হয়েছে। যার নেতৃত্বে ছিল একটি অনির্বাচিত সরকার।
যার কোনো গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট নেই। তারা পক্ষপাতদুষ্ট এবং রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিশৃঙ্খল, সহিংস এবং সামাজিকভাবে পশ্চাৎপসরণমূলক প্রশাসনের অধীনে কাজ করা লাখ লাখ বাংলাদেশি তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করার এই প্রচেষ্টা দ্বারা বোকা বানাতে পারবে না। তারা দেখতে পাচ্ছে, তথাকথিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) কর্তৃক পরিচালিত বিচার কখনোই ন্যায়বিচার অর্জন বা ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের ঘটনাবলির কোনো প্রকৃত অন্তর্দৃষ্টি প্রদানের উদ্দেশ্য ছিল না। বরং তাদের উদ্দেশ্য ছিল আওয়ামী লীগকে বলির পাঁঠা বানানো এবং ড. ইউনূস ও তাঁর উপদেষ্টাদের ব্যর্থতা থেকে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। বিবৃতিতে ড. ইউনূস সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বলা হয়, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে পড়েছে। ড. ইউনূস নির্বাচন বিলম্বিত করেছেন এবং তার পর দেশের দীর্ঘমেয়াদি দলকে (আওয়ামী লীগ) নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে নিষিদ্ধ করেছেন। এসব কিছুই আন্তর্জাতিক মিডিয়া, এনজিও ও আইএমএফের মতো নির্দলীয় সংস্থাগুলো দ্বারা প্রমাণিত এবং যাচাই করা হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, ইউনূসের বাকি আন্তর্জাতিক ভক্তদের মনে করিয়ে দিয়ে আমি এই উদ্বেগের সুর আরও বাড়িয়ে দিতে চাই, বাংলাদেশের একজনও নাগরিক তাঁকে ভোট দেয়নি বা তাঁকে সুযোগ দেওয়া হয়নি। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তার জনগণের। আগামী বছরের নির্বাচন অবশ্যই অবাধ, সুষ্ঠু এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে।
আওয়ামী লীগের প্রত্যাখ্যান, আজ সকাল–সন্ধ্যা শাটডাউন
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়কে প্রত্যাখ্যান করেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। সোমবার দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকের এ–সংক্রান্ত একটি ভিডিও বার্তা দলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রচার করা হয়েছে।
নানক বলেন, আজ যে রায় ঘোষণা করেছে, সে রায় বাংলার জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে। বাংলার জনগণ এ রায় মানে না, মানবে না।
তিনি বলেন, অবৈধ আদালত যে মামলার রায় দিয়েছে, সেটি ১৪ আগস্ট শুরু করে ১৭ নভেম্বর মামলা শেষ করেছে। ৮৪ জন সাক্ষীকে সামনে রেখে ৫৪ জনকে হাজির করে ২০ দিনে মামলা শেষ করেছে। এই দুই মাসের মধ্যে মাত্র ২০ দিন আদালত চলেছে। এর প্রধান বিচারক গত এক মাস অনুপস্থিত ছিলেন। তার পরও প্রতিশোধের লক্ষ্য নিয়ে মানুষের প্রিয় নেত্রীর বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন।
আওয়ামী লীগের এই জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, অচিরেই সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করব। রায়ের প্রতিবাদে মঙ্গলবার সারাদেশে সকাল–সন্ধ্যা শাটডাউন পালনের ঘোষণা দেন তিনি।
নিজের ফাঁসির নির্দেশ শোনা সহজ নয়: কামাল
সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। গতকাল রায় ঘোষণার পর তিনি আনন্দবাজার ডটকমকে বলেন, নিজের ফাঁসির নির্দেশ শোনা সহজ তো নয়ই, সহজ মনেও হয়নি। তবে কঠিন কিছুই হবে, সে কথা তো জানতামই।
তিনি আরও বলেন, গত এক বছরে বাংলাদেশে ঘটনাপ্রবাহ যে পথে এগিয়েছে, যেভাবে সবকিছু সাজানো হচ্ছিল, তাতে আমরা বুঝে গিয়েছিলাম এই রায়ই ঘোষিত হতে চলেছে। তাই চমকে যাইনি।
এর আগে দুপুরে ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনাল অবৈধ। যুদ্ধাপরাধীদের জন্য এটি গঠন করা হয়েছিল। সেই কোর্টে মুক্তিযোদ্ধাদের বিচার হবে, এটি অবিশ্বাস্য। আমি মনে করি, এই অবৈধ ট্রাইব্যুনাল এবং যারা বিচার করছেন, তারাও একটা দলের সমর্থক। কাজেই তারা কী রায় দেবে, আমরা আগে থেকেই জানি। আমরা মনে করি, বাংলাদেশের মানুষ এই রায় গ্রহণ করবে না।
রায়ের দণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা: জাসদ
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির এক বিবৃতিতে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে দেওয়া দণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য অসাংবিধানিক সরকারের ট্রাইব্যুনালের সাজানো মামলার রায় বর্তমান ও ভবিষ্যতে কখনোই গ্রহণযোগ্য হবে না। অনুপস্থিত অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রকৃত সুযোগ না দিয়ে সাজানো প্রক্রিয়ায় একপক্ষীয় ও একচেটিয়া রায়ের মামলা হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই কার্যক্রম ইতিহাসে কলঙ্ক হয়ে থাকবে। এতে বলা হয়, জনগণের সার্বভৌমত্ব ও সংসদের ক্ষমতা অস্বীকার করে অধ্যাদেশনির্ভর সংশোধিত আইনের অধীনে বিচার করা ও শাস্তি দানকে জাসদ কখনোই সমর্থন করে না।



