দেশের অর্থনীতির প্রধান লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়ক। বর্তমানে চালকদের কাছে এখন রীতিমতো আতঙ্কের নাম। মহাসড়কে নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, মিরসরাই, সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন এলাকায় অহরহ ঘটছে ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজির ঘটনা। দুর্ঘটনা ও হামলার শিকার হচ্ছেন ট্রাক–কাভার্ড ভ্যান, কনটেইনারবাহী গাড়ির চালকরা। আর ব্যবসায়ীরা কোটি টাকার মালামাল হারিয়ে হচ্ছেন সর্বস্বান্ত। সম্প্রতি দেশের ব্যস্ততম ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে ডাকাতি–ছিনতাই রোধে মানববন্ধন করেছে চালকরা। এ অবস্থায় চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ট্রাক–কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতি। প্রতিকার চেয়ে সমিতির পক্ষ থেকে পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) বরাবরে আবেদন জানানো হয়েছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ট্রাক–কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির হাজি মো. তোফাজ্জল হোসেন মজুমদার জানিয়েছেন, এসব অপরাধ চক্র সাধারণত রাতের অন্ধকারে কিংবা নির্জন এলাকায় পণ্যবাহী যানবাহনকে লক্ষ্য করে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ট্রাক থামিয়ে মালামাল লুট করে নেয়। অনেক ক্ষেত্রে চালক ও সহকারীদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালায়। এতে পরিবহন শ্রমিকসহ ব্যবসায়ীরাও সব সময় ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় রয়েছেন। বিশেষ করে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের মদনপুর থেকে মেঘনা পর্যন্ত সড়কটিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে চুরি, ডাকাতি ছিনতাইয়ের ঘটনা অহরহ ঘটছে। পাশাপাশি যানজটে আটকে থাকার সময় দুর্বৃত্তরা খুলে নিচ্ছে ব্যাটারিও। অন্যদিকে পণ্যবাহী গাড়িতে পূর্বের তুলনায় চাঁদাবাজির হার বৃদ্ধি পেয়েছে। যেখানে সেখানে গাড়ি থামিয়ে চাঁদা উত্তোলন করছে। তিনি বলেন, ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে সীতাকুণ্ড এলাকায় অপরাধ দমনের জন্য সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো বছরের অধিক সময় অকেজো অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ফেনী থেকে সীতাকুণ্ড পর্যন্ত সড়কের অংশে বিভিন্ন এলাকায় দিনে ও রাতে দুর্বৃত্তরা বিভিন্ন অজুহাতে পণ্যবাহী গাড়ি থামিয়ে চালককে মারধর করে টাকা পয়সা ও মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। করণীয় সম্পর্কে হাজি মো. তোফাজ্জল হোসেন মজুমদার বলেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য মহাসড়কে টহল বৃদ্ধি, হাইওয়ে পুলিশের কার্যক্রম শক্তিশালীকরণ, নির্দিষ্ট পয়েন্টে স্থায়ী চেকপোস্ট বসানো, অপরাধীদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং আটককৃতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা এবং ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের সিসি ক্যামেরাগুলো সচল করা এবং পণ্যবাহী গাড়ির থেকে চাঁদাবাজি বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি পণ্য পরিবহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সাধারণ পরিবহন শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে নিয়মিত চলাচলকারী একজন ট্রাক চালক জানিয়েছেন, ঢাকা থেকে আসার পথে চট্টগ্রামের মিরসরাই পার হওয়ার সময় বুক কাঁপে। আর সীতাকুণ্ড পার হতে পুরো শরীর কাঁপে। এখানে কখন কী হয়, সেই ভয়ে থাকি। তিনি জানান, ডাকাতদল চলন্ত গাড়িতে হঠাৎ লোহার রড ছুড়ে মারে। চালকরা যান্ত্রিক ত্রুটি ভেবে দ্রুত গাড়ি থামাতেই ডাকাতদল আক্রমণ করে। ছিনিয়ে নেয় যাত্রীদের সর্বস্ব। কোনো পেট্রোল পাম্পে গাড়ি থামিয়ে চালকরা ওয়াসরুম ব্যবহার বা বিশ্রাম করতে গেলে পড়তে হচ্ছে ছিনতাইকারীদের কবলে। এমন ঘটনা প্রতিরোধে প্রশাসনের যথাযথ ভূমিকা নেই বলে অভিযোগ করেন চালকরা। তবে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কে পণ্য ও যাত্রীবাহী গাড়িতে অহরহ ডাকাতির ঘটনা ঘটলেও তা মানতে নারাজ হাইওয়ে কুমিল্লা রিজিওয়নের দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, আগের তুলনায় পরিস্থিতি অনেকটা উন্নতি হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে হাইওয়ে পুলিশের টহল। ফলে তেমন কোনো বড় ঘটনা ঘটছে না।
দুই–একটি যা ঘটছে, সেগুলো চুরি–ছিনতাই। মহাসড়কে লাগাতার গাড়ি জিম্মি করে ডাকাতি করার কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। যেখানে যা ঘটুক, আমাদের পুলিশ দ্রুত সেখানে পৌঁছে যায়। এখন ডাকাতরা গাড়ি থামাতে পারে না। ফলে তেমন কোনো ডাকাতিও হয় না। এই পুলিশ কর্মকর্তার দাবি, বেশির ভাগ ঘটনা প্রতারক চক্রের। এসবের সঙ্গে জড়িত থাকে চালকরাও। অথচ এ পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্যের উলটো চিত্র পাওয়া গেছে স্থানীয় ও পরিবহন মালিক–শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে। তারা জানিয়েছেন, মহাসড়কে আড়াআড়িভাবে গাড়ি রেখে যানজট তৈরি করে, লোহার তৈরি ধারালো পাত ফেলে গাড়ি থামাচ্ছে ডাকাতরা। এরপর অস্ত্রের মুখে কেড়ে নিচ্ছে সর্বস্ব। এছাড়াও স্ক্রাপবাহী লরিতে ওঠে লোহা ছিনতাই করছে শতাধিক সদস্যের একটি চক্র।



