বিগত ১৭ বছর শুনেছেন উন্নয়নের ফিরিস্তি। নির্বাচন এলে নেতাদের জনদুর্ভোগ দূর করার প্রতিশ্রুতি আর সরকারি দপ্তরের আশ্বাস। এর ভিড়ে বার বার হারিয়ে যায় বিয়ানীবাজার উপজেলার বরুরদল নদীর ওপর ২০ হাজার বাসিন্দার প্রত্যাশিত সেতুটির কথা। ক্ষোভ নিয়ে কথাগুলো জানালেন বিয়ানীবাজার উপজেলার বিবিরাই গ্রামের কয়েক তরুণ বাসিন্দা। তারা বলেন, উপজেলার এই অংশের বাসিন্দারা প্রান্তিক কৃষি ও নানামুখী বাণিজ্যিক কার্যক্রমের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙা রেখেছেন বহু কষ্টে। এই সমস্যা ও এর সমাধানের মাঝে একটি সেতুর দূরত্ব শুধু। বহুবার বিভিন্ন পর্যায় থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকেও মিলছে আশ্বাস। তবে বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেই। সেটি যেন এই আশ্বাস আর প্রতিশ্রুতির ভারে চাপা পড়েছে। উপজেলার বরুরদল নদীর দুই পারে রয়েছে বিস্তৃত জনবসতি। এর মাঝে তিলপাড়া ইউনিয়নের বিবিরাই, বিলবাড়ি ও কালাইন এবং পার্শ্ববর্তী গোলাপগঞ্জ উপজেলার একাংশসহ অন্তত ১০টি গ্রামের ২০ হাজার মানুষ দীর্ঘ দিন ধরে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে; যার সমাধান হতে পারে ওই বরুরদল নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের মাধ্যমে। স্থানীয়রা বলছেন, একটি নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোর ওপর ২০ হাজার মানুষের নিত্য জীবনের পথচলা নির্ভর করছে। যেকোনো সময় প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। শিশু শিক্ষার্থীরা এই সাঁকো ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করে।
ব্যবসায়ী ও কৃষকরা পণ্য নিয়ে নদী পারাপারে সময় ও অর্থ দুটোই বেশি ব্যয় করছেন। প্রান্তিক কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বলেন, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় উপজেলার ওই অংশ অন্তত ১০টি গ্রামের কৃষক উৎপাদিত পণ্য সরবরাহের ব্যাপ্তি বাড়াতে পারছেন না। স্থানীয় ছোট ও পাইকারি পণ্যের ব্যবসায়ীরা পণ্য পরিবহন ও সরবরাহে বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন; যা সার্বিকভাবে তাদের অগ্রগতিকে পিছু টেনে ধরেছে। সেতুর অভাবে সড়ক যোগাযোগ গড়ে না ওঠায় উন্নয়নবঞ্চিত রয়েছে এসব এলাকা। বিয়ানীবাজার উপজেলার সীমান্তঘেঁষা বরুরদল নদী এলাকায় গিয়ে জানা যায়, ওই অংশে গ্রামবাসী নিজ উদ্যোগে যাতায়াতের জন্য বাঁশের সাঁকো তৈরি করেছেন। এ সাঁকো দিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষ পারাপার করেন। বিশেষ করে মহিলা ও স্কুল–কলেজগামী শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়েন। সাঁকো পারাপারে প্রায়ই ঘটে দুর্ঘটনা। তাছাড়া জেলা শহর সিলেট যাওয়ার অন্যতম সহজ মাধ্যম হওয়ায় এই সড়ক দিয়ে সাধারণ মানুষের যাতায়াত বেশি। বর্ষা মৌসুমে নিমেষেই নদীসহ আশপাশের এলাকা তলিয়ে যাওয়ার কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
গত ৫৪ বছরে এসব এলাকায় উন্নয়নে ছোঁয়া লাগলেও বিবিরাই, বিলবাড়ি, কালাইন গ্রামসহ পার্শ্ববর্তী গোলাপগঞ্জ এলাকার বেশ কিছু অংশ অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছে। এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত সময়ের মধ্যে এখানে একটি সেতু নির্মাণ করা। বিবিরাই গ্রামের বাসিন্দা দুবাই প্রবাসী আলিম উদ্দিন বলেন, এখানে একটি সেতু নির্মাণ হলে এ অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ কমবে এবং ভাগ্য বদলে যাবে। একই এলাকার এবাদ আহমদ বলেন, গ্রামের মুরব্বিদের সঙ্গে নিয়ে বিগত বছরগুলোতে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, সাবেক এমপি সৈয়দ মকবুল হোসেন লেচু ও শফর উদ্দিন খসরুর কাছে সেতু নির্মাণের দাবিতে স্মারক দেওয়া হয়েছে দফায় দফায়। প্রত্যেকে আশ্বাস দিয়েছেন, সেতু দেননি কেউ। তিলপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান মাহবুবুর হরমান বলেন, বরুরদল নদীর ওপর সেতু হলে যোগাযোগসহ এলাকার সর্বস্তরের মানুষের ব্যবসা–বাণিজ্য প্রসারিত হবে। একই সঙ্গে মুমূর্ষু রোগীদের উপজেলা সদরে নিতে ব্যাপক ঝুঁকি নিতে হয়। গত পয়ত্রিশ বছরে নির্বাচিত তিনজন সংসদ সদস্যের কেউ একটা সেতু এই এলাকার মানুষকে দিতে পারেননি। এদিকে সেতু নির্মাণের জন্য বিগত বছরগুলোতে উপজেলার মাসিক সমন্বয় সভায় বার বার দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
এই ২০ হাজার মানুষের ভোট মনে হয় কেউ চান না। উপজেলা প্রকৌশীল দীপক কুমার দাস বলেন, বরুরদল নদীতে প্রায় ৪০ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মিত হলে দুই উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষ উপকৃত হবে। এই এলাকার জনবল উন্নয়নে নদীর ওপর সেতু জরুরি। এরই মধ্যে এখানে সেতু নির্মাণের জন্য স্থানীয়রা দাবি জানিয়েছেন। একশ মিটার সেতু নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় এখানে সেতু নির্মাণ করার প্রাথমিক প্রস্তাবনা তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে শিগগিরই।



