কিছু ফুল, উদ্ভিদ বা ফলের নাম–পরিচয় নিয়ে যথেষ্ট বিভ্রান্তি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুল নামের আড়ালে চাপা পড়েছে মূল নাম। মাধবীলতা ও মধুমঞ্জরির ক্ষেত্রে এমন ভুল একেবারে শিকড় গেড়ে বসেছে যেন। গাছ বিক্রেতা থেকে মালী বা বৃক্ষপ্রেমী—প্রায় সবাই এই ভুলের ভেতর ডুবে আছেন। মধুমঞ্জরিলতা সবার কাছে মাধবীলতা নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে! এমন আরও অনেক ফুলের কথা বলা যাবে। ইদানীং কনকচাঁপার সঙ্গে পেস্তাবাদামের নাম জড়িয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত তো বটেই রীতিমতো ধোঁকা দেওয়া হচ্ছে। আপনি কোনো নার্সারিতে গিয়ে পেস্তাবাদামের গাছ চাইলে ওরা নির্ঘাত আপনাকে একটি কনকচাঁপার গাছ গছিয়ে দেবে। বাড়ি এসে মনের আনন্দে সে গাছ রোপণ করার দু–তিন বছর পর বুঝতে পারবেন এটা পেস্তাবাদাম নয়, অন্য কিছু। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও চমকপ্রদ তথ্য হলোÑ আমাদের দেশে তো বটেই, এই উপমহাদেশের কোথাও পেস্তাবাদাম হয় না।
জানামতে, দেশের কোথাও কোনো পেস্তাবাদামের গাছ নেই। নার্সারিওয়ালারা সে সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছেন! তবে এ কথাও সত্যি, দেশের প্রায় শতভাগ মানুষই কনকচাঁপা চেনেন না। যে কারণে মানুষকে বোকা বানানো সহজ হয়েছে। আদতে কনকচাঁপার সঙ্গে পেস্তাবাদামের ফুল, ফল বা পাতার কোনো সাদৃশ্য নেই। এমনকি আঙ্গিক গড়নের দিক থেকেও গাছ দুটি আলাদা। কনকচাঁপা ওকনায়েসি এবং পেস্তাবাদাম এনাকার্ডিয়েসি পরিবারের উদ্ভিদ। অর্থাৎ দুটি গাছের পরিবারও ভিন্ন। কনকচাঁপা ছোট গাছ, কিন্তু পেস্তাবাদাম ১০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। এত বৈপরীত্য থাকার পরও কনকচাঁপা কীভাবে পেস্তাবাদাম হয়ে উঠল, তা বোধগম্য নয়। দুটি গাছকে আলাদাভাবে চেনানোর জন্য ছবি উপস্থাপনের পাশাপাশি সংক্ষিপ্ত পরিচিতিও তুলে ধরা আবশ্যক। কনকচাঁপা আমাদের বনপাহাড়ে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো দুষ্প্রাপ্য বৃক্ষ। দুর্লভ হওয়ার কারণে ফুলটি আমাদের কাছে নামে যতটা পরিচিত, অবয়বে ঠিক ততটা নয়।
প্রাচীন মৈমনসিংহ গীতিকায়ও এ ফুলের উল্লেখ আছে— ‘হাঁট্যা না যাইতে কন্যার পায়ে পড়ে চুল/ মুখেতে ফুট্টা উঠে কনক চাম্পার ফুল।’ কনকচাঁপা রূপে, গন্ধে, প্রাচুর্যে অনন্য, অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ঢাকায় আছে মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি। বলধা গার্ডেন, শিশু একাডেমির বাগান, চারুকলা প্রাঙ্গণ ও রমনা পার্কে বসন্তে কনকচাঁপার দুর্লভ প্রস্ফুটন চোখে পড়ে। বলধা গার্ডেনের গাছ থেকে সংগৃহীত চারা শিশু একাডেমির বাগানে রোপণ করেন কথাসাহিত্যিক ও নিসর্গী বিপ্রদাশ বড়ুয়া। এই গাছেরই চারা রমনা পার্কে রোপণ করেছিলেন অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা। এভাবেই আমাদের চারপাশে কিছু কনকচাঁপা ছড়িয়ে পড়েছে। তবে সংখ্যায় খুবই নগণ্য। অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা তাঁর শ্যামলী নিসর্গ গ্রন্থে একসময়ের হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালের ফটকের কাছাকাছি যে গাছটির সন্ধান দিয়েছেন, বর্তমানে তা আর নেই। কনকচাঁপা (Ochna obtusata) ছোটখাটো ধরনের গাছ। কাণ্ডÐমসৃণ ও বাকল ধূসর রঙের। মাথার দিকে ডালপালাগুলো কিছুটা ছড়ানো ধরনের। শীতের শেষে সব পাতা ঝরে পড়ে। আবার বসন্তের একটু ছোঁয়া পেলেই যেন প্রাণ ফিরে আসে। তখন তামাটে রঙের কচি পাতাগুলো হাওয়ায় দোল খায়। এর পরপরই হলুদ সোনালি রঙের সুগন্ধি ফুলগুলো ফুটতে শুরু করে। পরাগ রেণুর প্রলোভনে ছুটে আসে ভোমরার দল। এদের মঞ্জরি ছোট হলেও সংখ্যায় অজস্র। হলুদ পরাগচক্রে বহু কেশরের সমাহার। কিন্তু দিন কয়েক যেতে না যেতেই নিঃশেষ হয়ে আসে ফুল। গাছতলায় তখন শুধুই ঝরা ফুলের রোদন। ফুল ঝরে পড়ার পর লালচে ঢাকনার ভেতর গোল গোল ফল হয়। এই গাছের শিকড় দীর্ঘ ও আঁকাবাঁকা। সাঁওতালরা এই শিকড় সর্পদংশনের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার করেন।
ছালের রস হজমিকারক। কাঠ শক্ত এবং লাঠি, খুঁটি ইত্যাদির উপযুক্ত। পেস্তাবাদামগাছ (Pistacia vera) ১০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। ইংরেজি নাম পিস্টাসিও। পাতা ১০ থেকে ২০ সেন্টিমিটার লম্বা। পুরুষ ও স্ত্রী গাছ আলাদা। ফুলগুলো পাপড়িবিহীন। ফলের খোসা ক্রিম রঙের এবং শক্ত। ভেতরে একটি লম্বা বীজ থাকে, যা বাদাম হিসেবে খাওয়া হয়। বীজের মূল খাদ্যাংশে হালকা সবুজ রঙের স্বতন্ত্র স্বাদযুক্ত শাঁস থাকে। ফল পাকলে হলুদ বা লালচে রং ধারণ করে এবং আপনা–আপনি আংশিকভাবে খুলে যায়। সবুজাভ রং, ঈষৎ সুগন্ধ এবং ভালো সংরক্ষণ গুণের জন্য পেস্তাবাদাম অধিক জনপ্রিয়। একই কারণে অন্যান্য বাদামের তুলনায় এই বাদাম অনেক দামি। পেস্তাবাদাম ইরান, চীন, আফগানিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি প্রভৃতি দেশে প্রাকৃতিকভাবে জন্মে। দামি খাবারের প্লেট সাজানোর কাজে এই বাদাম ব্যাপক হারে ব্যবহৃত হয়। মিষ্টি, আইসক্রিম, পুডিংসহ বিভিন্ন খাবারের উপকরণেও পেস্তাবাদামের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। এই বাদাম থেকে তৈরি তেল চর্মরোগের ওষুধ হিসেবে ব্যবহার্য।



