মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে এসব স্কুলে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী কমেছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, নিয়ম অনুযায়ী এসব স্কুলে ৩০ থেকে ৩৬ হাজার শিক্ষার্থী থাকার কথা। গত ৩ বছরের চিত্রে দেখা গেছে, এসব স্কুলে ক্রমান্বয়ে কমছে শিক্ষার্থী সংখ্যা। ২০২৩ সালে ১৭৫ স্কুলে শিক্ষার্থী ছিল ২৬ হাজার ৭৮৯ জন (প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত)। ২০২৪ সালে তা কমে দাড়ায় ২১ হাজার ৩৬০ জনে। ২০২৫ সালে শিক্ষার্থী সংখ্যা নেমে আসে ১৬ হাজার ৬৬১ জনে। এর বিপরীতে এসব স্কুলে সহকারী শিক্ষক কর্মরত রয়েছে প্রায় এক হাজার। পদ শূন্য রয়েছে ৫ জনের। ১৭৫ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৭৫ জন প্রধান শিক্ষক কর্মরত থাকার কথা থাকলেও কর্মরত রয়েছে মাত্র ৭২ জন।অবসর ও মৃত্যুজনিত কারণে ১০৩ জনের শূন্য পদে ৪৩ জনকে পদায়ন করে ‘ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের’ দায়িত্ব দেওয়া হলেও এখনও ৬০ জন প্রধান শিক্ষকের পদ একেবারেই শূন্য। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় ও শিক্ষার্থীরা বলছেন, স্কুলের অব্যবস্থাপনা, শিক্ষক সংকটসহ নানা কারণে এসব স্কুলের প্রতিবছর কমছে শিক্ষার্থী সংখ্যা। কিছু কিছু স্কুলে চকচকে ভবন, ক্লাসরুম, অফিসকক্ষ থাকলেও নেই পর্যাপ্ত শিক্ষক।
এ কারণেই মূলত দিন দিন কমছে শিক্ষার্থী সংখ্যা। স্কুলে শিক্ষার্থী না থাকায় ইচ্ছে দায়িত্বরত শিক্ষকরাও ‘ইচ্ছেমতো ছুটি কাটান’। এসব স্কুলের সমস্যাগুলো চিহিৃত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ওই অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থায় আগামীতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। এদিকে কয়েকটি স্কুলে সরেজমিনে অনুসন্ধানে গিয়ে এসব স্কুলের নানা অব্যবস্থাপনার চিত্র দেখা গেছে ।

মাগুড়া পীর ফকিরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
কিশোরগঞ্জ উপজেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মাগুড়া পীর ফকিরপাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়। ওই স্কুলে দেখা গেছে দোতলা দৃষ্টিনন্দন ভবন। তবে ভবনটির কাছে গিয়েও বোঝার উপায় নেই এটি স্কুল নাকি অন্য কিছু। ভবনের সামনে দেখা গেছে সুনসান নীরবতা। স্কুলের ভেতরে প্রবেশ করে দেখা যায়, একজন সহকারী শিক্ষিকা পঞ্চম শ্রেণীর ক্লাস নিচ্ছে ক্লাসে মোট ৫ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত রয়েছে। ভেতরে যেতে যেতে চোখে পড়লো আরও একটি কক্ষ। সেখানেও একজন শিক্ষক ক্লাস নিচ্ছেন। যেখানে মাত্র চারজন শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন। ওই স্কুলের চতুর্থ শ্রেণিতে কোনো শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল না। বিষয়টি জানতে চাইলে প্রধান শিক্ষক মাবিয়া বেগম বলেন, চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা একটু বাইরে গেছে। ক্লাস রেখে বাইরে কেন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি তাদেরকে ডাকছি। আসলেই ক্লাস শুরু করা হবে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম কেন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, অনেকের জ্বর তাই তারা আসতে পারেনি।
পুষনা শহীদ শরিফুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়
এই স্কুল মাঠের দক্ষিণে দেখা গেছে বিশাল একটি গর্ত যে কোনো মুহূর্তে ওই গর্তে পড়ে বিপদের শঙ্কা রয়েছে। এছাড়াও বিদ্যালয়টির মেইন গেটের সামনে হাঁটু সমান কাঁদা পানি এবং স্কুলটির চারদিকে ঘিরে আছে বড় বড় ডোবা। ডোবার পানিগুলো দুর্গন্ধযুক্ত, পানিগুলোতে মশা মাছিসহ বিভিন্ন ময়লা আর্বজনায় ভরপুর। এককথায় নোংরা পরিবেশ। এরপরে বিদ্যালয়টিতে প্রবেশ করে দেখা যায় দুইজন সহকারী শিক্ষিকা ক্লাস নিচ্ছেন। একটি ক্লাসে চারজন ও অন্য একটি ক্লাসে ৬ জন। এসময় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মকছুদার রহমান জানান, এই বিদ্যালয়টি ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠা হয়েছে। বিদ্যালয়টিতে আগে ১১০ জন শিক্ষার্থী ছিল। কিন্তু বর্তমানে কাগজে কলমে ৬৫ জন শিক্ষার্থী ভর্তি রয়েছে। এ বিপরীতে মোট শিক্ষকের পদ ৬টি। এর মধ্যে প্রধান শিক্ষকের পদটি শূন্য। ৫ জন শিক্ষকের মধ্যে ৪ জন উপস্থিত থাকলেও অপর শিক্ষক ছুটিতে ছিলেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই বিদ্যালয়ের একজন অভিভাবক বলেন, বিদ্যালয়টিতে প্রতিদিন গড়ে দুই শিফটে ১৫ থেকে ২০ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকে। এখানে কোনো পড়ালেখা হয়না। তাই শিক্ষার্থী আসে না।
মন্থনা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়
এই স্কুলে গিয়ে দেখা গেছে, পঞ্চম শ্রেণিতে মোট ৩ জন শিক্ষার্থী, চতুর্থ শ্রেণিতে ৪ জন ও তৃতীয় শ্রেণিতে ৫ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত রয়েছে। ওই বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষকের পদ ৬টি। এর মধ্যে কর্মরত ৫ জন। উপস্থিত ছিলেন ৩ জন শিক্ষক। বাকি দুই জন শিক্ষকের মধ্যে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে থাকা জেসমিন আক্তার ও মিজানুর রহমান নৈমিত্তিক ছুটিতে রয়েছে। এসময় হাজিরা খাতা ঘেঁটে দেখা যায়, মিজানুর রহমান নামের সহকারী শিক্ষক গত জুলাই মাসে একটানা ৬ দিন এবং আগস্ট মাসে একটানা ১ তারিখ থেকে ১১ তারিখ পর্যন্ত বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত। এছাড়াও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জেসমিন খাতুনও নৈমিত্তিক ছুটি নিয়ে অনুপস্তিত।
ঘোনপাড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে
এদিকে পুটিমারী ইউনিয়নের ঘোনপাড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে একই চিত্র দেখা গেল একই চিত্র। এ সময় এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, স্কুলের প্রধান শিক্ষক বাড়ি ও স্কুলের দুরুত্ব হওয়ার কারণে বিদ্যালয়ের বারান্দা ও রুমগুলোর ভেতরে সংসারের জিনিসপত্র রাখেন। প্রধান শিক্ষক আনোয়ার হোসেন বলেন, আমার বিদ্যালয়ের ২০ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থী জ্বরে আক্রান্ত। তাই তারা আসতে পারেনি। স্কুল মাঠে ও বারান্দায় সাংসারিক উপকরণ রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, আমার ভুল হয়েছে আগামীতে আর রাখবো না। স্কুলে শিক্ষার্থী অনুপস্থিতির বিষয়টি স্বীকার করে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ড. মোসা. মাহমুদা খাতুন বলেন, যদি শিক্ষকরা সচেতন না হয় তাহলে কখনই প্রাথমিকের মান উন্নয়ন সম্ভব নয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রাথমিকে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য, মিডডে মিল বন্ধ এবং অলস শিক্ষক এর জন্য দায়ী। আমি জেনেছি অনেক শিক্ষক ঠিকমতো স্কুলে আসে না। অনেকেই একটু কিছু হলেই নৈমিত্তিক ছুটি নেন। আমি খুব দ্রুত বিষয়গুলোর খোঁজ খবর নিব। উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রীতম সাহা বলেন, আমি বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব। সম্প্রতি আমি প্রধান শিক্ষকদের নিয়ে মিটিং করলাম।
মিটিংয়ে তাদের নানা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে ও শিক্ষার্থীদের শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নীলফামারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কুমারেশ চন্দ্র গাছি বলেন, বিষয়গুলো ইতোমধ্যে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে। আমি নিজেই স্কুলগুলো পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নেব। এখন থেকে কেউ ছুটি নিলে ছুটির কারণ নির্দিষ্ট করে জানাতে হবে। বিদ্যালয়গুলোতে কিভাবে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়, সে ব্যাবস্থা নেওয়া হবে।