পিরোজপুর জেলার বাণিজ্যিক, শিল্পসমৃদ্ধ এবং সুন্দরবনের সুন্দরী কাঠ খ্যাত দ্বিতীয় বৃহৎ উপজেলা স্বরূপকাঠি (নেছারাবাদ)। আর এ উপজেলারই নানাদিক থেকে ঐতিহ্যবাহী ও সমৃদ্ধ একটি ইউনিয়নের নাম ‘আটঘর–কুড়িয়ানা’। এখানে শত বছরের স্বরূপ বা স্বরূপকাঠি জাতের উৎপাদিত পেয়ারা এখনো দেশখ্যাত। স্বাদ ও পুষ্টিগুণের জন্য স্বরূপকাঠি জাতের পেয়ারার খ্যাতি রয়েছে। বাংলার ‘আপেল’খ্যাত স্বরূপকাঠি জাতের এ পেয়ারার দাম তুলনামূলক কিছুটা কম হওয়ায় এর স্বাদ নিতে পারছেন সাধারণ মানুষসহ প্রায় সব শ্রেণি ও পেশার লোকজন। বর্তমানে চলছে পেয়ারার ভরা মৌসুম। আটঘর কুড়িয়ানা ইউনিয়নে ১০–১২টি ভাসমান হাটে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে পেয়ারার বেচাকেনা। ছোট ছোট ডিঙি নৌকায় করে ভাসমান ওইসব হাটে পেয়ারা বিক্রি করেন চাষিরা।
এদিকে পেয়ারা মৌসুমে স্বরূপকাঠির আটঘর কুড়িয়ানা পেয়ারা বাগান ভ্রমণে আসা দেশি–বিদেশি শত শত পর্যটক ও দর্শনার্থীর পদচারণায় এখন সরগরম। বিশেষ করে ছুটির দিন শুক্র ও শনিবার পর্যটকের সমাগম ঘটে পেয়ারা বাগানে। পরিণত হয় এক মহামিলনে। ছোট ছোট পরিখায় নৌকা ও ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে চড়ে পেয়ারা বাগানে ঘুরে বেড়ান তরুণ–তরুণীসহ নানা বয়সের ভ্রমণপিপাসু মানুষ। গ্রামীণ জনপদে বিনোদনপ্রেমীদের জন্য মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পেয়ারা বাগান দিনে দিনে পরিণত হচ্ছে আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে। বেসরকারি উদ্যোগে ইতোমধ্যে আটঘর কুড়িয়ানার আদমকাঠিতে পেয়ারা বাগানের মধ্যে গড়ে উঠেছে ফ্লোটিং পেয়ারা পার্ক, ন্যাচারাল টুরিজম অ্যান্ড পিকনিক স্পট ও রিয়ান পেয়ারা পার্ক নামে তিনটি মিনি পর্যটনকেন্দ্র।
পেয়ারা বাগানের মনোরম দৃশ্য উপভোগের জন্য এসব পার্কে রয়েছে ওয়াচ টাওয়ার, কাঠের উড়াল সেতু, শিশুদের বিনোদনের জন্য রয়েছে দোলনা, স্লিপার রাইডস ইত্যাদি। যদিও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগত পর্যটকদের জন্য বেশ কয়েকটি বিধিনিষেধ আরোপ করায় বাগানের পরিবেশ ও নৌপথে শৃঙ্খলা ফিরে আসতে শুরু করেছে। বিশেষ করে বরিশাল, ঢাকা, খুলনা, যশোর, বাগেরহাট ও পেয়ারা বাগান সন্নিহিত বিভিন্ন উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী এবং বিভিন্ন বয়সের ভ্রমণপিপাসুরা বিনোদনের জন্য সময় পেলেই বেড়াতে আসেন এ বাগানে। সেই সঙ্গে আসছেন বিদেশি নারী–পুরুষও, তুলছেন সেলফি, ক্যামেরায় বন্দি করছেন প্রকৃতির সঙ্গে নিজেদের যুগল ছবি। স্মরণীয় করতে পেয়ারা গাছের বাঁকা ডালগুলোয় শখের বশে উঠে নিজ হাতে পাড়ছেন টসটসে পাকা পেয়ারা।
বাগানের প্রবীণ চাষীদের সূত্রমতে, অন্তত ২০০ বছর আগে পেয়ারার চাষাবাদ শুরু হলেও বিগত ৭৫–৮০ বছরকাল থেকে চলছে পেয়ারার বাণিজ্যিক আবাদ। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, স্বরূপকাঠি উপজেলার আটঘর, কুড়িয়ানা, আদমকাঠিসহ প্রায় ২৭টি গ্রামে ৬০১ হেক্টর জমিতে পেয়ারার চাষাবাদ হয়। পেয়ারার চাষাবাদ ও বিপণনব্যবস্থার সঙ্গে প্রায় ৮ হাজার শ্রমজীবী মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থেকে জীবন–জীবিকা নির্বাহ করছেন। আটঘর কুড়িয়ানা ইউনিয়নের ইউপি সদস্য ও পেয়ারা চাষি বাবুল চন্দ্র মন্ডল ও ব্রাহ্মণকাঠি গ্রামের চাষি বিশ্বজিত চৌধুরীসহ অনেক চাষি জানান, এ বছর পেয়ারার ফলন তুলনামূলক কম হয়েছে। বর্তমানে মনপ্রতি পেয়ারা পাইকারিভাবে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পেয়ারার এ মৌসুমে ঢাকা, চাঁদপুর, সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের পাইকাররা এখান থেকে সরাসরি পেয়ারা ক্রয় করে নিয়ে যান। অপরপক্ষে, স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও প্রতিদিন শত শত মন উৎপাদিত পেয়ারা এখান থেকে ট্রলার ও ট্রাকে দেশের বিভিন্ন স্থানে চালান দেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাহফিজুর রহমান বলেন, এ বছর হেক্টরপ্রতি প্রায় ১০ টন পেয়ারা ফলনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আটঘর কুড়িয়ানায় সারা বছরই কমবেশি দেশি–বিদেশি পর্যটক আসেন ভ্রমণ ও মুগ্ধতা নিতে। এখানে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা হলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের দ্বার খুলে যেতে পারে বলেও মনে করছেন তারা।