বিভীষিকাময় বিধ্বংসী মারণাস্ত্র নিজেদের হাতেই সৃষ্টি করা হয়েছে, আর তা হলো নিজেদের বিনাশ সাধন করার জন্য! এমন মরণ খেলা শুরুতেই শুরু হয়েছে প্রথম মানুষ আদমের দ্বারা। মাবুদ মাওলা হলেন মহব্বতের অফুরাণ পারাবার, যার কাছে সহজেই অপ্রত্যাশিত ক্ষমা ও পুণর্মিলন লাভ করে থাকে প্রত্যেক অনুতপ্ত ও গুনাহগার বান্দা। তিনি নিজেই তেমন ঘোষণা দিয়ে ফিরছেন যুগকলাপ ধরে। মাবুদের মহব্বত ও ক্ষমাধনের বিষয়ে আপনি কি সুনিশ্চিত হতে চান? জানতে হলে আপনাকেই পদক্ষেপ নিতে হবে, যেমন জীবনের প্রথম দিনের প্রেম প্রকাশ করার জন্য আপনার ভূমিকা হবে অতীব তাৎপর্যবহ। আপনার হৃদয় নি:সৃত প্রেম আপনাকেই প্রকাশ করতে হবে।
অবশ্য, মাবুদ যে আমাদের প্রেম করেন তা তিনিই প্রথমে আমাদের কাছে প্রকাশ করেছেন, আমরা তখনও গুনাহের অতলে ডুবন্ত ছিলাম; তিনিই প্রথমে আমাদের প্রেম করেছন এবং আমাদের গুনাহের কবল থেকে অবমুক্ত করার জন্য এক চূড়ান্ত মূল্য পরিশোধ করেছেন স্বীয় একজাত পুত্র খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসীহের বেগুনাহ রক্তক্ষরণের মাধ্যমে। পাপের বেতন মৃত্যু, আর সেই মৃত্যু আমাদের বরণ করা অত্যাবশ্যক হয়ে দাড়িয়েছিল। কিন্তু আমাদের বেহেশতি পিতা আমাদের বিকল্প এক পবিত্র মেষেরে কোরবানীর ব্যবস্থা করলেন যার ফলে বিশ^াসহেতু অনুতপ্ত গুনাহগার পেয়ে গেল মাগফেরাত (ইউহোন্না ১ : ২৯, ১পিতর ১ : ১৯–২০)।
পাপির মৃত্যুতে তিনি অনন্দ পেতে পারেন না (ইহিস্কেল ৩০ : ১১, ১৮ : ২৩ ও ৩২)। মানুষের ধ্বংসবিনাশ হলো কেবল ইবলিসের কুঅভিলাষ। ইবলিস যেমন একদিকে খোদার দুষমণ আর একদিকে মানুষের আজনম শত্রু। মানুষের সাথে ইবলিসের শত্রুতার প্রধান কারণ আপনাকে জানতে হবে। আসলে ইবলিস ছিল প্রধান ফেরেশতা। খোদার প্রতিনিধি আদমকে সৃষ্টি করার পরে তিনি (খোদা) সকল ফেরেশতাদের আহ্বান জানালেন, আদমকে সম্মান দেখাবার জন্য। সকল ফেরেশতা আদমকে সালাম জানালেও প্রধান ফেরেশতা আত্ম–অহমিকা বশঃত মাটির সৃষ্টি আদমকে সম্মান দেখাতে অনিহা প্রকাশ করলো; যার ফলে প্রধান ফেরেশতা অহংবোধে এতটাই অন্ধ হয়ে গেল, মাটির আদমকে সম্মান দেখালো না, উপরন্ত খোদার হুকুম পর্যন্ত বরখেলাপ করে বসলো। কথায় বলে, অহংকারে আজাজিলের সৃষ্টি হলো। খোদাদ্রোহীতার ফলে উক্ত ফেরেশতা হতো বিতাড়িত মানসম্মান হারিয়ে কুলটা শয়তানে হলো পরিণত। ইবলিসের অধ:পাত ঘটলো মানুষের কারণে, তবেইতো শয়তান হয়ে গেল মানুষের জানের দুষমন। অভিশপ্ত শয়তান প্রথম দিন থেকেই মানুষের সার্বিক ক্ষতি করার ফন্দি ফিকির ক্ষতিকারক চক্রান্ত রচনা করে আসছে। মেহেরবান খোদাকে মানুষের কাছে প্রমাণ করতে চাইল, মানব বিধ্বংসী এক অপশক্তি হিসেবে। ফতোয়া দিয়ে ফিরছে, প্রেমের পারাবার পূতপবিত্র মাবুদকে ধরা যাবে না, ছোঁয়া যাবে না, তাঁর কাছ থেকে মানুষকে থাকতে হবে দূরে বহুদূরে। খোদা যে মানুষকে স্বীয় সুরতে আপন প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি নিয়ত মানুষের মধ্যেই জীবন যাপন করার সুবাসনা পোষণ করে আসছেন, সে কথা মানুষকে ভুলিয়ে দিয়েছে। খোদার সাথে মানুষের একটটা দুষমণিভাব সৃষ্টি করে রেখেছে।
আসলে, মেহেরবান মাবুদ যেমনটা শিক্ষা দিয়েছে, অভিশপ্ত ইবলিস সে শিক্ষাকলাপ উল্টো করে ফেলেছে; ইতিবাচক শিক্ষা নেতিবাচক করে প্রকাশ করে রেখেছে। পরম করুণাময় মাবুদ মানুষের মধ্যেই বসবাস করার জন্যই বাসনা পোষণ করে আসছেন। পাককালামে এমন বর্ণনা আমরা ছত্রে ছত্রে দেখতে পাই। ইহিস্কেল নবীর বর্ণনায় দেখা যায়– “আমি তাদের জন্য একটা শান্তির ব্যবস্থা স্থাপন করব; সেটা হবে একটা চিরস্থায়ী ব্যবস্থা। আমি তাদের শক্তিশালী করব ও তাদের সংখ্যা বাড়িয়ে দেব এবং আমার ঘর আমি চিরকালের জন্য তাদের মধ্যে স্থাপন করব। আমার বাসস্থান হবে তাদের মধ্যে; আমি তাদের আল্লাহ্ হব এবং তারা আমার বান্দা হবে” (৩৭ : ২৬–২৭), “তিনি বললেন, “হে মানুষের সন্তান, এটাই আমার সিংহাসনের স্থান ও আমার পা রাখবার জায়গা। আমি এখানেই বনি–ইসরাইলদের মধ্যে চিরকাল বাস করব। বনি–ইসরাইলরা আর কখনও আমার পবিত্র নাম কলংকিত করবে না। তাদের কিংবা তাদের বাদশাহ্দের মূর্তিপূজা দ্বারা এবং পূজার উঁচু স্থানে তাদের বাদশাহ্দের লাশ নিয়ে যাবার দ্বারা আমার নাম কলংকিত করবে না” ইহিস্কেল (৪৩ : ৭), “আমি তোমাদের দিক থেকে আমার মুখ ফিরাব না। তোমাদের মধ্যেই আমি আমার বাসস্থান করব। আমি তোমাদের সংগে চলাফেরা করব এবং তোমাদের আল্লাহ্ হব আর তোমরা আমার নিজের বান্দা হবে” (লেবিয় ২৬ : ১১–১২)।
যে ব্যক্তি মানুষ খুন করে সিদ্ধহস্ত তার মুখ থেকে প্রেম ক্ষমার কথা সম্পূর্ণ বেমানান। প্রেমের বাণী তাকেই মানায় যিনি গোটা জীবন রয়েছেন মানব কল্যাণে নিবেদিত প্রাণ। আদম থেকে শুরু করে আপনি আমি কারো পক্ষে কি সম্ভব হয়েছে শতভাগ পূতপবিত্র থাকা, জনকল্যাণে নিবেদিত প্রাণ? আমরা সকলেই গুনাহগার। মানুষের পক্ষে বেগুনাহ জীবন যাপন করা আদৌ সম্ভবপর হয়ে উঠে না। (১ ইউহোন্না ১ : ৯)
খোদার এক বিশেষ রহমতে আমরা তেমন একক ব্যবস্থা পেয়েছি, যিনি হলেন খোদার জীবন্ত কালাম ও পাকরূহ, যিনি মানুষের মধ্যে মানুষরূপে বসবাস করেছেন, যিনি হলেন শতভাগ পূতপবিত্র খোদার জীবন্ত বহিপ্রকাশ। তিনি মানুষের পাপের কাফফারা পরিশোধ দিয়েছেন নিজের নির্দোষ রক্তের মূল্যে জীবন্ত মেষসাবক হিসেবে, যার কোরবানী হলো গুনাহগারদের বিকল্প কোরবানি। বিষয়টি কেবল খোদার পক্ষ থেকেই সাধন করা সম্ভবপর হয়েছে।
আমরা মানুষ খোদার ব্যবস্থায় আস্থাবান থেকে পেয়েছি পরিত্রাণ। “আল্লাহ্র রহমতে ঈমানের মধ্য দিয়ে তোমরা নাজাত পেয়েছ। এটা তোমাদের নিজেদের দ্বারা হয় নি, তা আল্লাহ্রই দান। এটা কাজের ফল হিসাবে দেওয়া হয় নি, যেন কেউ গর্ব করতে না পারে। আমরা আল্লাহ্র হাতের তৈরী। আল্লাহ্ মসীহ্ ঈসার সংগে যুক্ত করে আমাদের নতুন করে সৃষ্টি করেছেন যাতে আমরা সৎ কাজ করি। এই সৎ কাজ তিনি আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন, যেন আমরা তা করে জীবন কাটাই” (ইফিষীয় ২ : ৮–১০), “আল্লাহ্ ঠিক করে রেখেছেন যে, প্রত্যেক মানুষ একবার মরবে এবং তার পরে তার বিচার হবে। ঠিক সেইভাবে অনেক লোকের গুনাহের বোঝা বইবার জন্য মসীহকেও একবারই কোরবানী দেওয়া হয়েছে। তিনি দ্বিতীয় বার আসবেন, কিন্তু তখন গুনাহের জন্য মরতে আসবেন না, বরং যারা তাঁর জন্য আগ্রহের সংগে অপেক্ষা করে আছে তাদের সম্পূর্ণ ভাবে নাজাত করবার জন্য আসবেন” (ইব্রানী ৯ : ২৭–২৮)।