খুনের মামলায় চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে লাকী আক্তার ৩০ বছরের সাজা ভোগ করছেন। তাঁর যে হাতে অপরাধ হয়েছে, এখন সে হাতেই সুঁই–সুতা দিয়ে ফুটিয়ে তুলছেন জীবনের নকশা। একেকটি বুননে দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠছে নকশিকাঁথা। বন্দি জীবনের কাজের মূল্য মিলছে কাঁথা বিক্রির লভ্যাংশ থেকে। আয়ের সুযোগ মেলায় ঐতিহ্যের ছোঁয়ায় রঙিন সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে কমতি রাখছেন না লাকী।
শুধু লাকী আক্তার নন; খুনের মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত হাসিনা বেগমের হাতের জাদুতে মোহনীয় হয়ে উঠছে কাঁথা। প্রতিদিন সাত থেকে আট ঘণ্টা কাঁথা সেলাইয়ের কাজ করেন লাকী–হাসিনার মতো ৩০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত ইয়াছমিন আক্তার, রনি বেগম ও জান্নাতুল ফেরদৌস। তাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন বিচারাধীন মামলার বন্দি রুমি আক্তার, প্রিয়াংকা, মারুফা বেগম, নুরজাহান বেগম ও মহিমা মোল্লা। সুতি কাপড়ে তাদের হাতের নিখুঁত কাজে চোখ জুড়িয়ে যায়। বর্তমানে চট্টগ্রাম কারাগারের নারী ওয়ার্ডে ১৬৫ বন্দি রয়েছেন।
তাদের অর্ধেকই সাজাপ্রাপ্ত। বাকিরা বিভিন্ন মামলায় কারাবন্দি। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মাসুদুর রহমান জুয়েল জানান, নারী বন্দিদের সেলাই করা ৩০টি নকশিকাঁথা ঢাকা বাণিজ্য মেলায় তারা বিক্রি করেছেন। ক্রেতারা এগুলোর বেশ প্রশংসা করেছেন। অন্তত ১২ কয়েদি ও হাজতি নারী বিশেষ ওয়ার্ডে নকশিকাঁথা সেলাই করেন। প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত তারা এ সৃষ্টিশীল কাজ করেন। কাপড়, সুঁই–সুতা সবকিছু কারাগারের তহবিল থেকে দেওয়া হয়। বিক্রির লভ্যাংশের একটি অংশ এসব বন্দির মধ্যে বণ্টন করা হচ্ছে। কারাবিধি অনুযায়ী তারা সাজা রেওয়াত পাচ্ছেন। তারা মুক্তি পেলে এই কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন। নারী ওয়ার্ডের নিচতলায় পাঁচজন মিলে একটি কাঁথা তৈরি করতে ১০ থেকে ১২ দিন লাগে।
প্রতিটি কাঁথা সাত ফুট প্রস্থ ও আট ফুট দৈর্ঘ্যের। প্রতি মাসে তিন থেকে চারটি কাঁথা তৈরি করতে পারেন। প্রতিটি কাঁথা বাজারে পাঁচ হাজার থেকে আট হাজার টাকায় বিক্রি করা যায়। কাপড়, সুঁই–সুতার খরচ বাদ দিয়ে লভ্যাংশ তিন ভাগ করে এক ভাগ কাঁথা তৈরি করা বন্দিদের ব্যক্তিগত হিসাবে (পিসি) জমা রাখে কারা কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি আদালতে হাজিরা দিতে এলে মহিমা মোল্লা ও তাঁর স্বামী আব্দুর রহিমের সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। আবদুর রহিম জানান, মাদকের একটি মামলায় তাদের ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে তারা জেলে। কারাগারে তাঁর স্ত্রী মহিমা কাঁথা তৈরির কাজ করছেন। মাসে দুই থেকে তিন হাজার টাকা আয় করছেন। এ টাকা দিয়ে কারা ক্যান্টিন থেকে মাঝেমধ্যে ভালো খাবার, সাবানসহ নানা জিনিসপত্র কিনে ব্যবহার করেন। মহিমা মোল্লা বলেন, ‘বাসায় থাকতে টুকটাক জামা সেলাইয়ের কাজ করতাম। কারাগারে ভালোভাবে নকশিকাঁথা সেলাইয়ের কাজটি শিখছি। এখানে কাঁথা সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। নারী কারারক্ষীরা যখন যা লাগে, দিয়ে সহযোগিতা করেন। ভালোই লাগে। বড় বিষয় হচ্ছে, সময় কেটে যাচ্ছে। সামান্য আয়ও হচ্ছে।’
https://shorturl.fm/cCRdL
https://shorturl.fm/wkQEu