সৃষ্টিলগ্নে মাবুদ প্রথম মানুষ হযরত আদম (আঃ)কে একটি মাত্র হুকুম প্রদান করেছেন, বলতে পারেন দায়িত্ব অর্পণ করেছেন যা হলো, “প্রজাবন্ত হওয়া, বহুবংশ হওয়া এবং গোটা বিশ্ব ভরে তোলো”। কিতাবুল মুকাদ্দসের প্রথম পুস্তক পয়দায়েশ খন্ডের প্রথম অধ্যায়ের ২৬–৩১ আয়াতে দেখতে পাবেন “তারপর আল্লাহ্ বললেন, “আমরা আমাদের মত করে এবং আমাদের সংগে মিল রেখে এখন মানুষ তৈরী করি। তারা সমুদ্রের মাছ, আকাশের পাখী, পশু, বুকে–হাঁটা প্রাণী এবং সমস্ত দুনিয়ার উপর রাজত্ব করুক।” পরে আল্লাহ্ তাঁর মত করেই মানুষ সৃষ্টি করলেন। হ্যাঁ, তিনি তাঁর মত করেই মানুষ সৃষ্টি করলেন, সৃষ্টি করলেন পুরুষ ও স্ত্রীলোক করে। আল্লাহ্ তাঁদের দোয়া করে বললেন, “তোমরা বংশবৃদ্ধির ক্ষমতায় পূর্ণ হও, আর নিজেদের সংখ্যা বাড়িয়ে দুনিয়া ভরে তোলো এবং দুনিয়াকে নিজেদের শাসনের অধীনে আন। এছাড়া তোমরা সমুদ্রের মাছ, আকাশের পাখী এবং মাটির উপর ঘুরে বেড়ানো প্রত্যেকটি প্রাণীর উপরে রাজত্ব কর।” এর পরে আল্লাহ্ বললেন, “দেখ, দুনিয়ার উপরে প্রত্যেকটি শস্য ও শাক–সবজী যার নিজের বীজ আছে এবং প্রত্যেকটি গাছ যার ফলের মধ্যে তার বীজ রয়েছে সেগুলো আমি তোমাদের দিলাম। এগুলোই তোমাদের খাবার হবে। দুনিয়ার উপরের প্রত্যেকটি পশু, আসমানের প্রত্যেকটি পাখী এবং বুকে–হাঁটা প্রত্যেকটি প্রাণী, এক কথায় সমস্ত প্রাণীর খাবারের জন্য আমি সমস্ত শস্য ও শাক–সবজী দিলাম।” আর তা–ই হল। আল্লাহ্ তাঁর নিজের তৈরী সব কিছু দেখলেন। সেগুলো সত্যিই খুব চমৎকার হয়েছিল। এইভাবে সন্ধ্যাও গেল সকালও গেল, আর সেটাই হল ষষ্ঠ দিন”।
মেহেরবান খোদা যিনি প্রেম ও ক্ষমার চিরন্তন অফুরাণ আঁধার, তিনি মানুষকে অনন্তকাল ধরে মহব্বত করে আসছেন, তিনি হারানো সন্তানদের খুঁজে পেতে এবং সার্বিক ক্লেদ কালিমা থেকে অবমুক্ত করার জন্য চুড়ান্ত মূল্যে এক অপূর্ব ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা প্রযুক্ত হবে সর্বকালে সকল মানুষেরই জন্য। মানুষের সার্বিক কৃচ্ছ্রতা মানব মুক্তির জন্য কেবল বৃথা প্রয়াশমাত্র। মানব মুক্তির একক নায়ক পাকরূহের মানবরূপে আবির্ভাব, খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসীহ গোটা বিশ্ববাসির পাপের সার্বিক প্রায়শ্চিত্ত শোধ দিয়ে তাদের যথার্থ বলেছেন, সমস্ত লোকের কাছে মাত্র একটি সুসমাচার প্রচার করে দিতে, যেন উক্ত সুসমাচারের উপর যারাই বিশ্বাস করে তারাই নাজাতের অমীয় ফল্গুধারায় পরিতৃপ্ত হতে পারে। মসীহ তাই ঘোষণা দিয়েছেন যারা তৃষ্ণার্ত তারা যেন মসীহের দাতব্য উপহার, তৃষ্ণা নিবারণের জল পান করে যায়, যার হাতে মূল্য আছে সে পান করুক আর যার দেবার মত কোনো মূল্যই নেই সেও পান করে তৃপ্ত হোক, (ইউহোন্না ৭ : ৩৭–৩৮)। এ হলো উদাত্ত আহবান যা যুগ যুগ ধরে তৃষ্ণার্ত পরিশ্রান্ত ভারাক্রান্ত জনমানুষের জন্যই হয়েছে দত্ত এবং আকাশ বাতাশ অন্তরীক্ষে হয়েছে ঘোষিত।
মসীহ সমস্ত জনগোষ্ঠির কাছে সেই একক নাজাতের ঘোষণা পৌঁছে দেবার জন্য সাহাবীদের আজ্ঞা বা প্রেরণা দিয়েছেন, যেন তারা মসীহের রক্তের মূল্যে অর্জিত মুক্তির বারতা বিশ্বব্যাপী সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়। “তখন ঈসা কাছে এসে তাঁদের এই কথা বললেন, “বেহেশতের ও দুনিয়ার সমস্ত ক্ষমতা আমাকে দেওয়া হয়েছে। এইজন্য তোমরা গিয়ে সমস্ত জাতির লোকদের আমার উম্মত কর। পিতা, পুত্র ও পাক–রূহের নামে তাদের তরিকাবন্দী দাও। আমি তোমাদের যে সব হুকুম দিয়েছি তা পালন করতে তাদের শিক্ষা দাও। দেখ, যুগের শেষ পর্যন্ত সব সময় আমি তোমাদের সংগে সংগে আছি” (মথি ২৮ : ১৮–২০)। মানুষের প্রতি খোদার অকৃত্রিম মহব্বত আমরা সর্বত্র দেখতে পাই তাঁর কালামের আলোকে। নিজের সুরতে তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন, প্রজাবন্ত ও বহুবংশ হবার জৈবিক ক্ষমতা দিয়েছেন এবং তাঁর সৃষ্ট জাহান ভরে তুলতে ও আবাদ করার জন্য আজ্ঞা দিয়েছেন। মানবের প্রতি সার্বিক সুব্যবস্থা সুসম্পন্ন করার পরে মুক্তিদাতা মসীহ সমুদয় রাজ্যে সমুদয় জাতির কাছে সেই দাতব্য দানের বিষয়ে ঘোষণা দিতে আজ্ঞা দিয়েছেন।
আজ আমরা সকলেই রহমতের যুগে বেঁচে আছি। খোদা মানব জাতিকে নিরঙ্কুশ প্রেম করেছেন, ঐ একই প্রেমে মসীহ বিশ্বের তাবৎ মানুষকে নিখুঁত প্রেমে জড়িয়ে ধরেছে। তাঁর কাছে জাত্যাভিমান বলতে কিছুই নেই, থাকতে পারে না, কেননা সকল মানুষ ঐ একই আদমের ঔরষজাত যা হলো খোদার এক মহান পরিকল্পনা। যতদিন মানুষ অন্ধকারে গুনাহের বোঝা বয়ে শ্রান্ত–ক্লান্ত থাকে, ততদিন তারা কেউ কাউকে আপন ভাবতে অন্তরে বাধা পায়; স্বতষ্ফুর্তভাবে কেউ কাউকে স্বাগত জানাতে কতকটা অনিহা পোষণ করে। মসীহের দাতব্য কোরবানি যখনই কেউ আন্তরিকভাবে বিশ্বাসে কবুল করে নেয় অমনি লাভ করে পাকরূহের অভিষেক, পরিচালিত হতে শুরু করে পাকরূহের দ্বারা অর্থাৎ খোদা, পাকরূহ এবং মসীহ এখন থেকে ব্যক্তির চালিকা শক্তি, ফলে উক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে মানুষ প্রেম ও ক্ষমার সত্যিকারের বাস্তবায়ন দেখতে পায়। মানুষের কল্যাণে মসীহে নিবেদিত প্রাণ নিজেকেও বিলিয়ে দিতে থাকে সদা প্রস্তুত। মসীহের বাণী ঘরে ঘরে পৌছে দিতে ব্যক্তি হয়ে যায় পাগলপারা। গানের সুরে বলা হয়, “মসীহের বাণী ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে আজ, বেরিয়েছি মোরা পথে ঘাটে নাহিক ভীতি লাজ”। কালামপাকে যথার্থ বর্ণীত রয়েছে, “যদি কেউ মসিহের সংগে যুক্ত হয়ে থাকে তবে সে নতুনভাবে সৃষ্ট হল। তার পুরানো সব কিছু মুছে গিয়ে নতুন হয়ে উঠেছে। এই সব আল্লাহ থেকেই হয়। তিনি মসিহের মধ্য দিয়ে তাঁর নিজের সংগে আমাদের মিলিত করেছেন, আর তাঁর সংগে অন্যদের মিলন করিয়ে দেবার দায়িত্ব আমাদের উপর দিয়েছেন। এর অর্থ হল, আল্লাহ মানুষের গুনাহ না ধরে মসিহের মধ্য দিয়ে নিজের সংগে মানুষকে মিলিত করছিলেন, আর সেই মিলনের খবর জানাবার ভার তিনি আমাদের উপর দিয়েছেন। সেজন্যই আমরা মসিহের দূত হিসাবে তাঁর হয়ে কথা বলছি। আসলে আল্লাহ যেন নিজেই আমাদের মধ্য দিয়ে লোকদের কাছে অনুরোধ করছেন। তাই মসিহের হয়ে আমরা এই মিনতি করছি, “তোমরা আল্লাহর সংগে মিলিত হও।” ঈসা মসিহের মধ্যে কোন গুনাহ ছিল না; কিন্তু আল্লাহ আমাদের গুনাহ তাঁর উপর তুলে দিয়ে তাঁকেই গুনাহের জায়গায় দাঁড় করালেন, যেন মসিহের সংগে যুক্ত থাকবার দরুন আল্লাহর পবিত্রতা আমাদের পবিত্রতা হয়” (২করিন্থীয় ৫ : ১৭–২১)
পুনরায় বলছি, মেহেরবান খোদা অনন্তকাল ধরে মানুষকে একটি অভয়বাণী ঘোষণা দিয়ে আসছেন, যা হলো আশা আলো প্রেম ও ক্ষমার জীবন যাপন করা। মসীহ একক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন; যদিও অতীব ক্ষুদে একটি সময়ের জন্য তিনি ধরা পৃষ্টে মানবরূপে এসেছিলেন, তবুও এই ক্ষুদে সময়ের মধ্যেই বাস্তবে আমরা খোদাই জীবন প্রাণভরে দেখতে পেয়েছি। আজ আমরা অনুপ্রাণীত তারই আজ্ঞা পালন করে জীবন যাপন করার জন্য।
সমুদয় বিশ্বে সকলজাতির কাছে মসীহের দাতব্য মুক্তির ব্যবস্থা পৌঁছে দেওয়া হলো আমাদের একক নৈতিক দায়িত্ব।