প্রাণ কান্দে মনও কান্দে রে, কান্দে আমার হিয়া, বসন্ত আসিল, গাছে ফুল ফুটিল পরানের বন্ধু আমার আইল না, লাউয়ে এতো মধু যানে গো যাদু, লাউ ধরলাম সঙ্গের সঙ্গী, শেষ বিয়ার সানাই বাজিল ডাকছে কাল সমনে, আমার বাসর হবে গো, সাড়ে তিন হাত মাটির ঘরে, প্রাণবন্ধুর সনে, যেদিন আমার দমের পাখি উড়াল দিয়া যাবে, সিঁধ কাটিয়া মদন চুরায় লুইটা নিল ঘরের ধন, হায়রে কপাল কি দিয়া বুঝাইতাম মহাজন। সাদা কাপড় দিয়া পুঁটুলা বান্দিয়া, যেদিন আমারে তোরা করিবে বিদায়, সঙ্গে যাবে না কেউ হায়রে হায়, কাঙ্গাল দুয়ারে খাঁড়া দেখিতে তোমারে, শাহজালাল বাবারে, একবার দেখা দাও আমারে। পাইয়া পরার ধন, বাহাদুরি কয়দিন করবায় মন, ও হুরুঠাকুর আমারে লইয়া সিলেট যাইবায়নি, আল্লার নাম লইয়ারে, নবীর নাম লইয়ারে ওরেও পাইকল ভাই বৈঠায় মারো টান, মরিলে কান্দিসনা আমার দায়রে যাদুধন–মরিলে কান্দিস না আমার দায়, সূরা ইয়াছিন পাঠ করিও বসিয়া কাছায়, আমার প্রাণ যাবার বেলায়, বিদায় কালে পড়ি না যেন শয়তানের ধুঁকায় রে যাদুধন–মরিলে কান্দিস না আমার দায়।
সিলেট পরতম আযান ধ্বনি শাহজালাল বাবায় দিয়াছেন, শুন সে আযান ধ্বনি আইজো হইতাছে, যেই ধ্বনিতে পাথর গইলা পানি হইয়াছে–সিলেট পরতম আযান ধ্বনি বাবায় দিয়াছেন, প্রাণ কান্দে মন কান্দেরে, প্রেমের মরা জলে ডুবে না–সহ জনপ্রিয় অসংখ্য গানের রচয়িতা মরমি কবি গিয়াস উদ্দিন আহমদ। সাংবাদিক ও মরমি কবি গিয়াস উদ্দিন আহমদ ১৯৩৫ সালের ১৪ আগস্ট সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ছৈলাআফজলাবাদ ইউপির শিবনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন ফতেহ উল্যাহ ও মা অমুতা বিবি। ২০০৫ সালের ১৬ এপ্রিল অসংখ্য ভক্তপ্রেমিক রেখে গুণী সাংবাদিক ও মরমি কবি মারা যান। তার জীবদ্দশায় মরিলে কান্দিস না আমার দায় (১৯৯৬) ও ভোটের বয়ান এবং ইত্যাদি ২০০১ সালে দুটি গীতি সংকলন প্রকাশিত হয়। তার মৃত্যুর পরপরই তৃতীয় গানের সংকলন শেষ বিয়ার সানাই ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয়। এ তিনটি গীতি সংকলনে অন্তর্ভুক্ত গানসহ আরও ৮৯টি নিয়ে গানের সমাহারে তার গীতি সমগ্র ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয়। সব মিলে ৭৬৬টি গানের পাশাপাশি একটি গীতি আলেখ্য সংকলিত করা হয়েছে।
১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালে ৫ শতাধিক লেখা গান তার বাড়ির কাঠের আলমারিতে রাখা হয়। কয়েকদিন থাকার পর গানের পাণ্ডুলিপি পোকায় খেয়ে নষ্ট করেছিল। তিনি দেড় হাজারের মতো গান রচনা করে গেছেন। অপ্রকাশিত রয়েছে অর্ধ শতাধিক গান। সিলেটের ব্রিটিশ আমলের পুরাতন দৈনিক যুগভেরী পত্রিকায় লেখালেখির পাশাপাশি দেশপ্রেম নিয়ে অসংখ্য গান রচনা করে গেছেন তিনি। সিলেট অঞ্চলের মরমি আকাশ যে কজন মরমি কবির আগমনে আলোকিত হয়েছে, এমনই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন মরমি গীতিকার গিয়াস উদ্দিন আহমদ। আধুনিক যুগে অর্থাৎ যখন বেতার ও টেলিভিশন সম্প্রচারের যুগ শুরু হলো, সেই যুগে সিলেটের প্রতিনিধিত্ব করতে যারা এগিয়ে এলেন, তাদের মধ্যে গীতিকার গিয়াস উদ্দিন আহমদ এক উল্লেখযোগ্য নাম। তিনি সরাসরি সান্নিধ্য পেয়েছেন বাউল দুর্বিন শাহ ও পল্লীকবি জসিমউদ্দীন, রসের কবি শাহ আব্দুল করিম ও কামাল পাশার। মরমি গীতিকার গিয়াস উদ্দিন রচনা করতেন, দলের বাকিদের কেউ সুর দিতেন, কেউ গাইতেন, কেউবা বাজনা বাজাতেন। তিনি প্রায় ১ হাজার ৫০০ গান রচনা করেছেন। তবে সেটা সংরক্ষণের ব্যাপারে নিজেও উদাসীন ছিলেন। যে কেউ তার কাছে এসে গান চাইলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে লিখে দিতেন। কিন্তু সংগ্রহ করতেন না। তাই তো তার দুই শতাধিক গান হাতছাড়া হয়ে গেছে। সাংবাদিক ও মরমি কবি গিয়াস উদ্দিন আহমদ ছিলেন একজন সদা সহজসরল মনের মানুষ। বাংলাদেশের এক অনন্য আলোকিত ভাবজগতের মানুষ ছিলেন তিনি। নিজ গ্রামের জামে মসজিদের উত্তরপাশে তার কবর রয়েছে। তার কবরের দেওয়ালে লেখা রয়েছে মরিলে কান্দিস না আমার দায়! তিনি ১৯৭৪ সালে গীতিকার হিসাবে বাংলাদেশ বেতারে স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন। ১৯৮৯ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ঝলক ইন্টারন্যাশনাল আর্টস অ্যাসোয়েশনের নিয়ন্ত্রণে সফর করেছিলেন।
২০২০ সালে ১৭ ফেব্রুয়ারিতে উপজেলার গোবিন্দগঞ্জ বিশাল বালুর মাঠে তার মৃত্যুর প্রায় ১৫ বছর পর মরমি কবি গিয়াস উদ্দিন আহমদ স্মরণে লোক উৎসব উদযাপন করা হয়। মরমি কবি গিয়াস উদ্দিন আহমদ লোক উৎসব উদযাপন পর্ষদের উদ্যোগে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার গোবিন্দগঞ্জের বালুমাঠে অনুষ্ঠিত লোক উৎসবে দেশের বিশিষ্ট লোকসংস্কৃতি গবেষক, কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার, সাংবাদিক, বাউল শিল্পী, জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করে উৎসবকে প্রাণবন্ত করে তোলা হয়। উৎসবে গুণিজন সম্মাননা, মরিলে কান্দিসনা আমার দায় বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, কবির বর্ণাঢ্য জীবনী নিয়ে আলোচনা ও তার লেখা গান পরিবেশনা করেন দেশের প্রখ্যাত শিল্পীরা।