আটত্রিশ বৎসরের ক্লেশ ব্যক্তিকে পীড়ার সাথে অংগাঙ্গিভাবে যুক্ত করে রাখে, বলছিলাম ইউহোন্না বর্ণীত সুসমাচারের ৫ম অধ্যায় নিয়ে কথা। পক্ষাঘাতগ্রস্থ একজন রোগী সুস্থ হবার আশায় একটানা আটত্রিশ বৎসরকাল যাবত অপেক্ষারত ছিল। কিন্তু কোনো দিনই সুযোগ পায় নি জলে নামার জন্য। যেমন সুদীর্ঘকাল চাকুরী করার পর ব্যক্তি যখন অবসর গ্রহন করে তখনও দেখা যায়, সকাল হলে পর, সে নিজেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রস্তুত করতে থাকে অফিসে যাবার জন্য। এ অভ্যাসটা তার ধ্যান মননের সাথে যুক্ত হয়ে গেছে; যেমন শরীরে কোথাও হাড় কাঁটা থাকে। আসলে কাঁটাটি শরীরের কোনো অংশ নয়, তথাপি সুদীর্ঘকাল অলসতা অবহেলার কারণে আর দশটি হাড়ের মত স্থায়ীত্ব লাভ করেছে। তাই কথায় বলে হাড় কাঁটা। কাঁটা আর হাড় এক হবার কথা নয় যা আমাদের অবশ্যই জানতে হবে।
মানুষ অভ্যাসের দাস। একটানা আটত্রিশ বৎসরের রোগভোগের ফলে ব্যক্তির যে অভিজ্ঞতা অর্জীত হয়েছে তা তাকে অভ্যস্থ করে ফেলেছে, মসীহ যখন প্রশ্ন করলেন, তার সুস্থ হবার চিন্তা আছে কিনা, জবাবে সে বকে চললো, সুস্থ হবার নানাবিধ নিয়মাচারের কথা; যেমন পুকুরের পানি নড়বে, আর ঠিক সেই মুহুর্তে তাকে জলে নামতে হবে, অথচ তার এমন কেউ নেই যে কিনা তাকে সাহায্য করবে জলে নামিয়ে দেবার জন্য।
তার মাথায় এমন একটি চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল যার থেকে সে নিজে নিজেকে অবমুক্ত করার ক্ষমতা আদৌ রাখে না। কিন্তু কে যে তাকে প্রশ্ন করেছে, তাঁকেও সে চিনতে পারেনি। প্রশ্নকর্তা তাকে আজ্ঞা করলেন, আটত্রিশ বৎসরের সাজানো মাদুর গুটিয়ে নেয়ার জন্য এবং স্বাধীনভাবে হেটে বেড়াবার জন্য।
মাদুরের কাজ হলো, চলমান ব্যক্তিকে নিদ্রাচ্ছন্ন করে রাখা আর নিদ্রা হলো মৃত্যুর সাথে তুল্য একটি অবস্থা। কিন্তু মসীহ হলেন জীবনের প্রতীক, এবং যতজন তাঁর সাথে যুক্ত হয়, তারা তাঁরই মত থাকে সদাজাগ্রত। এই জাগ্রত দশা শারীরিক কোনো জাগরণের কথা বলে না; চিন্তু চেতনায়, শিক্ষাদীক্ষায় ব্যক্তি থাকবে সজাগ সচেতন হুশিয়ার। সুশিক্ষার অযুহাতে তাকে কোনো ভ্রান্ত শিক্ষা দিয়ে ভুল পথে নিয়ে যেতে পারে না। যেমনটা ইবলিশ প্রলুদ্ধ করেছিল বিবি হাওয়াকে (পয়দায়েশ ৩ : ১৪)
আজকে আমাদের থাকতে হবে মসীহের সাথে এক নিবিড় সম্পর্ক, যে কোনো মূহুর্তে, যে কোনো বিষয় নিয়ে সঠিক ফায়সালা আমরা তাঁর কাছ থেকে নিয়ে নেব। কেননা, পৃথিবীতে যাবতীয় ঐশি বাণীর সারাংশ তো খোদ মসীহ। অর্থাৎ প্রেম, ক্ষমা, পুনর্গঠন ও পুনর্মিলন। আমি এবং মসীহ, এ দুয়ের মধ্যে সান্নিধ্য পাবার যতপ্রকার করণীয় ব্যবস্থা রয়েছে, তার সবকটার একক উদ্দেশ্য হলো মসীহের সাথে পুনর্মিলন। মসীহের মাধ্যমে নতুন জীবন লাভ।
আমরা খোদার কাছ থেকে দূরীকৃত হয়ে পড়েছি। আমাদের পাপজনিত বদ অভ্যাসগুলো আমাদের আষ্টপৃষ্টে বেধে রেখেছে। অবশ্য আমাদের মুক্তির মন্ত্রনা শেখানো হয়েছে, যাকে বলা চলে বা তুলনা করা চলে পৌন:পুনিক অংক কষার মত অনুশীলন। এমন অংকের সমাধান কেউ কোনো দিন খুঁজে পায় নি এবং পাওয়া সম্ভবও নয়।
নীতিজ্ঞান সম্পন্ন বাণীগুলোও আমাদের অক্ষমতা ব্যর্থতার আভাস দিয়ে ফিরছে যা আকলমন্দ ব্যক্তির কাছে সহজেই ধরাপড়ার কথা। সমাজে বসবাস করতে গিয়ে অনেকে তা প্রকাশ করে আবার অনেকেই সাহস পায় না গোমর ফাক করে দিতে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একই মন্ত্র পুন:পুন আওড়ালে যে কি ফল ফলে তা আমরা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি বর্তমান অবস্থার আলোকে। মিলন ও ভ্রাতৃত্বের পরিবর্তে বিভেদের রাজনীতি চালিয়ে সমাজের সাধারণ জনগণকে বহুধা ভাগে বিভক্ত ও পরষ্পরকে যুদ্ধাংদেহী করে তুলেছে। সাাধুতা বিহীন সাধুদের প্রবাল্যে সমাজ আজ দিশেহারা হয়ে আছে। সকলেই যেন বাহ্যিক বাহারি বেশভুষার দ্বারা নিজেদের কেনাবেচায় বড়ই ব্যস্ত।
বেদবাক্য বাস্তব জীবনে প্রয়োগের ফলে জীবনটা সম্পূর্ণ বদলে যেতে বাধ্য। কথায় বলে, পরিবর্তন দেখে সকলে বলে বেড়ায়, “কিসের পুত্রের কি হলো?” “শামুয়েলের কাছ থেকে চলে যাবার উদ্দেশ্যে তালুত ঘুরে দাঁড়াতেই আল্লাহ্ তাঁর মন বদলে দিলেন। সেই দিনই চিহ্ন হিসাবে বলা ঘটনাগুলো ঘটল” (১শামুয়েল ১০ : ৯)।
মানুষ, মানুষকে চিনে নিতে পারে জীবনাদর্শ দেখে। তেমন ক্ষেত্রে গোটা বিশ^বাসী যেভাবে পাইকারীহারে পতীত তার প্রমান যেমন পরিষ্কার দৃষ্ট হচ্ছে, আবার খোদার হাতে কারো জীবনে যে আমূল পরিবর্তন নেমে আসে তারও নজীর দুচারটে হয়েছে প্রকাশিত। এক্ষেত্রে দেখতে পাই শৌল নামক এক ব্যক্তি ছিলেন, যাকে মাবুদ মাওলা চোখের পলকে সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে দিলেন (১শমুয়েল ১০ : ৯–১০)। একই বিষয় নিয়ে আমরা পরিষ্কার ধারণা পাই ইহিস্কেল পুস্তকে ৩৬ : ২৬ পদে। এক্ষেত্রে নতুন দিল ও নতুন মনের কথা বলা হয়েছে, যা খোদা নিজেই বদল করে দিবেন।
মসীহ হলেন খোদার দিল ও মন যা আমাদের জন্য উপহার হিসেবে দান করা হয়েছে, যাকে পাকরূহ বলেও চিহ্নিত করা হয়। মানুষের কলুষিত হৃদয় পরিবর্তন করে তথা ঐশি রূহ স্থাপন করার ফলে ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব হয় প্রেম ও ক্ষমাপূর্ণ রূহানী জীবন যাপন করা। হযরত পৌল তেমন পরিবর্তনের কথা ঘোষণা করেছেন গালাতীয় পত্রে ২য় অধ্যায় ২০পদে।
পুরাতন মানুষ হলো মাংসিক কামনা বাসনা সম্পন্ন এক কুলাঙ্গার ব্যক্তি, যাকে অভিশপ্ত ইবলিশ নিয়ত ব্যবহার করে আসছে খোদার মহিমা বিনাশ করে দেবার জন্য। কিন্তু মসীহের আগমনে এবং তাঁর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রনে আজ যারা হতে পেরেছে নিয়ন্ত্রিত তথা নতুন জন্মপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ, তাদের কাছ থেকে প্রকাশ পাচ্ছে সমাজে পরিবর্তনের প্রবাহ। অবশ্য মসীহ অনেকের কাছে অদ্যাবধি রয়ে গেছেন লাভজনক বাণিজ্যিক পুঁজি হিসেবে। বৃক্ষ নাম প্রকাশ করে আপন আপন উৎপন্ন ফলের দ্বারা। বিবাদমান বিশৃঙ্খল বিশ^টাকে মাত্র একটি প্লাটফর্মে জড়ো করার জন্য এক চুড়ান্ত মুল্য পরিশোধ করা হয়েছে। আপনার কি সে বিষয়ে জানা আছে?
খোদা জগতকে এতটাই প্রেম করেছেন যা গুনাহগার মানুষের পক্ষে অনুধাবন করা সাধ্যের সম্পূর্ণ বাইরে। তিনি স্বীয় রূহানী পুত্র খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসীহকে কোরবানী দিয়েছেন জগতের কৃত পাপের কাফফারা পরিশোধ করার জন্য। তিনি বারবার ঘোষণা দিয়ে ফিরছেন, হারানো সন্তানদের স্বীয় ক্রোড়ে ফিরে পেতে চান (লুক ১৯ : ১০)। মানুষ আজ অভিশপ্ত ইবলিসের শিকারে পরিণত। মানুষ কাট, মানুষ মার যা হলো নিত্যদিনের রোজনামচা। মানুষের মধ্যে চিরস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যেন পাগলের প্রলাপ মাত্র। তা ছাড়া, সকল মানুষ যে একই খোদার হাতে হয়েছে সৃষ্ট সে কথা যেন সকলেই বেমালুম ভুলে গেছে। নিজেরা নিজেদের নানা অভিধায় চিহ্নিত করে সহজেই ঐক্যের ডাক এড়িয়ে যাচ্ছে। যেমন হিন্দু, মুসলামন, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান, এদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার চিন্তা মনে হবে পরিষ্কার ধর্মদ্রোহীতা। “মানুষ” শব্দের আগে পিছে সংযুক্ত উপপদগুলো মানুষের কাতার থেকে সকলকে খারিজ করে ফেলেছে। এ যেন আগে চোখ বেঁধে দাও, তারপর ভুল পথে কারো পরিচালনা এবং পরিশেষে কারো বধ। যা হলো ইবলিসের পরিকল্পনার চূড়ান্ত উপসংহার বা সমাপ্তি।
কবি নজরুল তাই লিখেছেন– “এই শিকল পরা ছল মোদের এই শিকল পরা ছল। এই শিকল পরেই শিকল তোদের করব রে বিকল।”
ইউহোন্না ৫ অধ্যায় ১৬ পদে একটি মজার বিষয় প্রকাশ পেয়েছে। বিশ্রামবারে মসীহ এই সব কাজ করে ছিলেন বলে ইহুদী নেতারা তাকে মেরে ফেলতে চেষ্টা করলেন। আমাদের দেশে পদ্মা নামক নদী দেশটাকে দুইভাবে ভাগ করে রেখেছে। উক্ত নদী পাড়ি দিতে ফেরি দিয়ে পারাপার হতে হত, তাতে অর্থ ও সময় অধিক লেগে যেত। মজার বিষয়, ফেরিঘাটের দ্ইু পারেই গড়ে উঠেছিল হোটেল বাণিজ্য, হাজার হাজার লোক উক্ত গলাকাটা ব্যবসার সাথে যুক্ত ছিল। পদ্মা ও যমুনা ব্রিজ হবার পরে উক্ত বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়।
গুনাহগার মানুষদের পাপ থেকে মুক্ত করার নামে যে সকল নাজায়েজ ফতোয়া, যুগের পর যুগ ধরে চালু ছিল, মসীহ এসে বিশ^বাসিকে মুক্তির সহজ সরল পথ দেখালেন যা হলো কেবল খোদার রহমতে নাজাত লাভ হয়ে থাকে, যা গুনাহগারদের কার্মের ফলে লাভ করা আদৌ সম্ভব নয় “আল্লাহ্র রহমতে ঈমানের মধ্য দিয়ে তোমরা নাজাত পেয়েছ। এটা তোমাদের নিজেদের দ্বারা হয় নি, তা আল্লাহ্রই দান। এটা কাজের ফল হিসাবে দেওয়া হয় নি, যেন কেউ গর্ব করতে না পারে। আমরা আল্লাহ্র হাতের তৈরী। আল্লাহ্ মসীহ্ ঈসার সংগে যুক্ত করে আমাদের নতুন করে সৃষ্টি করেছেন যাতে আমরা সৎ কাজ করি। এই সৎ কাজ তিনি আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন, যেন আমরা তা করে জীবন কাটাই।” (ইফিষীয় ২ : ৮–১০), “আমি যা বলছি তা এই– তোমরা পাক–রূহের অধীনে চলাফেরা কর। তা করলে তোমরা গুনাহ্–স্বভাবের ইচ্ছা পূর্ণ করবে না। গুনাহ্–স্বভাব যা চায় তা পাক–রূহের বিরুদ্ধে এবং পাক–রূহ্ যা চান তা গুনাহ্–স্বভাবের বিরুদ্ধে। গুনাহ্–স্বভাব ও পাক–রূহ্ একে অন্যের বিরুদ্ধে বলে তোমরা যা করতে চাও তা কর না। তোমরা যদি পাক–রূহের দ্বারাই পরিচালিত হও তবে তোমরা শরীয়তের অধীনে নও ”গালাতীয় ৫ : ১৬–১৮)।
মিকাহ ৬ : ১–৮ বিশেষ করে ছয় নাম্বার আয়াতে পরিষ্কার করে বর্ণীত রয়েছে, মানুষের কাছে মাবুদের চাহিদা এবং মানুষের কর্তব্য। অবশ্য ইউহোন্না ৪ অধ্যায়ের ২৪ পদে তেমনি বর্ণনা রয়েছে যা কেবল রূহানী বিষয়ের উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সুদীর্ঘকালের প্রতিষ্ঠিত চৌকশ শরীয়তমালা বিলোপ করার জন্য ধরাপৃষ্ঠে মসীহের আবির্ভাব ঘটে নি, বরং শরীয়তের পরিপূর্ণতা দিতে তিনি এসেছেন। গুনাহগারদের মুক্তির ব্যবস্থা এক চূড়ান্ত মুল্যে মসীহ নিজের পূতপবিত্র রক্তক্ষরণের দ্বারা শরিয়তের চাহিদা পুরণ করে বিশ^বাসীকে দিলেন অনন্ত মুক্তি, পিতা পুত্রের মধ্যে কাঙ্খিত পুনর্মিলন। (মথি ৫ : ১৭)