যুদ্ধ বনাম শান্তি; শান্তি বনাম যুদ্ধ, সন্দেহ নেই, শব্দদ্বয় সম্পূর্ণ বিপরীতমূখী। যুদ্ধ সবকিছু ছিন্নভিন্ন করে ছাড়ে, আর শান্তি এসে এলোপাথারি বিষয়গুলো সাধ্যমত পরিপাটি করার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যোদ্ধা হলো একটা দানব, যার কাজই হলো শান্তির রাজ্যে অস্থিরতা চঞ্চলতা সৃষ্টি করে তোলা। যে কাজটি সর্বপ্রথম আদম হাওয়ার মনে জাগ্রত করেছিল কুলটা ইবলিস। শান্তিরাজের কথায় তারা আর আস্থাবান থাকতে পারলো না। খোদ নির্মাতার বিরুদ্ধে নিজেদের মনে সন্দেহের সৃষ্টি হলো। আর কানমন্ত্রতো আছেই, চাইলেই তোমরা নির্মাতাকে অতিক্রম করে যেতে পারো সহজেই। তাদের মনে দ্রোহ দেখা দিল, সবকিছুর একক অধিকার নিজেদের কব্জাগত করার উন্মত্ততা তাদের অস্থির করে তুললো।
সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবেই খোদা মানুষ সৃষ্টি করলেন, দুঃখের বিষয়, তারা নিজেদের অন্ধ অহমিকার কারণে উক্ত সম্মানীত অবস্থান থেকে হলো পতীত, হলো গুনাহগার, গোটা জীবন অশান্তির দাবদাহে হচ্ছে প্রজ্জ্বলিত। কে তাদের করবে নরকের অনল থেকে অবমুক্ত? অভিশপ্ত কুলটাকে আর পাওয়া গেল না তাদের বিপন্নাবস্থায়।
ইবলিসের কাজ হলো মানুষকে ধ্বংস করা, আর খোদার কাজ সবকিছু সুন্দরভাবে গড়ে তোলা, পরিপাটি করা। মানুষের ক্ষতিসাধন কোনো মানুষের মন–মননে থাকার কথা নয়, মানুষ হলো খোদার প্রতিনিধি, অন্তত: সৃষ্টির পূর্বে খোদার বয়ান ও মনোবসনা আমরা তেমনটাই দেখতে পেয়েছি। তিনি ফেরেশতাকুলকে নিয়ে বলেছেন, “আইস, আমরা, আমাদের সুরতে, আমাদের সাথে মিল রেখে এখন মানুষ সৃষ্টি করি”। তিনি পৃথিবীর ধুলি দিয়ে আদমকে সৃষ্টি করলেন, তারপর তার নাসিকায় প্রাণবায়ু ফুঁকে দিলেন, আদম এবার জীবন্ত মানুষে রূপ নিল। খোদা তাদের এদন নামক শান্তিনিকেতনে আবাসনের ব্যবস্থা করে দিলেন। সবকিছু শান্তিপূর্ণ ছিল। যখনই তাদের হৃদয়ে যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলো, অমনি তাদের হৃদয় থেকে শান্তিরাজ উবে গেল, অস্থিরতা চঞ্চলতা তাদের তাড়িয়ে ফিরছে, নিজেদের প্রজ্ঞা শক্তি দিয়ে এমন একটা কিছু করতে হবে, ফলে তাদের মনের শুপ্ত বাসনা পাবে পরিপূর্ণতা, হবে বাস্তবায়িত। মানুষ কখনোই তৃপ্ত হচ্ছে না, তার মধ্যে কামনার পরিপূর্ণতা কোনোভাবেই লাভ করে না। গোটা জীবন সে থাকে তৃষ্ণিত চাতকপ্রায়। প্রয়োজনের পরিপূর্ণতা পাবার পরেও আরো চাই (ইশইয়া ৫৬:১১)। এই চাই চাই স্বভাবের অদম্য আকর্ষণে গোটা বিশ্ব আজ বড়ই অস্থির হয়ে আছে। আর এই অস্থিরতা পরষ্পরকে সর্বাত্মক বিধ্বংসী যুদ্ধে ঠেলে দেয়। অতীতে যেমন ঘটেছে, বর্তমানেও তার ব্যতিক্রমী কিছুই দেখা যায় না। পরষ্পরের মধ্যে নিয়ত যুদ্ধ লেগেই আছে; কখনো ঠান্ডা যুদ্ধ আবার তা জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মতো লাভা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পুরো এলাকা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে বিনাশ করে দেয়। যুদ্ধ কোনো শান্তির ফসল হতে পারে না। মানুষ, লোভ ও হিংসার দ্বারা যখন জ্বলে পুড়ে অঙ্গার হয়ে ওঠে, ঠিক তখনই প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার মত একটা কিছু করে বসে। ভাবে নিজের চলার পথ হয়ে গেল কন্টকমুক্ত! কথায় বলে, কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা। যেমন যুদ্ধ দিয়ে যুদ্ধ বন্ধ করা। তেমন চিন্তাটি কেবল অবান্তর চিন্তা। কথায় বলে, গর্ত খোঁড়ার মাটি দিয়ে উক্ত গর্ত কখনোই ভরাট করা সম্ভব নয়। একইভাবে যুদ্ধের ময়দানে বসে যুদ্ধ বন্ধ করা আদৌ সম্ভব হতে পারে না। যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য অত্যাবশ্যক হলো গোলটেবিল বৈঠক। সম্পৃক্ত পক্ষগুলো আপন আপন মনের উগ্রতা ও ঝাঁজ নিভিয়ে দিয়ে আলোচনার জন্য শান্তির গোল টেবিলে বসতে হবে; যদি তাদের মধ্যে বাদ–বিভেদের চুলচেড়া শান্তিপূর্ণ মিমাংসা করার সদেচ্ছা জাগ্রত হয়ে থাকে। এমন মনোভাব বা হিংস্রতা অবশ্যই পরিহার করতে হবে, “শত্রু পক্ষকে যেখানে পাবে, তবে তার গর্দান ফেলে দেবে”, চোরাগুপ্তা হামলা চালিয়ে শত্রুর বংশ সমূলে বিনাশ করে দিতে হবে, মনে মনে এমন কুটবাসনা যতদিন পুষে রাখবে, ততদিন বিবদমান দলের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না। প্রকাশ্য যুদ্ধ হলো মনের মধ্যে দানাবাধা অদৃশ্য জিঘাংসার বহিপ্রকাশ মাত্র। আসল যুুদ্ধ তো মনের মধ্যে জন্ম নিয়েছে বহুপূর্বেই; ব্যক্তি নিয়ত চলাফেরা করছে সমাজে, পরষ্পরের সাথে বাক্যালাপ করে ঐ সকল আত্মধ্বংসী কলুষতা নিয়ে। বাহিরে সে পারফেক্ট ভদ্রলোক কিন্তু ভিতরে নিয়ত বয়ে বেড়াচ্ছে বিষধর কালসাপ। যাকে একবার উক্ত সাপে ছোবল দিয়েছে, সে তো আর নিজে নিজেকে বিষমুক্ত করার ক্ষমতা বা উপায় রাখে না। আশা করি যুদ্ধের সর্বাত্মক ধ্বংস বিনাশ বিষয়ে আমরা রয়েছি ওয়াকিবহাল। হৃদয়ে নিয়ত ঘৃণা পুষে রেখে মুখে সুললীত কাব্য যতই প্রকাশ করা হোক না কেন, প্রকারান্তরে তার সকল বক্তব্য হবে, ভুতের মুখে রাম নাম সম। মানুষের চোখ দেখে কখনো কখনো অনুমান করা সম্ভব হতে পারে বাস্তবতা নিরিখ করা। তবে প্রমান ছাড়া মন্তব্য অকার্যকর হয়ে যায়।
মানুষের সাথে মানুষের বৈরিতা শুরু হয়েছে পার্থিব স্বার্থের কারণে। বলা যাবে না যে তারা রূহানী বিষয় ভিত্তিক টানাপড়েনের কারণে পরষ্পরের সাথে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে যার ফলে যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে। না, তা মোটেও নয়!
আমার এক পরমপূজনীয় আত্মীয়া বলতেন, “যদি ঘটে সুজন, তেতুল পাতায় নয় জন! গানের সুরে তেমন অভয়বাণী রয়েছে, “নীড় ছোট ক্ষতি নেই, আকাশ তো বড়”। আর ধর্মীয় বিষয় হলো আকাশের চেয়েও বিশাল, সীমাহীন। পরম নির্মাতাকে আপনি যে ভাষাতেই আহবান জানান না কেন, তাতে আমার তো কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। আমি জানি, পার্থীব বিষয়ের উপর যদি লক্ষকোটি নাম উপাধি থাকতে পারে এবং তার জন্য যদি আমাদের তৃষ্ণা মেটাতে বেগ পেতে না হয় তবে বিশ্বচরাচরের নির্মাতা মালিকের শতকোটি নাম উপাধি থাকতে আপত্তি থাকবে কেন। জলের কথা বলছিলাম, যে নামেই জল পান করা হোক না কেন, খাঁটি জলে অবশ্যই আমাদের তৃষ্ণা মিটবে, সে কথা হলফ করে বলতে পারি।
আমাদের জানতে হবে আরাধ্য দেবতার মৌলিক সত্ত্বা। তিনি হরণকারী না বিতরণকারী? তিনি প্রেম না ঘৃণা? তিনি কতলকারী না জীবনদানকারী? যাকে আপনি ভক্তি শ্রদ্ধা করেন, তাঁর পরিচয় কি রয়েছে আপনার সবিশেষ জানা? দেখা যায়, অজ্ঞতাহেতু মানুষ সুমহান প্রেমের পরাকাষ্ঠা মাবুদের এবাদত করতে গিয়ে নরবলী পর্যন্ত দিয়ে বসেছে। বর্তমান বিশ্বে দেশ জাতি হিংসা, অপরাধ প্রবণতায় থাকছে অস্থির। সকলে নিজের দোষের ভার অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে পার পেতে চায়, মজার বিষয় হলো, খোদা যখন আদমকে প্রশ্ন করলেন নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার বিষয়ে, উত্তরে এক প্রকার খোদাকেই দোষী করে বসলেন, আপনি যে নারীকে উপহার দিয়েছেন , সেই আমাকে প্রলুব্ধ করেছে, তাই খেয়েছি (আদিপুস্তক ৩ : ১২)। বর্তমান সমাজে এমন অযুহাত হরহামেসা আমরাও দিয়ে থাকি নিজেদেরকে দোষমুক্ত রাখার জন্য। ইব্রাহীম নবীও স্বীয় জান বাঁচানোর জন্য বাদশাহ আবিমালিকের কাছে তেমন যুক্তি দাড় করলেন, নিজের স্ত্রীর বিষয়ে বললেন, তিনি আমার বোন (পয়দায়েশ ২০ : ২)। খোদা কাবিলকে যখন প্রশ্ন করলেন হাবিলের ব্যাপারে, কাবিল তখন অপরাধের দায় এড়িয়ে যাবার জন্য বলেই ফেললো, “আমি কি আমার ভাইয়ের রক্ষক (পয়দায়েশ ৪ : ৯)। বর্তমান সমাজে মানুষ খুন করার প্রশ্নে হাজার প্রকার অযুহাত খুঁজে পাবেন। আমি যাকে কতল করেছি সে কাফের ছিল। প্রশ্ন করি, কাফের বলে কে তাকে উপাধি দিল, আর কেইবা কতলকারীকে মোমেন বলে উপাধি দিল। উভয় ক্ষেত্রে কি একই মাবুদ তাদের সৃষ্টি করেন নি? মানুষ খুন করার অধিকার মোমেনের হাতে কে তুলে দিল? আল্লাহ যদি কাউকে মারতেই চান, তবে তাঁর কাছে মরণঘাতি অস্রের কি অভাব পড়েছে? মোমেনের পূতপবিত্র হস্ত ভ্রাতার রক্তে রঞ্জিত কলুষিত করবেন কেন?
মানুষ মারা খোদার কাজ হতে পারে না। এক্ষেত্রে শতভাগ পূতপবিত্র, বাতেনী খোদার হুবহু প্রকাশ, খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসীহ দাবী করেছেন, অধার্মিকদের খুঁজে নেবার জন্য ধরাপৃষ্ঠে ঘটেছে তাঁর আবির্ভাব। হত্যা নয় প্রেমে জয়। গোটা বিশ্বের পাপের প্রায়শ্চিত্ত শোধ দেবার জন্য তিনি নিজেকে মর্মবিদারক সলীবে কোরবানি দিলেন, যেন, কেবল বিশ্বাস স্থাপন করার মধ্য দিয়ে অনুতপ্ত জাতি নাজাত লাভ করতে পারে। পাপাক্রান্ত অবস্থা থেকে রূপান্তরিত হয়ে গড়ে উঠতে পারে নতুন সৃষ্টি হিসেবে। যেমন লেখা আছে “যদি কেউ মসীহের সংগে যুক্ত হয়ে থাকে তবে সে নতুনভাবে সৃষ্ট হল। তার পুরানো সব কিছু মুছে গিয়ে সব নতুন হয়ে উঠেছে।”(২করিন্থীয় ৫ : ১৭)।
নাজাত পাবার জন্য গুনাহগারের বিশ্বাস ব্যাতিত ভিন্ন কিছুই করার নেই। সে ইতোমধ্যে পাপের পঙ্কে ডুবন্ত, মুক্তির জন্য আপ্রাণ নিষ্ফল প্রচেষ্টা চালিয়ে চলছে। যেমন ঋণ নিয়ে ঋণের টাকা পরিশোধ করার ব্যার্থ প্রয়াস। নবী রাসুলদের কিতাবে রয়েছে, প্রত্যেক মানুষ অধার্মিক ছাড়া আর কিছুই নয়। আদমের খান্দানে কোনো লোকের জন্ম হয় নি যে কিনা ছিল সম্পূর্ণ বেগুনাহ, কেননা আদম নিজেই হলেন খোদাদ্রোহী, স্খলিত, বিতাড়িত। খুুনি রক্তধারা নিয়ত প্রবাহিত হয়ে চলছে তার সন্তানদের ধমনিতে। খন্ডকালীন যুদ্ধ থেকে বিশ্বযুদ্ধগুলো হলো মানুষের বিকারগ্রস্থ হবার জ্বলন্ত প্রমান, মানুষ নিয়ত পাপের গোলাম। কারো মধ্যে কোনো পুণ্য থাকার প্রশ্নই জাগে না। মানুষ ধার্মিক সাজতে চায়, যেমন ভিতরে পঁচা ঘা ও জটিল ক্ষত, বাহিরে ব্যান্ডেজ দিয়ে ঢেকে রাখার ফালতু প্রচেষ্টা মাত্র। বায়ু নিঃসরণের শব্দ কাশি দিয়ে আবৃত করা সম্ভব হলেও দুর্গন্ধ দূর করার আছে কি কোনো উপায়? হ্যা, আছে। এয়ার ফ্রেসনার! মানুষের ধার্মিকতা খোদার ধার্মিকতার তুলনায় পরিত্যাজ্য কাপড়ের তুল্য (ইশাইয়া ৬৪:৪)। অবশ্য মেহেরবান মাবুদ নিয়ত চেতনা দিয়ে ফিরছেন, তাঁর সাথে বোঝাপড়া করার জন্য (ইশাইয়া ১ : ১৮, ৪৪ : ২২)। তিনি আমাদের নতুন করে গড়ে তুলতে চান, তাঁর কোমল হৃদয় দিয়ে আমাদের কলুষিত হৃদয়ের প্রতিস্থাপন করবেন, ফলে আমরা পুনরায় তার সাথে আন্তরিক সহভাগিতা লাভ করতে পারব (২করিন্থীয় ৫ : ২১, ইহিষ্কেল ৩৪:২৬)।
আসুন আমরা যুদ্ধ পরিহার করি। কে আগে আক্রমন করেছে আর কে তার জবাব দিতে উদ্ধত, সে হিসেব করে আমরা অধিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পড়ব। ক্ষতিপুরণ করার সাধ্য কোনো পক্ষেরই নেই। মানুষকে অমানুষ ভাবাটাই হলো ইবলিসের মারাত্মক হাতিয়ার, আর তেমন সর্বগ্রাসী বিনাশকারী হাতিয়ারের মরণ কামড়ে গোটা বিশ্ব হয়ে আছে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত। আমরা সকলে মানুষ বৈ ভিন্ন কিছু নই।
আসুন, মানুষের সেবা করি। ক্ষয়িষ্ণু পার্থীব ধনের সেবা নয়। সবার উপরে মানুষ সত্য। মানুষের সেবার মধ্যে রয়েছে খোদার সেবা (মথি ২৫ : ৪০)