ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরের গ্রাম মহাদেবপুর। গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠোপথে গাড়ি ছুটছে। চোখে পড়ছে দুই পাশে বিস্তীর্ণ ফসলের ক্ষেত। বাতাসে দুলছে ধানের সোনালি ছড়া। পুরো প্রান্তরে আর কিছু নেই, শুধু চোখ জুড়ানো সবুজের ঢেউ। এখানকার ঘরে ঘরে গরু, হাঁস–মুরগির খামার, পুকুরে মাছ, আছে খেজুর গাছ। কেউ কেউ ফলান ড্রাগন ফল কিংবা শাকসবজি। মহাদেবপুরের সোনালি ধানের মায়া ছেড়ে যখন পাশের গ্রাম কুরুলিয়ার পথে, তখন গগনে মেঘের গর্জন। কিছুক্ষণ পরই শুরু ঝোড়ো হাওয়া। নেমে এলো ঝুম বৃষ্টি। শুধু এ দুই গ্রাম নয়; মহেশ্বরচন্দ, ইছাপুরসহ পুরো উপজেলা পাকা ধানের ঘ্রাণে ম–ম। সেই ঘ্রাণ আশা জাগিয়েছে কৃষকের মনপ্রাণে। পুরো বছরের খাবার তো বটেই; এই ধান ঘিরে কত স্বপ্ন, কত আশা কৃষকের! সন্তানের লেখাপড়া, বিয়েশাদি, উৎসব–আনন্দ– সবকিছুর ব্যয়ভার মেটাতে এই ধানের ওপর নির্ভর করেন চাষি। হাড়ভাঙা খাটুনিতে উৎপাদিত ফসল বিক্রির টাকায় সন্তানের জন্য নতুন পোশাক কিংবা স্ত্রীর জন্য একখানা নতুন শাড়ি কিনে দেওয়ার ইচ্ছা লালন করেন কৃষক। তাতেই তার অন্য রকম তৃপ্তি। এবারের মৌসুমে ২ কোটি ২৬ লাখ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্য ধরেছিল সরকার। কৃষক বলছেন, পরিমিত বৃষ্টি, শীত কম থাকা, উচ্চ ফলনশীল জাতের আবাদ বেশি হওয়ায় এবার ফলন বেশি। আমন মৌসুম শেষ হওয়ার পর বোরো ধান রোপণ শুরু হয় অক্টোবর–নভেম্বরের দিকে। ধান কাটা চলে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর সারাদেশে ৫০ লাখ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ১৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯২০ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড, ৩৫ লাখ ৬১ হাজার ১২ হেক্টর জমিতে উচ্চ ফলনশীল জাত এবং ১৩ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে স্থানীয় জাতের ধানের চাষ করা হয়। গত বছর ৪৯ দশমিক ৯৯ লাখ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়। এর মধ্যে ১৪ লাখ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড জাতের ধান চাষ করা হয়েছে। হাইব্রিড ধানের উৎপাদন বাড়াতে ৯০ কোটি টাকার প্রণোদনা দেয় সরকার। কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, এবার মাঠে ফলন ভালো হয়েছে। মাঠে মাঠে ধান কাটার উৎসব চলছে। পাহাড়ি ঢল কিংবা বৃষ্টি যেন কোনো ক্ষতি করতে না পারে, সে জন্য আমরা যন্ত্রের মাধ্যমে ধান কাটতে কৃষককে সহায়তা দিচ্ছি। কোনো দুর্যোগের কবলে না পড়লে গতবারের চেয়ে এবার ফলন বেশি হবে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রায় কোনো ধরনের সমস্যা হবে না। এখন কৃষক গোলায় ধান তুলতে পারলেই পরিপূর্ণ তৃপ্তি আসবে।কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, এখন পর্যন্ত সারাদেশে ২০ শতাংশ ও হাওরের ৮০ শতাংশ জমির ধান কাটা শেষ হয়েছ। হাওরের ধান নিয়ে এখন আর তেমন শঙ্কা নেই। পানি ঢুকলেও এখন বড় কোনো বিপর্যয় হবে না। এবার কম্বাইন হারভেস্টার ব্যবহার করায় দ্রুত ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। দেশের কোথাও কোথাও বৃষ্টি বা বিক্ষিপ্তভাবে শিলাবৃষ্টি হয়েছে। এতে তেমন ক্ষতি হয়নি। তিনি বলেন, এবার হাওরবেষ্টিত সাত জেলায় বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। সেখানকার কৃষকরা বোরো ধানের দামও ভালো পাচ্ছেন।