মুশফিকুর রহিম মিস্টার ডিপেন্ডেবল খ্যাত ২২ গজি ময়দানি লড়াইয়ে বাংলাদেশের এক ব্যাটিং স্তম্বের নাম। ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের অনেক জয়ের নায়ক মুশফিকুর রহিম। ধৈর্য, ত্যাগ আর পরিশ্রমকে পুঁজি করে বাংলাদেশের ক্রিকেটে এক অনন্য নজীর স্থাপন করেছেন এই উইকেটকিপার ব্যাটার। মুশফিক এমনিতেই সবার আদর্শ হয়ে ছিল। তার ত্যাগ, অনুপ্রেরণা এবং কঠোর পরিশ্রম ও অনুশীলনে সবচেয়ে সময় দেয়াটা ছিল সবার পছন্দের। এবার নিজ থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়ে মুশফিক আরো বড় উদাহরণ তৈরি করেছে। বাংলাদেশের জার্সিতে একদিনের ক্রিকেটে তামিম ইকবালের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড যার দখলে, সেই ‘মিস্টার ডিপেন্ডেবল’ হঠাৎ করে ওয়ানডে ক্রিকেটকে বিদায় বলে দিয়েছেন। বুধবার রাতে নিজের ফেসবুক পেইজে ওয়ানডে ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দেন মুশফিকুর রহিম। অবসর ঘোষণায় মুশফিক বলেছেন, ‘আমি আজ ওয়ানডে ফরম্যাট থেকে অবসর ঘোষণা করছি। সবকিছুর জন্য আলহামদুলিল্লাহ। বৈশ্বিক পর্যায়ে আমাদের অর্জন সীমিত হতে পারে, তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, যখনই আমি আমার দেশের জন্য মাঠে নেমেছি, নিষ্ঠা ও সততার সাথে ১০০ ভাগের বেশি দিয়েছি।’ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি থেকে বাংলাদেশ দলের জয়হীন বিদায়ের পর ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় থাকা এই ক্রিকেটার এরপর লিখেছেন, ‘গত কয়েক সপ্তাহ আমার জন্য খুবই চ্যালেঞ্জিং ছিল, এবং আমি বুঝতে পেরেছি যে এটাই আমার নিয়তি।’ অবসরের সিদ্ধান্তের ঘোষণায় পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতও উদ্ধৃত করেছেন মুশফিক, ‘ওয়া তুইজ্জু মান তাশা’ ওয়া তুযিলু মান তাশা’ –এবং তিনি যাকে ইচ্ছা সম্মান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা অপমানিত করেন।’ ১৯৮৭ সালের ৯ মে বগুড়ায় জন্ম নেয়া মুশফিকের ক্রিকেটে হাতেখড়ি স্কুল জীবন থেকেই। বগুড়া জেলা স্কুলে পড়াশুনাকালীন সময়েই ক্রিকেটের প্রতি ঝুঁকে পড়েন তিনি। বাংলাদেশ জাতীয় দলে অভিষেকের আগে অনূর্ধ্ব ১৯ দলে খেলেছেন মুশফিকুর রহিম। ২০০৬ সালে শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের নেতৃত্ব দেন তিনি। সেই দলে তখন মুশফিকের সতীর্থ হিসেবে ছিলেন সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল। সেই আসরে মুশফিকের অসাধারণ নেতৃত্বে বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনালে খেলেছে। ওই বছরই জিম্বাবুয়ে সফরে বাংলাদেশ ওয়ানডে দলে ডাক পান তিনি। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সেই সিরিজে ক্যারিয়ারে প্রথম হাফসেঞ্চুরি তুলে নেন মুশফিকুর রহিম। এরপর আর তাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। পরবর্তিতে বাংলাদেশ ওয়ানডে ক্রিকেট দলের অপরিহার্য সদস্য হয়ে যান মুশফিক। ২০০৭ ওয়েস্ট ইন্ডিজে অনুষ্ঠিত আইসিসি বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো খেলার সুযোগ পান এই উইকেট কিপার ব্যাটার। বাংলাদেশ দলের হয়ে দেশে–বিদেশে অসাধারণ পারফরমেন্স করে তারকা খ্যাতি পেয়ে যান তিনি। মাঠে নিজের ব্যক্তিগত পারফরমেন্সের পাশাপাশি দলকে উজ্জ্বীবিত করতেও অসাধারণ ভূমিকা রাখায় ২০০৯ সালে জিম্বাবুয়ে সফরে পেয়ে যান সহ–অধিনায়কের দায়িত্ব। এরপর ২০১১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরের জন্য তাকে অধিনায়ক মনোনীত করে ক্রিকেট বোর্ড। তার অধিনায়কত্বে ৩৭টি ওয়ানডে ম্যাচে ১১টিতে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। হেরেছে ১৪ ম্যাচ দুটি ম্যাচ টাই হয়েছে। ওয়ানডেকে না বলার আগ পর্যন্ত ২৭৪ ম্যাচ খেলেছে মুশফিকুর রহিম। ৩৬.৪২ গড়ে তার মোট রান ৭৭৯৫। ২০১১ সালে হারারেতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডেতে প্রথম সেঞ্চুরি তুলে নেন তিনি। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে এ পর্যন্ত মোট ৯ সেঞ্চুরির মালিক মুশফিকুর রহিম। ২০১৮ সালে দুবাইয়ে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ১৪৪ রান তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ রানের ইনিংস। এছাড়া ৪৯ হাফ সেঞ্চুরির মালিক মুশফিকুর রহিম। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সাফল্যের পাশাপাশি ঘরোয়া ক্রিকেটেও দাপটের সাথে খেলেছেন মুশফিকুর রহিম। ২০১২ সালে বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন সংযোজন বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের প্রথম আসরে দুরন্ত রাজশাহীর আইকন খেলোয়াড় ছিলেন মুশফিকুর রহিম। দুরন্ত রাজশাহী ছাড়াও বিপিএলে সিলেট রয়েলস, বরিশাল বুলস, চিটাগং ভাইকিংস, খুলনা টাইগারস, সিলেট স্ট্রাইকার্স ও ফরচুন বরিশালের হয়েও খেলেছেন তিনি। এছাড়া জাতীয় ক্রিকেট লিগে রাজশাহী বিভাগের প্রতিনিধিত্ব করেন মুশফিকুর রহিম। ক্রিকেটের দুই ফরমেট ওয়ানডে ও টি–টোয়েন্টি থেকে বিদায় নিলেও আরো কিছুদিন টেস্ট ক্রিকেটে দেখা যাবে মিস্টার ডিপেন্ডেবলকে।