কিতাবুল মোকাদ্দসের আলোকে সৃষ্টির স্রেষ্ঠ জীব হিসেবে, খোদা নিজ হাতে মানুষ সৃষ্টি করেছেন “পরে মাবুদ আল্লাহ্ মাটি দিয়ে একটি পুরুষ মানুষ তৈরী করলেন এবং তার নাকে ফুঁ দিয়ে তার ভিতরে জীবন্ত বায়ু ঢুকিয়ে দিলেন। তাতে সেই মানুষ একটি জীবন্ত প্রাণী হল।” (পয়দায়েশ ২ : ৭)। তিনি তাকে সৃষ্টির স্রেষ্ঠ জীব হিসেবে গড়ে তুলেছেন। আসল লুকানো রহস্য হলো, মানুষ বাতেনী বা বিমূর্ত খোদার মূর্তমান প্রতিনিধি। খোদা তাকে প্রজ্ঞা মর্যাদা এতটাই দান করেছেন যা তাঁর ফেরেশতাকুলকে দেয়া মানমর্যাদার চেয়ে অধিক; কেননা খোদা স্বীয় ফেরেশতাদের আজ্ঞা করলেন আদমকে সম্মান সূচক সেজদা বা কুর্নিশ করার জন্য। সকল ফেরেশতা আদম (আঃ)কে সেজদা দিলেও অহংকারে ফুলে ফেপে ওঠা সরদার ফেরেশতা তাকে সেজদা দিল না। আদমকে সেজদা না দেওয়ার ফলে সরদারের অন্তরে লুকিয়ে রাখাা অহমিকা ধরা পড়ল, আর স্বীয় অহংকারের বসে সরদার এতটাই অন্ধ হয়ে গেল যা তাকে খোদাদ্রোহী পর্যন্ত করে ছাড়ল। মানুষ বলুন আর ফেরেশতা বলুন, সবাইতো খোদার সৃষ্টি ও তাবেদার।
খোদা মানুষকে অতীব মহব্বত করেন। যদিও মানুষ ইবলিশের দুষ্ট মন্ত্রে ধরা খেয়ে খোদাদত্ত ঐশি মানমর্যাদা হারিয়ে ফেললো; যার ফলে সকল মানুষ আজ নরাধমের জীবন যাপন করে ফিরছে। মানুষ মানুষকে কথায় কথায় খুন করতে উম্মাদ আমোদ পাচ্ছে। খোদার আজ্ঞা অমান্য করার ফলে ফেরেশতা পর্যন্ত ঘৃণীত ইবলিশে হলো পরিণত; তেমন ক্ষেত্রে আমরা কথায় কথায় মানুষ জবেহ করে ফতোয়া দিয়ে ফিরছি, আমরা খোদার ফরজ আদায় করছি; এমন উম্মদনা ইবলিশের মৌতাত ছাড়া আর কি হতে পারেন বলুন? “তিনি আমাদের প্রথমে মহব্বত করেছিলেন বলেই আমরা মহব্বত করি। যে বলে সে আল্লাহকে মহব্বত করে অথচ তার ভাইকে ঘৃণা করে সে মিথ্যাবাদী; কারণ চোখে দেখা ভাইকে যে মহব্বত করে না সে অদেখা আল্লাহকে কেমন করে মহব্বত করতে পারে?” (১ইউহোন্না ৪: ১৯–২১)
মানুষ আসলে মাতাল হয়ে গেছে। দেহের কামনা, চোখের লোভ ও সাংসারিক কামনা বাসনার অদম্য আকর্ষণে বুণো গর্দভের মত ছুটে চলছে; তার গতিরোধ করার মত যেন পৃথিবীতে কিছুই খুঁজে পাবার নয়। যদিও মানুষ আজ চরম অবাধ্য, তবুও প্রেমের পারাবার মহান মাবুদের হৃদয় মানুষের প্রতি রয়েছে মমতাপূর্ণ, যদি মানুষ নিজেদের ভ্রান্তি অপরাধ অহমিকা অনুধাবন করতে পারে এবং আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হয়ে খোদার কাছে ফিরে আসতে আকাঙ্খা অকপট প্রকাশ করে তবে মাবুদ সাথে সাথে তাদের পাপ অপরাধ ক্ষমা করে দেন এবং সম্পূর্ণ স্নাতশুভ্র করে তুলেন আর নতুন সৃষ্টি হিসেবে স্বীয় পবিত্র ক্রোড়ে স্বস্নেহে তুলে নেন। কেননা, মানুষ হলো অদৃশ্য খোদার দৃশ্যমান প্রকাশ। মানুষ দর্শণের মাধ্যমে সাধিত হবে খোদা দর্শণ। “ফিলিপ ঈসাকে বললেন, “হুজুর, পিতাকে আমাদের দেখান, তাতেই আমরা সন্তুষ্ট হব।” ঈসা তাঁকে বললেন, “ফিলিপ, এতদিন আমি তোমাদের সংগে সংগে আছি, তবুও কি তুমি আমাকে জানতে পার নি? যে আমাকে দেখেছে সে পিতাকেও দেখেছে। তুমি কেমন করে বলছ, ‘পিতাকে আমাদের দেখান’? তুমি কি বিশ্বাস কর না যে, আমি পিতার মধ্যে আছি আর পিতা আমার মধ্যে আছেন? যে সব কথা আমি তোমাদের বলি তা আমি নিজে থেকে বলি না, কিন্তু পিতা, যিনি আমার মধ্যে আছেন, তিনিই তাঁর কাজ করছেন।” (ইউহোন্না ১৪: ৮–১০)। মানুষের পাপের প্রায়শ্চিত্ত শোধ দেবার জন্য খোদা নিজেই এক অপূর্ব ব্যবস্থা স্থাপন করেছেন, যে ব্যবস্থাটি মানুষের পক্ষে বাস্তবায়ন বা চিন্তা করাও মুষ্কিল। খোদা স্বীয় জীবন্ত ক্রীয়াশীল কালাম ও পাকরূহ মানুষ হিসেবে জগতে প্রেরণ করেছেন কুমারী মরিয়ম নাম্মী এক নারীর গর্ভের মাধ্যমে। উক্ত পুত্র অর্থাৎ খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসীহ মানুষের বীর্য ছাড়াই জন্ম নিয়েছেন। রহস্য হলো আদমের বীর্যজাত সকল মানুষ গুনাহ করেছে “কারণ সবাই গুনাহ করেছে এবং আল্লাহর প্রশংসা পাবার অযোগ্য হয়ে পড়েছে।” (রোমীয় ৩ : ২৩)। আর তাদের গুনাহের কাফফারা পরিশোধ দেবার জন্য অবশ্যই এক বেগুনাহ ব্যক্তির প্রয়োজন ছিল। “এই রকম একজন পবিত্র, দোষশুন্য ও খাঁটি মহা–ইমামেরই আমাদের দরকার ছিল। তিনি গুনাহ্গার মানুষের চেয়ে আলাদা এবং আল্লাহ্ তাঁকে আসমানের চেয়েও উপরে তুলেছেন।” (ইব্রানী ৭ : ২৬) “মাবুদ তাঁর বান্দাদের মধ্যেকার বুড়ো লোকদের ও নেতাদের বিরুদ্ধে বিচার করে বলছেন, “তোমরা আমার আংগুর ক্ষেত নষ্ট করেছ; গরীবদের মাল লুট করে নিজেদের ঘরে রেখেছ। ১৫তোমরা কিসের জন্য আমার বান্দাদের চুরমার করছ আর গরীবদের পিষে ফেলছ?” এই কথা দীন–দুনিয়ার মালিক আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন বলছেন।”(ইশাইয়া ৩: ১৪–১৫)। কালামপাকে প্রত্যয়ের সাথে বর্ণীত রয়েছে, মানুষের মধ্যে একমাত্র মসীহ হলেন সম্পূর্ণ বেগুনাহ ব্যক্তি। তিনি হলেন ঐশি মেষ, সম্পূর্ণ নিখুঁত ব্যক্তি যিনি বিশ্বের সকল গুনাহগার ব্যক্তিদের পক্ষে কাফফারা পরিশোধ দিলেন মর্মবীদারক সলীবে আত্মকোরবানীর মাধ্যমে। মূলত: মহান মাবুদের পক্ষ থেকে এমন অভাবিত ব্যবস্থা প্রদান করা, মানুষ কেবল বিশ্বাসপূর্বক মসীহের দাতব্য কোরবানি নিজেদের পাপ অপরাধের কোরবানি হিসেবে কবুল করে নিতে পারে। কালামপাক থেকে তিনটি আয়াত তুলে ধরছি: “ঠিক সেইভাবে অনেক লোকের গুনাহের বোঝা বইবার জন্য মসীহকেও একবারই কোরবানী দেওয়া হয়েছে। তিনি দ্বিতীয় বার আসবেন, কিন্তু তখন গুনাহের জন্য মরতে আসবেন না, বরং যারা তাঁর জন্য আগ্রহের সংগে অপেক্ষা করে আছে তাদের সম্পূর্ণ ভাবে নাজাত করবার জন্য আসবেন।” (ইব্রানী ৯ : ২৮), “ঈসা মসীহ্ আমাদের জন্য নিজের জীবন দিয়েছিলেন, যেন সমস্ত গুনাহ্ থেকে আমাদের মুক্ত করতে পারেন এবং তাতে এমন একদল লোককে পাক–সাফ করতে পারেন যারা কেবল তাঁরই হবে এবং যারা অন্যদের উপকার করতে আগ্রহী হবে।” (তীত ২ : ১৪), “আমাদের গুনাহের জন্যই তাঁকে বিদ্ধ করা হয়েছে; আমাদের অন্যায়ের জন্য তাঁকে চুরমার করা হয়েছে। যে শাস্তির ফলে আমাদের শান্তি এসেছে সেই শাস্তি তাঁকেই দেওয়া হয়েছে; তিনি যে আঘাত পেয়েছেন তার দ্বারাই আমরা সুস্থ হয়েছি। ” (ইশাইয়া ৫৩ : ৫)।
প্রিয় ভ্রাত: মানুষের সাথে আপনি যখন র্দুব্যবহার, তাড়না, নিন্দা করছেন তখন আপনি স্বভাবগত কারণে ইবলিশের দোসর বনে গেলেন। “ইবলিসই আপনাদের পিতা আর আপনারা তারই সন্তান; সেইজন্য আপনারা তার ইচ্ছা পূর্ণ করতে চান। ইবলিস প্রথম থেকেই খুনী। সে কখনও সত্যে বাস করে নি, কারণ তার মধ্যে সত্য নেই। সে যখন মিথ্যা কথা বলে তখন সে তা নিজে থেকেই বলে, কারণ সে মিথ্যাবাদী আর সমস্ত মিথ্যার জন্ম তার মধ্য থেকেই হয়েছে।” (ইউহোন্না ৮ : ৪৪) আর যদি মানুষকে আত্মবৎ মহব্বত করেন তখন ঐশি নজরে খোদার সহযোগী হয়ে উঠলেন। “যে আমার সব হুকুম জানে ও পালন করে সে–ই আমাকে মহব্বত করে। যে আমাকে মহব্বত করে আমার পিতা তাকে মহব্বত করবেন। আমিও তাকে মহব্বত করব আর তার কাছে নিজেকে প্রকাশ করব।” (ইউহোন্না ১৪ : ২১)।