রাজধানীর বিমানবন্দর রেলস্টেশনসংলগ্ন সড়কে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো কয়েকটি বাস। যাত্রী তোলার সঙ্গে চলছে পাল্লা দিয়ে হর্ন বাজানোর মহড়া। একই সঙ্গে হর্ন বাজাচ্ছেন বাসের পেছনে আটকা পড়া সিএনজি ও মোটরসাইকেলচালকরা। এ পরিস্থিতিতে হর্নের কারণে এই এলাকায় কান পাতা দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ রাজধানীকে শব্দদূষণমুক্ত করার অংশ হিসেবে গত অক্টোবরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসংলগ্ন তিন কিলোমিটার সড়ককে ‘নীরব এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করে সরকার। মঙ্গলবার রাজধানীর বিমানবন্দর এলাকা ঘুরে এ চিত্র দেখা যায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, উত্তরার স্কলাস্টিকা ক্যাম্পাস থেকে লা মেরিডিয়ান হোটেল পর্যন্ত সড়কে হর্ন না বাজানোর জন্য সচেতনতামূলক বোর্ড টাঙানো হয়েছে। তবে যত্রতত্র পার্কিং ও গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানো, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিংসহ অযথা হর্ন বাজাতে দেখা যায় চালকদের। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হর্ন বাজান মোটরসাইকেলচালকরা। দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত এই এলাকায় গাড়ির হর্ন পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, প্রতি মিনিটে গড়ে ৪৫-৫০ বার হর্ন বাজান গাড়ির চালকরা। হর্ন বাজানোর তালিকায় শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে মোটরসাইকেল। এরপর রয়েছে যথাক্রমে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেট কার ও বাস। জানা যায়, রাজধানীকে শব্দদূষণমুক্ত করতে পুরো ঢাকা শহরকে ১২টি সেক্টরে ভাগ করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। এর অংশ হিসেবে ১ অক্টোবর বিমানবন্দরের দুপাশের তিন কিলোমিটার ‘নীরব এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর শব্দদূষণ রোধে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। ফলে সে সময় অন্যান্য দিনের তুলনায় শব্দদূষণের মাত্রা কম ছিল। শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬ অনুযায়ী, ‘নীরব এলাকা’-তে হর্ন বাজালে কারাদন্ড বা জরিমানা হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এই আইনের কোনো প্রয়োগ দেখা যায়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনই এই আইনের কঠোর প্রয়োগ করা হবে না। আপাতত চালকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির কাজ চলছে। বিমানবন্দর সড়কে নিয়মিত যাতায়াত করা কয়েকজন গাড়িচালক বলেন, নীরব এলাকা হিসেবে বিবেচিত বিমানবন্দর এলাকার এই তিন কিলোমিটার সড়ক রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা। গাড়ির চাপ বেশি থাকায় অন্যান্য সড়কের তুলনায় এখানে যানজটও বেশি থাকে। যানজট থাকায় স্বাভাবিকভাবেই চালকরা বেশি হর্ন বাজান। এ ছাড়া হর্নমুক্ত এলাকা বানানোর ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা হচ্ছে মোটরসাইকেল। বাইক চালকরাই সবচেয়ে বেশি হর্ন বাজান। অত্যধিক ট্রাফিকের এই রাস্তায় বেশির ভাগ সময় দ্রুতগতিতে ওভারটেক করতে গিয়ে ঘন ঘন হর্ন বাজানোটা নিত্যদিনের রুটিনে পরিণত করেছেন তারা। এ ছাড়া যত্রতত্র গাড়ি থামানো, ঘন ঘন লেন পরিবর্তন ও সড়কে মোটরসাইকেলের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পাওয়ায় হর্ন বাজানো নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। যানজটের সুষ্ঠু ও দীর্ঘস্থায়ী সমাধান না মিললে নীরব এলাকা বানানো অসম্ভব। স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বায়ুমন্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, বিমানবন্দরে পরিবেশ মন্ত্রণালয় ভালো উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু শব্দদূষণ-সম্পর্কিত সচেতনতামূলক প্রচারের অভাব ছিল। এ ছাড়া বিমানবন্দর এলাকায় বাসস্ট্যান্ড ও ইউটার্নের কারণে শব্দদূষণ হচ্ছে। নীরব এলাকা চিহ্নিত করতে রাস্তার রঙের পরিবর্তন করলে চালক ও যাত্রীদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে হবে। উল্লেখ্য এর আগেও ২০১৯ সালে সচিবালয় এলাকা, শিশুমেলা, গণভবন, বিজয় সরণি, স্পারসো, রোকেয়া সরণি, পরিসংখ্যান ভবনের সম্মুখে, শহীদ শাহাবুদ্দিন সড়ক ও বীর উত্তম খালেদ মোশাররফ অ্যাভিনিউকে নীরব এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে সরকার।