খোদা মানুষ সৃষ্টি করেছেন নিজেকে জনসমক্ষে প্রকাশ করার জন্য। মানুষটিকে বৃহদাকার আয়নার সাথে তুলনা করা হলে কি দাড়াবে? বড় আয়নার মুখোমুখী কেউ যখন দাড়ায় তখন সে তার পূর্ণ অবয়ব দেখতে পায়। আবার হাসপাতালে একধরণের ব্যবস্থা রয়েছে যার সামনে দাড়ালে তার ভিতরের অবস্থা দেখা যায়। কেউ বলে এক্সরে মেশিন আবার স্ক্যানিং মেশিনও রয়েছে মানুষের ভিতরের অবস্থান দেখার জন্য। বিজ্ঞান বর্তমানে অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে গেছে। মানুষ যা গোপন করে রাখে, বৈজ্ঞানিক গবেষণা তথা মনস্তাত্বিক প্রশ্নবানে উক্ত গোপন বিষয়াদি প্রকাশ হয়ে পড়ে। অপরাধী ব্যক্তিদের জন্য রিমান্ড চাওয়া হয় তাদের নিজ মুখে সবিস্তারে অপরাধের ফিরিস্তি প্রকাশ করার জন্য।
আসলে দুষ্ট ব্যক্তি তাদের অপরাধ প্রবণতা কার্যকর করার জন্য মুখোশ পরিধান করে থাকে, যেমন সাধুসন্তের মধ্যে সাধুর বেশ ধরে মিশে যাওয়া। ইদানিং আমাদের দেশে ঘটে যাওয়া গণ বিপ্লবের প্রশ্নে যদি বিশ্লেষণ করা হয় তবে দেখা যাবে, যারা নিজেদের ছাত্র বলে দাবি করেছিল, তাদের মধ্যে ভিন্নতর চরিত্রের লোকের সংখ্যাই ছিল অধিক পরিমানে। অন্দোলনের প্রথমেই যদি তাদের ডেকে নেয়া যেত, মিছিলে কতজন প্রকৃত ছাত্র রয়েছে আর কতজন লুটতরাজ করার নিমিত্তে যুক্ত হয়েছে, আর কতজন দেশটাকে ধ্বংস করার ব্রত নিতে মুখোশ অর্থাৎ ছাত্রদের নামে চলে আসছে তার প্রমাণ পাওয়া যেত। প্রত্যেকটি ব্যক্তির যেমন পরিচয় পত্র থাকে, তদ্রুপ প্রত্যেকটি ছাত্রছাত্রীর থাকে ভিন্ন আইডেন্টিটি কার্ড। তাছাড়া গোয়েন্দা বাহিনী তো আছেই, তাদের দায়িত্ব হলো ‘ডালমে কুছ কালা হায়’ তা কতোটা ভেজাল মাল গুঁজিয়ে দেয়া হলো তা ডিটেক্ট করা। স্ট্রং প্রতিরক্ষা বাহিনী ব্যাতীত আপনি দেশ কেন একটি ক্ষুদে প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত চালাতে পারবেন না। ধর্মীয় ক্ষেত্রটি কোনোভাবে ব্যতিক্রম বলে আমি মনে করি না। খোদার সৃষ্টি শান্তিপূর্ণ এদন কাননে মানুষকে আবাসনের ব্যবস্থা করে দেয়া হলো। ইতোপূর্বে মানুষ সৃষ্টি করে পরমতৃপ্তি ভরে খোদা ফেরেশতাকুলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সকলেই নতুন মেহমানকে সালাম জানিয়ে বরণ করে নিল, কিন্তু বাধ সাধল প্রধান ফেরেশতা যাকে লুসিফার বলেও অভিহিত করা হয়। উক্ত অহংকারী ফেরেশতা জাতপাত খুঁজতে লাগল, এবং মাটির গড়া মানুষটিকে আগুনের তৈরী ফেরেশতা বরণ ও সম্মান করা সমীচিন মনে করলো না। জাত্যাভিমানে খোদার হুকুম পর্যন্ত অবজ্ঞা করে বসলো। কথায় বলে অহংকারে আজাজিলের পয়দা অর্থাৎ অহংবোধ মানুষের মধ্যে সুবুদ্ধি ক্ষয় করে ছাড়ে। খোদার বিরুদ্ধে সে দাড়িয়ে গেল; ফলস্বরুপ সাধুদের কাতার থেকে হয়ে গেল বিচ্ছিন্ন। তখনই উক্ত লুসিফার বা ইবলিস ব্রত নিল, ছলেবলে কলাকৌশলে, যেকোনো মূল্যে যে কোনো পন্থায় মানুষের ক্ষতি সাধন সে করবেই। আর মানুষের মধ্যে জন্মগত লোভ–লালসার সুবাদে নিষিদ্ধ ফল খাওয়াতে মানুষকে প্রলুব্ধ করে হলো সফলকাম। খোদার হুকুম অমান্য করার কুফল হলো, এদন কানন থেকে তারা বিতাড়িত হয়ে ধুলির ধরণীতে আজ শ্রান্ত–ক্লান্ত ক্লেদাক্ত ঘর্মাক্ত হয়ে আমাদের জীবন যাপন করতে হচ্ছে।
বর্তমান সমাজটি পুরোপুরি ইবলিসের শিষ্য সাগরেদে ভরে আছে। আপনি যদি স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে চান তবে আপনাকে বড়ই সাবধান হুশিয়ার থাকতে হবে, যতোটা হুশিয়ার থাকা প্রয়োজন, কোনো মানুষের মধ্যে তেমন প্রজ্ঞা বা কৌশল কোনোটাই থাকে না, তাকে বাঁচতে হবে খোদার একান্ত রহমতে। বিশ্বটা ভ্যাজালে পরিপূর্ণ, মানুষ চেনা বড়ই কঠিন বিষয়। কার অন্তরে কোন মন্ত্র নিয়ত কাজ করছে তা আপনার বোঝার উপায় নেই। বিশ্লেষণ করতে গেলে কেউ দোষী আর কেউ ভিন্ন কিছু হবে, মানুষ হয়ে পড়বে আপনার দুষমন। তাই বিশ্লেষণের ফলাফল প্রকাশ্যে ঘোষণা না দিয়ে নিজেকে সাবধানে রাখা হবে করণীয় দায়িত্ব।
কালামপাকে একটি শিক্ষা রয়েছে যা গুরুত্বের সাথে প্রণীধান যোগ্য। “মানুষ সব রকম পশু, পাখী, বুকে–হাঁটা প্রাণী ও জাগরের প্রাণীকে দমন করে রাখতে পারে এবং রেখেছে, কিন্তু কোন মানুষ জিভকে দমন করে রাখতে পারে না। ওটা অস্থির ও খারাপ এবং ভয়ংকর বিষে ভরা। এই জিভ দিয়ে আমরা আমাদের প্রভু ও পিতার প্রশংসা করি, আবার এই জিভ দিয়ে আল্লাহর মত করে গড়া মানুষকে বদদোয়া দিই। আমাদের একই মুখ দিয়ে প্রশংসা আর বদদোয়া বের হয়ে আসে। আমার ভাইয়েরা, এই রকম হওয়া উচিত নয়। একই জায়গা থেকে বের হয়ে আসা স্রোতের মধ্যে কি একই সময়ে মিষ্টি আর তেতো পানি থাকে? আমার ভাইয়েরা, ডুমুর গাছে কি জলপাই ধরে? কিংবা আঙ্গুর লতায় কি ডুমুর ধরে? তেমনি করে নোনা পানির মধ্যে মিষ্টি পানি পাওয়া যায় না” (ইয়াকুব ৩ : ৭–১২)।
তাহলে দেখা যায়, যিনি কল্যাণ কামনা করেন তিনি মানুষের অমঙ্গল চাইতে পারেন না। যেমন মানবরূপে আগত পাকরূহ খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসীহ জীবদ্দশায় মানুষের ক্ষতি সাধনের কোনো চিন্তা করেন নাই। যদিও তিনি দোষী ব্যক্তিদের দোষমুক্ত করার জন্য চুড়ান্ত মাষুল পরিশোধ করেছেন নিজের পূতপবিত্র জীবনের বিনিময়ে, তথাপি তিনি তাদের অপরাধ প্রবণতা দেখে কোনো অভিশাপ দেন নি। অপরাধী ব্যক্তিকে ভর্তসনা দিয়ে কোনো লাভ নেই বরং তাকে অপরাধের পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারলে একদিকে ব্যক্তির জীবনের পরিবর্তন আসে, আর একদিকে সমাজ হয় আপদমুক্ত।
সাধুদের পুস্তকে মানব হত্যার মত জঘণ্য অপাধের অনুমোদন দেখতে পেলে বুঝতে হবে, অবশ্যই ইবলিসের হাতে হয়েছে তা বিরচিত। কেননা মিষ্টি জল আর তেতো জল একই উৎস থেকে এক সাথে প্রবাহিত হতে পারে না। মানুষ যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখনই চোর চুরি করার সুযোগ পায়, তবে মানুষ সজাগ থাকা অবস্থায়ও তাদের সহায় সম্পদ লুট করার জন্য ডাকাতের দল হাজির হয় এবং গৃহস্তকে আহত–নিহত করে মালামাল লুটে নেয়। ডাকাত কোনো আইন কানুনের ধার ধারে না। যেমনটা আজ আমাদের দেখতে হচ্ছে। দাঙ্গা–হাঙ্গামাকারী জনতা পুরো দেশটাকে তটস্থ করে তুলছে। সরদার হুকুম দিচ্ছে আর উচ্ছৃঙ্খল অপশক্তি ধেয়ে যাচ্ছে, হামলা করছে, এক একটি অফিস পাড়ায় গিয়ে ইচ্ছেমত ছাটাই করছে অফিস কর্মকর্তাদের, আবার নিজেদের মনোনীত ব্যক্তিদের হেথায় বসিয়ে দিচ্ছে; সম্পূর্ণ মগের মল্লুক। চর দখল আর ঘর দখলের মত কর্মকান্ড যা লাঠিয়াল বাহিনী করে চলছে। আসলে মানুষ বরাবরের মত নির্বোধ রয়েই গেল। গুজবে তারা ছুটে চলে, চিলে কান নিয়েছে বলার সাথে সাথে উড়ন্ত চিলের পিছু ছুটে চলা স্বভাব মেধা আমাদের। আঘাত পাওয়ার পরে পস্তানো, ‘আগেই ভাল ছিলাম’, এমন বিলাপ পথে ঘাটে সমাজের সর্বত্র শোনা যায়। কথায় বলে, বাঘে ছুলে আঠারো ঘা। প্রতারকদের মন্ত্রনায় কান দিয়ে যে ক্ষতি ইতোমধ্যে হয়ে গেছে তা পূরণ করা কি কখনো সম্ভব হবে? যে সময় বয়ে যায় তা আর ফিরানো সম্ভব নয়। হতাশ হবার কিছুই নেই, যদি কেউ সঠিক হেদায়েত পেয়ে যায় তবে পুনর্গঠন পাওয়া সম্ভব। “তারপর শাসনকর্তা নহিমিয়া, ইমাম ও আলেম উযায়ের এবং যে লেবীয়রা লোকদের শিক্ষা দিচ্ছিলেন তাঁরা সমস্ত লোকদের বললেন, আজকের এই দিনটা আপনাদের মাবুদ আল্লাহর উদ্দেশে পবিত্র। আপনারা শোক বা কান্নাকাটি করবেন না। তিনি এই কথা বললেন, কারণ লোকেরা সবাই তৌরাতের কথা শুনে কাঁদছিল। নহিমিয়া বললেন, আপনরা গিয়ে ভালভাবে খাবার ও মিষ্টি রস খান আর যাদের কোন খাবার নেই তাদের কিছু কিছু পাঠিয়ে দিন। আজকের দিনটা হল আমাদের মাবুদের উদ্দেশে পবিত্র। আপনারা দুঃখ করবেন না, কারণ মাবুদের দেওয়া আনন্দই হল আপনাদের শক্তি। লেবীয়রা সমস্ত লোকদের শান্ত করে বললেন, আপনারা নীরব হন, কারণ আজকের দিনটা পবিত্র। আপনারা দুঃখ করবেন না। তখন সমস্ত লোক খুব আনন্দের সংগে খাওয়া–দাওয়া করবার জন্য ও খাবারের অংশ পাঠাবার জন্য চলে গেল, কারণ যে সব কথা তাদের জানানো হয়েছিল তা তারা বুঝতে পেরেছিল ” (নহিমিয়া ৮ : ৯–১২)।
আসলে আমাদের বিলাপ করার কিছুই নেই, কেননা অদ্যাবধি খোদার রহমতে বেঁচে আছি। পাক–হানাদার বাহিনী বিগত ১৯৭১ খৃষ্টাব্দে বাংলাদেশটিকে বর্বরোচিতভাবে ছারখার করেছিল, মা–বোনদের ইজ্জত লুটেছিল, বাগ–বাগিচা বিরাণ করে গেল, তারপর সবকিছু আমাদের নতুন করে গড়ে তুলতে হয়েছে। আমাদের বেধে রাখতে পারে নি একত্তরের ধ্বংসস্তুপের মধ্যে। প্রাকৃতিক ঝড়ঝঞ্ছা, সাইক্লোন, জলোচ্ছাস, অগøুৎপাত প্রভৃতি তথা মানুষের গড়া সভ্যতা স্থাপনা বিলীন করে দেয়, তারপরেও মেধাবি জনমানুষ শ্রমে ঘামে তা গড়ে তুলে, প্রকৃতির হাতে ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তিবর্গ প্রকৃতির বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেয় না। বেঁচে থাকাটাই হলো স্বার্থক। পরিশ্রমে ধন আনে, অলস ব্যক্তি তা শেষ করে দেয়। আমরা হলাম পরিশ্রমি জাতি, খোদা অলসতা অনুমোদন করেন না। আমরা কোনো প্রতিশোধ নেব না, প্রতিশোধ নেয়ার ভার খোদার উপর ছেড়ে দিতে হবে।
আমাদের একটি মুনাজাত থাকবে মাবুদের দরবারে, খোদার উত্তম সৃষ্টি আশরাফ মাখলুকাত মানবজাতি যেন অভিশপ্ত ইবলিসের কবল থেকে অবমুক্ত থাকতে পারে। খোদা মানব মুক্তির জন্য যে বিশেষ ব্যবস্থা কার্যকর করেছেন তা কেবল গুটিকয়েক মানুষের জন্যই দত্ত হয় নি, বরং গোটা বিশ্বের সকল আদম সন্তানের জন্যই প্রদান করা হয়েছে । মানুষের মধ্যে বর্তমানে যে ভাগাভাগী দৃষ্ট হচ্ছে তা কেবল বাহ্যিক, এই ব্যাপারে খোদার পক্ষ থেকে তেমন কোনো অনুমোদন আসে নি। যদি তেমন হয় তবে খোদার বয়ান মিথ্যা বলে হবে প্রমানীত। যেক্ষেত্রে মাত্র একজন আদমের মাধ্যম তিনি সকল মানুষের জন্মের আদেশ দিয়েছেন। “পিতা, তুমি যেমন আমার সংগে যুক্ত আছ আর আমি তোমার সংগে যুক্ত আছি তেমনি তারাও যেন আমাদের সংগে যুক্ত থাকতে পারে। তাতে দুনিয়ার লোকেরা বিশ্বস করতে পারবে যে, তুমিই আমাকে পাঠিয়েছ। যে মহিমা তুমি আমাকে দিয়েছ তা আমি তাদের দিয়েছি যেন আমরা যেমন এক তারাও তেমনি এক হতে পারে, অর্থাৎ আমি তাদের সংগে যুক্ত ও তুমি আমার সংগে যুক্ত, আর এভাবে যেন তারা পূর্ণ হয়ে এক হতে পারে। তাতে দুনিয়ার লোকেরা জানতে পারবে যে, তুমিই আমাকে পাঠিয়েছ, আর আমাকে যেমন তুমি মহব্বত কর তেমনি তাদেরও মহব্বত কর” (ইউহোন্না ১৭ : ২১–২৩)