শেষ নাজাত–আনন্দের ভোজ
The last Supper
শেষ প্রভুর ভোজ
মথি ২৬ : ১৭–৩০
(মথি ২৬ : ২৬–২৮) (মার্ক ১৪ : ২২–২৪)। (লুক ২২ : ১৭–২০)। (১করিন্থীয় ১১ : ২৩–২৫)।
মসীহ ঈসার জীবদ্দশায় (৩৩ বৎসর) তিনি গোটা দেশবাসিকে ন্যায় ও সত্যের পথে আহŸান করেছেন। তাঁর শিক্ষাকলাপে মানুষের সাথে মানুষের নিরঙ্কুশ প্রেম ও ক্ষমার আবহ সৃষ্টি করার জন্য তাগিদ দিয়ে ফিরছেন। তিনি অবশ্য কথায় কাজে প্রকাশ করেছেন, খোদার হারানো সন্তানদের খুঁজে নিয়ে পিতার সন্তান পিতার হাতে তুলে দিতে এসেছেন; আর তেমন কঠিন দুরুহ কাজ করার জন্য যতই চুড়ান্ত মূল্য তাঁকে দিতে হোক না কেন, তাতে তিনি পিছপা হবেন না। প্রয়োজনবোধে তিনি স্বীয় পূতপবিত্র জীবন কোরবান করে দিবেন। অর্থাৎ মানুষের কৃত পাপের প্রায়শ্চিত্ত পরিশোধ করবেন। সেবা পাবার জন্য তিনি জগতে আগত নন বরং পতীত জনগোষ্ঠিকে সেবা দান করার জন্যই নিজেকে বিন্ম্রর করেছেন, “মসিহ ঈসার যে মনোভাব ছিল তা যেন তোমাদের দিলেও থাকে। আসলে তিনি আল্লাহ রইলেন, কিন্তু আল্লাহর সমান থাকা তিনি আঁকড়ে ধরে রাখবার মত এমন কিছু মনে করেন নি। তিনি বরং গোলাম হয়ে এবং মানুষ হিসাবে জন্মগ্রহণ করে নিজেকে সীমিত করে রাখলেন। এছাড়া চেহারায় মানুষ হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত, এমন কি, ক্রুশের উপরে মৃত্যু পর্যন্ত বাধ্য থেকে তিনি নিজেকে নীচু করলেন। আল্লাহ এজন্যই তাঁকে সবচেয়ে উঁচুতে উঠালেন এবং এমন একটা নাম দিলেন যা সব নামের চেয়ে মহৎ, যেন বেহেশতে, দুনিয়াতে এবং দুনিয়ার গভীরে যারা আছে তারা প্রত্যেকেই ঈসার সামনে হাঁটু পাতে, আর পিতা আল্লাহর গৌরবের জন্য স্বীকার করে যে, ঈসা মসিহই প্রভু” (ফিলিপীয় ২ : ৫–১১)।
আজকে আমাদের আলোচ্য বিষয় হলো প্রভুর ভোজ যা অনুষ্ঠিত হয়েছিল জেরুজালেমে শিয়ন পর্বতে অবস্থিত আপাররূমে। ঘটনাটি ঘটেছিল সলিবে প্রভুর আত্মকোরবানি দেবার পূর্বে অর্থাৎ তিনি তাঁর মাটির দেহে অবস্থান কালে শেষ ভোজের ব্যবস্থা করেছিলেন। উক্ত ভোজে আমন্ত্রিত ছিলেন তাঁর ১২জন সাহাবী। স্বাভাবিক খাওয়া দাওয়ার পরে তিনি রুটি ভাঙ্গলেন এবং টুকরো টুকরো করে প্রত্যেকের হাতে তুলে দিলেন, তিনি তাদের উদাহরণ হিসেবে বললেন, এটা আমার মাংস (শরীর) যা তোমাদের জন্য অর্থাৎ তোমাদের জীবনের জন্য দেয়া হলো, আমার দেহ হলো আসল ভক্ষ, তারপর তিনি আঙ্গুর রস পেয়ালা থেকে দিয়ে বললেন, এটা আমার রক্ত যা ক্ষরিত হবে তোমাদের পাপের কাফফারা পরিশোধ করার নিমিত্তে, ফলে তোমরা হতে পারবে সম্পূর্ণ বেগুনাহ নতুন সৃষ্টি, আর নতুন সৃষ্টি হিসেবে পুনর্মিলিত হতে পারবে পরম পিতার সাথে। যিনি আমার রক্ত পান করে তারই রয়েছে অনন্ত জীবন।
মসীহ যে শিক্ষা দিয়েছেন তা প্রতীকী শিক্ষা মাত্র। মাটির দেহে আগত মসীহের রক্ত মাংস ভক্ষণ করার মাধ্যমে যদি কারো অনন্ত জীবন লাভ হয়ে থাকে তবে তিনি মাটির দেহে বেঁচে রইলেন কেমন করে, আর রোমক সৈনিকরা তাঁকে কিভাবে নিষ্ঠুর সলীবে মেরে ফেললো? মসীহ একদা শিক্ষা দিয়েছেন, মাংস কোনো কাজের নয় পাকরূহ জীবন দান করেন, “মানুষের শরীর কোন কাজের নয়; পাক–রূহই জীবন দেন। আমি তোমাদের যে কথাগুলো বলেছি তা রুহানী জীবন দান করে, কিন্তু তোমাদের মধ্যে এমন কেউ কেউ আছে যারা আমার উপর ঈমান আনে নি” (ইউহোন্না ৬ : ৬৩–৬৪)। এ প্রসংগে “ঈসা মসীহ তাঁদের বললেন, “আমি সত্যিই আপনাদের বলছি, ইবনে–আদমের গোশত ও রক্ত যদি আপনারা না খান তবে আপনাদের মধ্যে জীবন নেই। যদি কেউ আমার গোশত ও রক্ত খায় সে অনন্ত জীবন পায়, আর আমি শেষ দিনে তাকে জীবিত করে তুলব। আমার গোশতই হল আসল খাবার আর আমার রক্তই আসল পানীয়। যে আমার গোশত ও রক্ত খায় সে আমারই মধ্যে থাকে আর আমিও তার মধ্যে থাকি। জীবন্ত পিতা আমাকে পাঠিয়েছেন আর তাঁরই দরুন আমি জীবিত আছি। ঠিক সেভাবে যে আমাকে খায় সেও আমার দরুন জীবিত থাকবে। এ সেই রুটি যা বেহেশত থেকে নেমে এসেছে। আপনাদের পূর্বপুরুষেরা যে রুটি খেয়েও মারা গেছেন এ সেই রকম রুটি নয়। এই রুটি যে খাবে সে চিরকালের জন্য জীবন পাবে” (ইউহোন্না ৬ : ৫৩–৫৮) অংশটি জুড়ে দেয়া হলো। আমরা প্রথম দেখব পয়দায়েশের একটি অংশ “সৃষ্টির শুরুতেই আল্লাহ্ আসমান ও জমীন সৃষ্টি করলেন। দুনিয়ার উপরটা তখনও কোন বিশেষ আকার পায় নি, আর তার মধ্যে জীবন্ত কিছুই ছিল না; তার উপরে ছিল অন্ধকারে ঢাকা গভীর পানি। আল্লাহর রূহ্ সেই পানির উপরে চলাফেরা করছিলেন” (পয়দায়েশ ১ : ১–২), “প্রথমেই কালাম ছিলেন, কালাম আল্লাহর সংগে ছিলেন এবং কালাম নিজেই আল্লাহ ছিলেন। আর প্রথমেই তিনি আল্লাহর সংগে ছিলেন। সব কিছুই সেই কালামের দ্বারা সৃষ্ট হয়েছিল, আর যা কিছু সৃষ্ট হয়েছিল সেগুলোর মধ্যে কোন কিছুই তাঁকে ছাড়া সৃষ্ট হয় নি। তাঁর মধ্যে জীবন ছিল এবং সেই জীবনই ছিল মানুষের নূর। সেই নূর অন্ধকারের মধ্যে জ্বলছে কিন্তু অন্ধকার নূরকে জয় করতে পারে নি। আল্লাহ ইয়াহিয়া নামে একজন লোককে পাঠিয়েছিলেন। তিনি নূরের বিষয়ে সাক্ষী হিসাবে সাক্ষ্য দিতে এসেছিরেন যেন সকলে তাঁর সাক্ষ্য শুনে ঈমান আনতে পারে। তিনি নিজে সেই নূর ছিলেন না কিন্তু সেই নূরের বিষয়ে সাক্ষ্য দিতে এসেছিলেন। সেই আসল নূর, যিনি প্রত্যেক মানুষকে নূর দান করেন, তিনি দুনিয়াতে আসছিলেন। তিনি দুনিয়াতেই ছিলেন এবং দুনিয়া তাঁরা দ্বারা সৃষ্ট হয়েছিল, তবু দুনিয়ার মানুষ তাঁকে চিনল না। তিনি নিজের দেশে আসলেন, কিন্তু তাঁর নিজের লোকেরাই তাঁকে গ্রহণ করল না। তবে যতজন তাঁর উপর ঈমান এনে তাঁকে গ্রহণ করল তাদের প্রত্যেককে তিনি আল্লাহর সন্তান হবার অধিকার দিলেন। এই লোকদের জন্ম রক্ত থেকে হয়নি, শারীরিক কামনা বা পুরুষের বাসনা থেকেও হয় নি, কিন্তু আল্লাহ থেকেই হয়েছে। সেই কালামই মানুষ হয়ে জন্মগ্রহণ করলেন এবং আমাদের মধ্যে বাস করলেন। পিতার একমাত্র পুত্র হিসাবে তাঁর যে মহিমা সেই মহিমা আমরা দেখেছি। তিনি রহমত ও সত্যে পূর্ণ” (ইউহোন্না ১ : ১–১৪)।
এবার প্রশ্ন রাখা চলে, মানুষকে উদ্ধার করার জন্য খোদা কাকে প্রেরণ করেছেন। তিনি আর কেউ নন, খোদার পাকরূহ ও জীবন্ত কালাম যাকে রূহুল্লাহ ও কালেমাতুল্লাহ বলে আখ্যাত করা হয়েছে। গোটা বিশ^ খোদার কালামের দ্বারা হয়েছে সৃষ্ট। খোদার জীবন্ত রূহ কুমারী মরিয়মের গর্ভে ফুঁকে দেয়া হয়েছে মানব শিশুরূপে যেন ঐশি রূহ জগতে প্রবেশ করতে পারে “এই পুত্রই হলেন অদৃশ্য আল্লাহর হুবহু প্রকাশ। সমস্ত সৃষ্টির আগে তিনিই ছিলেন এবং সমস্ত সৃষ্টির উপরে তিনিই প্রধান, কারণ আসমান ও জমীনে, যা দেখা যায় আর যা দেখা যায় না, সব কিছু তাঁর দ্বারা সৃষ্ট হয়েছে। আসমানে যাদের হাতে রাজত্ব, কর্তৃত্ব, শাসন ও ক্ষমতা রয়েছে তাদের সবাইকে তাঁকে দিয়ে তাঁরই জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে।” (কলসীয় ১ : ১৫–১৬)। মানুষের পাপের কাফফারা পরিশোধ দেবার জন্য উক্ত শিশুটি কোরবানিযোগ্য মেষ হিসেবে নিজেকে ঘাতকদের হাতে নিরবে নির্বিবাদে তুলে দিলেন, যেন গোটা পতীত বিশ^ কেবল বিশ^াসহেতু নাজাত লাভ করে তথা ইবলিশ ও গুনাহের কবল থেকে অবমুক্তি পায় যা হলো অনন্ত কালের জীবন।
আজ আপনাকে আমাকে চলতে হবে খোদার কালাম ও পাকরূহের পরিচালনায়।
গবেষক
এম এ ওয়াহাব