আমরা ১৪ ভাই–বোন। এর মধ্যে মুনীর ভাই ছিলেন দ্বিতীয়। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার দু’দিন আগে আমরা তাঁকে হারাই, তখন ভাইয়ের বয়স ছিল মাত্র ৪৭ বছর। আমার ভাইবোনদের মধ্যে মুনীর ভাই সবচেয়ে মেধাবী আর রসিক ছিলেন। ওই একটা মাথার মধ্যে কত বুদ্ধি, কত লেখাপড়া ছিল, তা আর বলার নয়। মুনীর ভাই দুটি বিষয়ে এমএ পাস করেছেন। প্রথমবার ইংরেজিতে। তারপর বাংলায়। বাংলায় এমএ করেছেন জেলখানায় বসে। সবাইকে চমকে দিয়ে তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। মুনীর ভাই গুছিয়ে চমৎকারভাবে কথা বলতেন। তাঁর শব্দ ব্যবহার ও শব্দ চয়ন ছিল অসাধারণ। একটু বইয়ের ভাষায় বলতে ভালোবাসতেন– কখনও মাইকেল থেকে নিতেন, কখনও রবীন্দ্রনাথ, কখনও বঙ্কিম।
তাঁর ভাষাটা সত্যি এক আলোচ্য বিষয় ছিল। সুন্দর সুন্দর কঠিন বাংলা শব্দ ব্যবহার তাঁর স্বভাবজাত ছিল। তিনি যখন অকপটে সাবলীল ভাষায় কথা বলতেন, আমরা মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তাঁর কথা শুনতাম; তাঁর মুখে একটুও অস্বাভাবিক মনে হতো না। অনেক সময় নিজেরা ওই ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করতাম, কিন্তু বৃথা চেষ্টা– নিজের কানেই নিজেকে হাস্যকর লাগত। একটা উদাহরণ দিলে বোঝা যাবে, একবার বাড়িতে কোনো এক কারণে ভাই আমার ঘরে অনেকক্ষণ ধরে দরজার কড়া নাড়ছিলেন। দরজা খুলতে একটু সময় লাগল। দরজা খোলার পর বললেন, ‘এত দেরি হলো কেন? কী করছিলি?’
আমিও ভাইয়ের মতো করে শুদ্ধ ভাষায় জবাব দিলাম, ‘ভক্ষণ করিতেছিলাম।’ ভাই বললেন, ‘তোরা আবার কিসের ভক্ষণ করিস? তোরা তো গিলিস। রাজা–বাদশাহরা ভক্ষণ করে।’ এই ধরনের রসবোধসম্পন্ন কথা তিনি তাৎক্ষণিক বলতেন। যে কোনো মানুষ ১০ মিনিট উনার সঙ্গে কথা বললেই মুগ্ধ হয়ে যেতেন।
অনেকে বলেন, ‘অমুক খুব ভালো কথা বলেন’, আগে ভাবতাম, কথার আবার ভালো–মন্দ কী! পরিণত বয়সে এসে বুঝেছি, সবাই ভালো করে কথা বলতে পারে না। সবার কথা অতটা চিত্তাকর্ষকও হয় না। মুনীর ভাই যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিতেন, তখন অন্য ক্লাসের শিক্ষার্থীরাও এসে পেছনে দাঁড়িয়ে শুনত। জনপ্রিয় শিক্ষক ছিলেন তিনি। তাঁর পড়ানোর ভঙ্গিটাই ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। মুনীর চৌধুরীর ক্লাস যিনি একবার করেছেন, তিনি নাকি সেই গল্প সারাজীবন করেছেন। মুনীর ভাইয়ের অনুবাদ পড়ে মনে হয় না যে, অনুবাদ পড়ছি। এত সহজ এত গতিশীল।
মুনীর ভাইকে মানুষ যেভাবে দেখে, আমরা ভাই–বোন হয়েও একটু অন্যরকমভাবে দেখতাম। কারণ, তিনি অনেক জ্ঞানী ছিলেন, অনেক কিছু জানতেন, পড়তেন। নাটক লিখে লিখে আমাদের পড়ে শোনাতেন। আমাদের প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। বাজারে যে মৌসুমে যেই ফল আসত, সেটাই এনে দিতেন। এত সাধারণ, সহজ ছিলেন।
আমার বাবা নাটক–গান–থিয়েটার পছন্দ করতেন না। নোয়াখালীর ভাষায় তিনি বলতেন, ‘কুনোগা (কেউ) যদি নাটক করে, জবাই করি দিউম।’ তখন তো প্রশ্নই আসে না নাটকে অভিনয়ের। একদিন আমি জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আছি, মুনীর ভাই এসে বললেন, ‘তুই কি আমার একটি নাটকে অভিনয় করে দিবি?’ আমি অবাক হয়ে বললাম, কী বলেন আপনি এসব! বাবা তো জবাই দিয়ে দেবে। পরে ভাই বলেন, ‘সে দায়িত্ব আমি নেব। তুই করবি কিনা বল।’ আমি অভিনয় জানি না, কিছু বুঝি না, কী করব? মুনীর ভাই বলেন, ‘কিছু করতে হবে না, এটা একটা রোবটের চরিত্র। যন্ত্রমানব, কিছু বুঝতে হবে না। শুধু সংলাপ বলে যাবি। চোখ–মুখের কোনো ভঙ্গিমার দরকার নেই।’ উনি দায়িত্ব নেওয়ায় সাহস পাই। অভিনয় শেষ করে আসার পর মুনীর ভাই কী যে খুশি হয়েছিলেন। কত আদর করছিলেন। আমাকে অভিনয়ের উৎসাহ দিতেন মুনীর ভাই। অথচ আমার সাফল্য দেখে যেতে পারেননি তিনি। এ নিয়ে মন তো খারাপ হয়। মুনীর ভাইয়ের সঙ্গে সর্বশেষ স্মৃতি ১৯৭১ সালে। আমরা যখন ওপারে (ভারত) চলে গিয়েছিলাম। তাঁকেও অনেকেই বলেছিলেন যাওয়ার জন্য। কিন্তু ভাই বলতেন, ‘আমি কেন যাব? আমি তো কারও কোনো ক্ষতি করিনি।’ ভাইয়ের এই কথাটা খুব মনে পড়ে। সেই ভাইকে নির্মমভাবে হত্যা করল। তাঁর মরদেহও পাইনি।