পৃথিবীর যাবতীয় প্রাণীকুল জন্মের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে, তবে সকল প্রাণীর জন্ম একবারই হয়ে থাকে, কথায় বলে, একবার জন্ম আর একবার মৃত্যু। ব্যতিক্রম হলো মানুষের ক্ষেত্র, আর মানুষের জন্ম দুইবার হবার সম্ভাবনা থাকে। অনেক সুপন্ডিত ব্যক্তিরাও পর্যন্ত বিষয়টি অনুধাবন করতে ব্যার্থ হয়েছে, তাই তারা বিষয়টি মেনে নিতে তো পারেই নি উল্টো বিতর্ক জুড়ে বসেছে। কিতাবুল মোকাদ্দসে বিষয়টি প্রাঞ্জলভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, নিকোদীম নামক একজন বৃদ্ধ আলেম নতুন জন্মের বিষয়ে মসীহের কাছে প্রশ্ন করে বসলেন। মানুষ বৃদ্ধ হওয়ার পর সম্ভব কি তার পক্ষে পুনরায় মাতৃগর্ভে গিয়ে আবার জন্মলাভ করা? তিনি বিষয়টির গুরুুত্ব বুঝতেই পারলেন না। মানুষ জগতের আর দশটি প্রাণীর মত একবার জন্মলাভ করে বটে, তবে তার জন্য অপেক্ষা করে বিশেষ আর একটি জন্ম, যা জীব–জানোয়ার থেকে তাকে বিশেষ বৈশিষ্ট এনে দেয়। মায়ের গর্ভ থেকে জন্মলাভ হলো মাংসিক জন্ম যা সর্বক্ষেত্রে আমরা প্রত্যক্ষ করে থাকি। মানুষের দ্বিতীয় জন্ম হলো তার রূহানী জন্ম, যার ফলে উক্ত নতুন জন্মপ্রাপ্ত ব্যক্তিটি রূহের সাথে সংযুক্ত হয়ে থাকে। তেমন জন্মকে বলতে হবে রূহানী জন্ম। “ঈসা নীকদীমকে বললেন, “আমি আপনাকে সত্যিই বলছি, নতুন করে জন্ম না হলে কেউ আল্লাহর রাজ্য দেখতে পায় না।” (ইউহোন্না ৩ : ৩)।
মানুষ থেকে যা জন্মগ্রহন করে তা মানুষই থাকে, আর পাকরূহ থেকে যার জন্ম হয় সে তো রূহানী সন্তান, যার সাথে সম্পর্ক থাকে রূহের অর্থাৎ পাকরূহের অর্থাৎ খোদার। কেননা খোদা হলেন রূহ। খোদার সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করার জন্য চাই রূহানী অবস্থান, যার মধ্যে থাকতে পারে না মিথ্যা মায়া মরীচিকা। রূহানী ব্যক্তি কোনো আন্দাজ অনুমানের উপর ভর করে চলে না, বরং তার মধ্যে অধিষ্ঠিত পাকরূহ সবকিছু পরিষ্কার করে দেন। নতুন জন্মপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পরিচালনা করার জন্য সহায় বা গাইড হিসেবে তাদের পাকরূহকে অভিষেক দেয়া হয়ে থাকে। অভিষিক্ত ব্যক্তি এক্ষেত্রে থাকে কিছুটা স্বাধীন। দেখা যায় উক্ত ব্যক্তি কখনো কখনো পাকরূহের নির্দেশনা উপেক্ষা করে নিজের ক্ষতি নিজে ডেকে আনছে; তেমন অবস্থা অধিকাংশ লোকের ক্ষেত্রে ঘটতে দেখা যায়। তারপরেও মাবুদ বড়ই মেহেরবান ক্ষমাশীল। অনুতপ্ত ব্যক্তিকে তাৎক্ষণিক ক্ষমা করে দেন, ফলে ঐ একই ব্যক্তি পুনরায় মসীহের পক্ষে আলোর প্রতীক হিসেবে আলো দান করে চলেন। “ওহে দূর দেশের লোকেরা, আমার কথা শোন; দূরের জাতিরা, কান দাও। আমার জন্মের আগে মাবুদ আমাকে ডেকেছিলেন; তিনি মায়ের গর্ভ থেকে আমার নাম উল্লেখ করে আসছেন। তিনি আমার মুখকে ধারালো তলোয়ারের মত করেছেন। তিনি আমাকে তাঁর হাতের ছায়ায় লুকিয়ে রেখেছেন। তিনি আমাকে একটা বাছাই করা তীর করেছেন আর তাঁর তীর রাখবার খাপের মধ্যে রেখেছেন। তিনি আমাকে বললেন, “হে ইসরাইল, তুমি আমার গোলাম; আমি তোমার মধ্য দিয়েই আমার গৌরব প্রকাশ করব।” কিন্তু আমি বললাম, “আমার পরিশ্রম নিষ্ফল হয়েছে; আমি অসার উদ্দেশ্যে লাভ ছাড়াই আমার শক্তি ক্ষয় করেছি। তবুও আমার যা পাওনা তা মাবুদেরই হাতে রয়েছে, আর আমার পুরস্কার রয়েছে আল্লাহ্র কাছে।” মাবুদ তাঁর গোলাম হবার জন্য আমাকে গর্ভের মধ্যে গড়েছেন যেন আমি ইয়াকুবকে তাঁর কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারি আর ইসরাইলকে তাঁর কাছে আনতে পারি। আমি মাবুদের চোখে সম্মানিত আর আমার আল্লাহ্ আমার শক্তি। তিনি বলছেন, “কেবল ইয়াকুবের বংশকে উদ্ধার করবার জন্য আর ইসরাইলের বেঁচে থাকা বান্দাদের ফিরিয়ে আনবার জন্য যে তুমি আমার গোলাম হবে তা নয়; সেটা খুবই সামান্য ব্যাপার। এছাড়াও আমি অন্য জাতিদের কাছে তোমাকে আলোর মত করব যেন তোমার মধ্য দিয়ে সারা দুনিয়ার লোক নাজাত পায়।” (ইশাইয়া ৪৯ : ১–৬)।
রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে প্রত্যেকটি ব্যক্তির একবার জন্ম হয় আর একবার মৃত্যু ঘটে। অবশ্য কিতাবের আলোকে মানুষের জন্য অপেক্ষা করছে পুনরুত্থান যা শেষ বিচারের দিনে হবে। যাকে কিয়ামত বলেও গণনা করা হয়। কোনো মানুষ জন্ম, মৃত্যু ও পুনরুত্থান এড়িয়ে যেতে পারে না। মানুষের রয়েছে রূহানী জন্ম, যা হলো তার দ্বিতীয় জন্ম, কালামের আলোকে দেখা যায় রূহানী জন্ম না হওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি মাবুদের সাথে সাখ্যাত করতে পারে না। “মানুষ থেকে যা জন্মে তা মানুষ, আর যা পাক–রূহ থেকে জন্মে তা রূহ” (ইউহোন্না ৩ : ৬), “কিন্তু যে সত্যের পথে চলে সে নূরের কাছে আসে যেন তার কাজগুলো যে আল্লাহর ইচ্ছামত করা হয়েছে তা প্রকাশ পায়।” (ইউহোন্না ৩ : ২১)। খোদাকে কেউ কখনোই দেখে নি, কেননা তিনি হলেন রূহানী সত্ত্বা, যিনি অদৃশ্য, যাকে চর্ম চোখে দর্শন লাভ করা সম্ভব নয়। রূহ দেখতে হলে অবশ্যই ঈমানের চোখ থাকতে হবে। তবে খোদার পাকরূহ যখন মানবরূপ ধারণ করে মানুষের মধ্যে প্রবেশ করেছেন, তখন তাকে সকলেই দেখতে পেয়েছে। তাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে তাঁর সাথে অর্থাৎ মানবরূপী পাকরূহের সাথে ব্যক্যালাপ করা এবং তাদের বোধের অতীত ঐশি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা। যেমন বনি–ইসরাইলদের শিক্ষক হওয়া সত্যেও নীকদীম রূহানী বিষয়ে ছিলেন অজানা, কেননা তার এ বিষয়ে কোনো ধারণও ছিল না।
খোদার এবাদত সেই আদমের যুগ থেকে পরিচালিত হয়ে আসছে, তবে একই খোদাকে তুষ্ট করতে গিয়ে মানুষ নিজেদের মধ্যে মতবাদগত পার্থক্য এতটাই সৃষ্টি করে রেখেছে যা তেল–জলের মত বিপরীতমুখী চরিত্র এবং তারা যেন পরষ্পর উত্তর মেরু আর দক্ষিণ মেরুতে অবস্থান করে। তবে ঐ একই খোদার উপাষণা করে হয় সকলে তৃপ্ত। এর অনেকগুলো কারণের মধ্যে একটি হলো, তারা সত্যিকারের খোদার পরিচয় পায় নি। খোদা হলেন প্রেম ও ক্ষমাধনে সীমাহিন পারাবার। বান্দা পাপ অপরাধ করার পরে যখন অনুতাপানলে জ¦লতে থাকে, আর হৃদয় নিসৃত ভক্তিশ্রদ্ধা নিয়ে মাবুদের কাছে মাগফেরাতের কামনা করে, দায়ার্দ্র মাবুদ তখনই তাকে ক্ষমা করে দেন এবং সুযোগ করে দেন স্নাতশুভ্র হয়ে স্বীয় ক্রোড়ে আসন পাবার। “আল্লাহ আমাদের নাজাত করেছেন এবং পবিত্রভাবে জীবন কাটাবার জন্য ডেকেছেন। আমাদের কোন কাজের জন্য তিনি তা করেন নি, বরং তাঁর উদ্দেশ্য এবং রহমতের জন্যই করেছেন। দুনিয়া সৃষ্ট হবার আগে মসীহ ঈসার মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর রহমত আমাদের দান করেছিলেন” (২তীমথিয় ১ : ৯)।
পাককালামের সঠিক ব্যাখ্যা বা বাস্তব দৃষ্টান্ত হলেন খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসীহ। যদিও তিনি ধরাপৃষ্ঠে ৩৩টি বৎসর ধরে জীবন–যাপন করেছেন, মাটির মানুষের সাথে সংগ লাভ করেছেন, তবুও তিনি কোনো পাপ স্পর্শ করেন নি। তিনি মানুষকে দোষী প্রমাণ করার জন্য আসেন নি বরং পথ ভুলো মানুষদের সঠিক পথে পরিচালনা করে খোদার সন্তান খোদার হাতে তুলে দিতে এসেছেন।
বিশ্বের বহুগ্রন্থে মসীহের বিষয়ে বর্ণনা রয়েছে। তিনি যে সম্পূর্ণ বেগুনাহ জীবন যাপন করেছেন তা সকলের কাছে আশ্চর্যের বিষয়। কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব হলো না নিষ্পাপ জীবন যাপন করা। মানুষ কচুকাটা করার চেয়ে অধিক পাপ অপরাধ আর কি হতে পারে। কেউ কেউ এমন অপরাধ কর্মকে জায়েজ করেছে খোদার আজ্ঞা বলে। অজ্ঞ–অনভিজ্ঞ সমাজে মরীচিকাকেও মিষ্টি জলের প্রবাহিনী বলে চালিয়ে আসছে; যেমনটা দেখতে পাই প্রথম জোড়া আদমের (আদম–হাওয়া) ক্ষেত্রে। “উক্ত ফল খেলে তোমাদের চোখ খুলে যাবে নিশ্চয়ই মরবে না।” তা বাপু ঠিকই বলেছো, ফল খেয়ে এমন মরণ হয়েছে যা না পারা গেল কবর দিতে না পারা গেল খোদার পূতপবিত্র দরবারে আসন পেতে। ইবলিসের দাগা বা ধোকা হলো এমন; ধুকে ধুকে মরণ। মরণ তো নয় কাকুতিসার। ইবলিসের ব্রত হলো মানুষের জীবন অশান্তিতে ভরে তোলা। অথচ খোদা চাচ্ছেন মানুষ যেন আবার ফিরে আসতে পারে মাবুদের পাক দরবারে। মানুষ ভুল করেছে সত্য, তাই বলে তাকে আরো শাস্তি দিলে গজবের উপর গজব জমা হবে। খোদা মানুষের ত্রæটি বিচ্যুতি অপসারণ করে তাকে পুনগর্ঠন দিবে, যে কারণে তিনি স্বীয় পাকরূহ মানরূপে কোরবানি যোগ্য মেষ হিসেবে জগতে প্রেরণ করেছেন। তিনি হলেন বিকল্প ব্যবস্থা, গুনাহগারের পক্ষে কাফফারা পরিশোধ দেয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব। তাদের সাহায্য করা না হলে অবশ্যই তারা চিরকালের জন্য অনন্ত দোজখে অসহনীয় জ্বালায় নিয়ত জ্বলতে থাকবে।
মানুষের প্রতি খোদার অতুলনীয় প্রেমের কারণে মসীহ নিজের উপর জগতের পাপের দায় তুলে নিলেন, তিনি নিজেকে কোরবানি দিলেন মর্মবীদারক সলীবে। বিশ^বাসী খালাস পেল উক্ত কোরবানি ফলে। সকলের জন্য বেহেশতের দুয়ার খুলে গেল। কথায় বলে দোজখ যদি সম্পূর্ণ খালীও থাকে তাতে খোদার কিছুই এসে যায় না। কোনো পিতা মাতা কি তৃপ্ত হতে পারে তাদের আদুরে সন্তানের নির্মম জ্বালাতন দেখে। প্রশ্নই জাগে না। মানুষ হলো মাবুদের অতীব প্রিয় সৃষ্টি। তারা প্রত্যেকে খোদার দরবারে ফিরে আসুক এটাই তাঁর মনোবাসনা। “তোমার মাবুদ আল্লাহ তোমার মধ্যে আছেন, তাঁর রক্ষা করবার শক্তি আছে। তিনি তোমার বিষয় নিয়ে খুব আনন্দিত হবেন, আর তাঁর গভীর মহব্বতের তৃপ্তিতে তিনি নীরব হবেন। তিনি তোমার বিষয় নিয়ে আনন্দ–কাওয়ালী গাইবেন” (সফনিয় ৩ : ১৭)।