নেত্রকোনার খালিয়াজুরীর লক্ষাধিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র ভরসাস্থল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি চলছে কার্যত একজন মাত্র ডাক্তার দিয়ে। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে ডাক্তার না পেয়ে সরুফা বেগম (৬০) নামের এক স্থানীয় আক্ষেপ করে ইত্তেফাককে বলেন, ‘খাইল্ল্যাজুরী হাসপাতালে কোনো ডাক্তর খুইজ্যা পাইলাম না। ট্যাহার অভাবে অহন অইন্য কোনখানেও চিকিৎসা নিতে যাইতাম পারতাম না। তাই এইখানে চিকিৎসা ছাড়াই মরণ লাগব আমরার মত গরীব মানুষরার’!
জানা গেছে, ৩১ শয্যা বিশিষ্ট সরকারি এ হাসপাতালটিতে চিকিৎসা সেবা দিতে জুনিয়র কনসালট্যান্টসহ ডাক্তারের ৮টি পদের মধ্যে ৩টি পদ শূন্য, বাকি ৫টি পদের বিপরীতে পোস্টিং থাকলেও এদের মধ্যে ৩ জন ডাক্তারই অন্যান্য হাসপাতালে প্রেশনে নিয়োজিত রয়েছেন। এ হিসেবে কাগজ কলমে দুইজন ডাক্তারের নাম থাকলেও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. প্রনব কুমার পাল এ কর্মস্থলে খুব একটা আসেন না। তাই শুধুমাত্র একজন মাত্র ডাক্তারের ওপরই নির্ভর করছে এ উপজেলার প্রায় এক লাখ ছয় হাজার জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা সেবা।
মঙ্গলবার (১ অক্টোবর) সকালে খালিয়াজুরী সদরের কুড়িয়াহাটি গ্রামের হান্নান মিয়াসহ স্থানীয় অনেকেই বলেন, এ হাসপাতালে প্রায়ই কোনো ডাক্তার খুঁজে পাওয়া যায় না। সে ক্ষেত্রে জটিল ও জরুরি চিকিৎসা প্রত্যাশী রোগীদের মৃত্যুঝুঁকি বেড়েই চলে।
সম্প্রতি, বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দু‘জন উন্নয়নকর্মী জানিয়েছেন, গত ২৩ সেপ্টেম্বর বেলা ১২টার দিকে চিকিৎসা নিতে গিয়ে তারা হাসপাতালটিতে কোনো ডাক্তার পাননি।
স্থানীয়রা জানান, হাওর জনপদের খালিয়াজুরী উপজেলায় সরকারি এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ছাড়া বিকল্প কোনো হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিক নেই। নেই তেমন উন্নত কোনো পরীক্ষা–নিরীক্ষার ব্যবস্থা। ফলে রোগীকে দুরের পথ পেরিয়ে যেতে হয় জেলা শহরে।
জানা গেছে, হাসপাতালটিতে কোনো গর্ভবতী মায়ের সিজারিয়ান অপারেশন হয়নি কখনো। হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারটি অচল রয়েছে ডাক্তার ও যন্ত্রপাতির অভাবে। জনবল সংকটের কারণে হাসপাতালটি অপরিচ্ছন্ন থাকে বেশির ভাগ সময়।
হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিসংখ্যানবিদ রফিকুল ইসলাম জানান, এ হাসপাতালে মোট পদের সংখ্যা ১০৯টি। এর মধ্যে ৫০টি পদই শূন্য। হাসপাতালে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ছাড়া চিকিৎসা সেবা দিতে ডাক্তারের পদ আছে ৮টি। এর মধ্যে জুনিয়র কনসালট্যান্ট সার্জারি পদটি যুগ যুগ ধরে শূন্য। জুনিয়র কনসালট্যান্ট গাইনি পদের বিপরীতে পোস্টিং থাকলেও তিনি নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতালে নিয়োজিত আছেন প্রেশনে। জুনিয়র কনসালট্যান্ট অবস পদের বিপরীতে থাকা ডাক্তারও প্রেশনে আছেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ডেন্টাল সার্জন পদের ডাক্তার প্রেশনে নিয়োজিত রয়েছেন মদন হাসপাতালে। আবাসিক মেডিকেল অফিসারের পদটি এক বছর ধরে শূন্য। শূন্য রয়েছে একটি মেডিকেল অফিসারের পদও। নিয়োজিত আছেন শুধু একজন মেডিকেল অফিসার ও জুনিয়র কনসালট্যান্ট মেডিসিন। তাছাড়া, এ উপজেলার ৫টি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রর ৫ জন ডাক্তারের পদও দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে শূন্য।
এদিকে, জুনিয়র কনসালট্যান্ট মেডিসিন পদের বিপরীতে থাকা ডাক্তার প্রনব পালের অনুপস্থিতির কারণে তাকে বিগত কয়েক মাসের মধ্যে তিনবার শো–কজ করা হয়েছে। এমনটি জানিয়েছেন স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সৌনম বড়ুয়া। তবে ডা. প্রনব পালের দাবি, তিনি নিয়মের বাইরে কখনো এ কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন না।
এ হাসপাতালে প্রায়ই ডাক্তার খুঁজে পাওয়া যায় না এ কথাটিতে আপত্তি জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, এখানে ডাক্তার সংকট কাটাতে নেত্রকোনার সিভিল সার্জন মহোদয় প্রায় দু’মাস ধরে পার্শ্ববর্তী হাসপাতাল থেকে এনে দুইজন করে ডাক্তার সংযুক্তি দিচ্ছেন প্রতি দু’সপ্তাহের জন্য।
নেত্রকোনার সিভিল সার্জন অনুপম ভট্টাচার্য্য জানিয়েছেন, এখানে ডাক্তার সংকট কাটাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালককে (প্রশাসন) একাধিকার জানানো হয়েছে। সংকট মেটাতে আশ্বাসও দিয়েছেন।