যেকোনো বীজ থেকে প্রথমে শিকড় গজায়, তারপর ক্রমান্বয়ে কুড়ি পল্লব শাখা–প্রশাখা বিস্তার করে নিজের অস্তিত্ত্বের ইতিহাস জানান দেয়; যত্ন পরিচর্যা পেলে উক্ত চারা বৃক্ষটি কালের মহীরুহে পরিণত হতে পারে, হয়ে থাকে।
বিশ্বের যাবতীয় সৃষ্টির একটি ইতিহাস রয়েছে, যারা তেমন ঘটনাপুঞ্জির সাথে যুক্ত থাকে এবং সে বিষয়ের ক্রমোন্বতি করতে বা দেখতে চায়, তাদের অবশ্যই ঐতিহাসিক ক্রম বিবর্তনের বিষয়ে মৌলিক জ্ঞান থাকতে হবে। উড়োজাহাজের শুরুটা কার হাতে কেমন করে হয়েছিল তা বোধ হয় আপনাদের জানা রয়েছে। বিদ্যুতের আবিষ্কর্তা কে ছিলেন, বোধ হয় তার কথা মনে আছে। তিনি হলেন গ্যালভনি।
গোটা বিশ্বের নির্মাতার সাথে কি আপনার কোনো পরিচয় আছে? যদি থেকে থাকে তবে বিশ্ব সংক্রান্ত যাবতীয় প্রশ্ন তার কাছে করতে পারেন।
মানব জাতির বিষয় আপনি কতটুকু জানেন। আছে কি আপনার কোনো আগ্রহ সহমানুষের বিষয়ে খবর রাখার। কে মানুষ সৃষ্টি করেছেন? কেন সৃষ্টি করেছেন? কার সাথে মিল রেখে, কার অদৃশ্য চরিত্রের প্রকাশ ঘটাতে দৃশ্যমান মানুষ তিনি সৃষ্টি করেছেন? বিষয়গুলো জানা থাকলে সহজ হবে নির্মাতার বাগানে সহমানুষের সাথে ভ্রাতৃত্ব রেখে শালিনতা সহমর্মীতা সহযোগীতা বজায় রেখে বসবাস করা।
অনেকে একা একা বসবাস করতে পছন্দ করে, তবে তেমন একাকীত্বের জীবন কতক্ষণ যাপন করা সম্ভব? সহমানবের সহযোগীতা সর্বক্ষণ আপনার আবশ্যক, অন্যথায় আপনি সম্পূর্ণ অচল হয়ে যাবেন যে। যেমন একটি প্রবাদ বাক্য রয়েছে: ‘দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ’। আমি যে লিখে চলছি, যে টেবিলে কাগজ রেখে, যে কলমটি ব্যবহার করছি, যে চেয়ারে বসে আছি; বলুন, এগুলোর পিছনে কতজনের শ্রম ঘাাম সহযোগীতা রয়েছে? আমি একা কিছুই করার উপায় বা ক্ষমতা রাখি না। যে কলমটি ব্যবহার করে চলছি তা একটি বিশাল কারখানায় তৈরী হয়েছে, যে কালি দিয়ে লিখে যাচ্ছি তাও বিশেষভাবে প্রস্তুত হয়েছে। কাগজ তৈরীর কারখানা আবার আলাদা এবং এর জন্য কাঁচামাল সংগ্রহ করা হয়েছে গোটা দেশ থেকে। এমনি করে আপনাকে অন্তরীক্ষ থেকে যারা সেবা দান করে চলছে তাদের কাছে রয়েছে আপনার অফেরতযোগ্য ঋণ, যা কোনোদিন শোধ করা সম্ভব হবার নয়।
এবার আসুন, দেশের বিষয়ে আলোকপাত করা যাক। ভূখন্ড সৃষ্টি হয়েছে প্রাকৃতিকভাবে, আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর আওতাভুক্ত জমি ক্রমেই বেড়ে চলছে; তা বোধ হয় আপনাদের জানা রয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশের ভূখন্ডটি পূর্বে কার হাতে কব্জাগত ছিল সে ইতিহাস আপনার জানা দরকার এবং তা আপনার নিজের প্রয়োজনে। জমি–জমা চাষ করার জন্য বাংলার বুকে রয়েছে বিস্তীর্ণ জমি, কেবল চাষ করা জানলেই চাষ করা সম্ভব হবে না, আপনাকে জানতেও হবে আপনার নিজস্ব চৌহদ্দি। আইনানুগভাবে আপনি আছেন সীমাবদ্ধ। অবশ্য এ হিসেব হলো বর্তমানের কাজ কর্মের জন্য। আমরা দেশটাকে অবমুক্ত করেছি পাকিস্তানী হানাদারদের পাষবিক বলয় থেকে, যার জন্য আমাদের দিতে হয়েছে চরম মূল্য বিগত ১৯৭১ সনে। যদিও আমরা বৃটিশ বেণিয়াদের কব্জা থেকে অবমুক্ত হয়েছিলাম বিগত ১৯৪৭ সনে, তথাপি উক্ত স্বাধীনতা আমাদের জন্য রাহুমুক্ত ছিল না। স্বাধীনভাবে পথ চলা, কথা বলা, জীবন–জীবিকার বন্দোবস্ত করা ছিল পাকি হানাদার বাহীনির নিয়ন্ত্রনে। আমাদের মুখের ভাষা পর্যন্ত কেড়ে নেয়ার ষড়যন্ত্র করেছিল তারা। সেক্ষেত্রে আন্দোলন প্রতিবাদ করে ভাষার অধিকার ক্রয় করতে হয়েছে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে। আমরা কি ভুলে যাব উক্ত আন্দোলনের ইতিহাস? ফলকারী বৃক্ষের মুল শিকড় কি আমরা কেটে ফেলব বর্তমান প্রাচুর্যে মাতোয়ারা হয়ে? আমরা কি ভুলে যাব, নুন আনতে পান্তা ফুরিয় এমন একটি অবস্থান থেকে বর্তমানে আমাদের এই উন্নতি। তেমন অবস্থা থেকে আজকের অবস্থানে উন্নয়নের পিছনে যে শ্রম ঘাম ঝরাতে হয়েছে তার হিসেব কোন খাতায় তোলা আছে?
পুনরায় আসুন, আদম সৃষ্টির ইতিহাস নিয়ে পর্যালোচনা করি। তা অবশ্য মানব জাতির সৃষ্টির ইতিহাস কিতাবুল মোকাদ্দসে সবিশেষ বর্ণনা দেখতে পাবেন। গাছের ডগায় চরতে হলে আপনাকে এর গোড়ায় আসতে হবে। তর্কচ্ছলে হয়তো বলবেন, মই দিয়ে মাথায় উঠে যাব, আসলে তেমন চিন্তা ফালতু চিন্তা বটে। কোনোক্রমেই ভিত্তিমূল অস্বীকার করা উচিৎ হবে না। হিংসা বিদ্বেষহেতু গোড়া ক্ষতিগ্রস্থ করা হলে নিজের পায়ে কুঠারাঘাত করার তুল্য হবে।
পরমকরুনাময় মাবুদ মাত্র একজন মানুষ সৃষ্টি করেছেন তাঁর স্বীয় প্রতিবিম্বে। উদ্দেশ্য, অদৃশ্য মাবুদের বহিপ্রকাশ ঘটানো। যেমন প্রেম প্রকাশ করার জন্য পাত্র–পাত্রীকে সদ্য প্রষ্ফুটিত একটি গোলাপ তুলে দিল। একইভাবে মানুষের সার্বিক গুণাবলি প্রকাশ করার জন্য দৃশ্যমান বস্তুর ব্যবহার আবশ্যক হয়। খোদার ঐশি গুনাবলি প্রকাশ পেয়েছে সৃষ্ট বস্তুজগতের মাধ্যমে। তৃষ্ণা মেটাতে সুপেয় জল, ক্ষুধা মেটাতে অন্ন, শরীর ঢাকতে বস্ত্র এমনি করে প্রাকৃতিক বস্তুজগতের মাধ্যমে আমরা তার পরিচয় জানতে পারি।
তিনি আদম সৃষ্টি করে তাদের সর্বপ্রথম যে আজ্ঞা দিলেন, রয়েছে কি তা আপনার জানা? সে আজ্ঞাটি হলো প্রজাবন্ত হওয়া এবং গোটা বিশ্ব ভরে তোলা। তিনি অবশ্য সাবধান করে দিয়েছেন আমাদের চিরন্তন শত্রুর বিষয়ে, যে কিনা বদ্ধপরিকর মানুষের সর্বনাশ করার এবং মানব জাতিকে নিয়ে খোদার সুমহান সুদূর প্রশারী চিরস্থায়ী পরিকল্পনা বানচাল করে দেবার। উক্ত দুষমণ যেমন খোদাদ্রোহী তেমনই মানুষের মধ্য থেকে সহমর্মীতা বিনাশ করে পারষ্পরিক বিবদামন দলে পরিণত করে রেখেছে। অবশ্য মানুষের পতন শুরু হয়েছে খোদার উপর সন্দেহের কারণে, আদম খোদার চাইতে শয়তানের মনোহারী প্রস্তাবে প্রলুব্ধ হয়ে পড়লো। হারিয়ে পেললো ঐশি গুণাবলি। তাদের প্রথম জোড়া পুত্রদের মধ্যে কাবিল হাবিলকে কতল করে পাপের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো, যা হলো মানবেতিহাসে নরঘাতি যুদ্ধের প্রথম দৃষ্টান্ত বা গোড়া পত্তন।
এবার আমরা বুঝতে পারলাম, আদম বংশ খোদাদ্রোহী কাজে ডুবে গেল, অধিকন্তু তারা ভ্রাতার রক্তে নিজেদের হাত করে নিল রঞ্জিত। তাই কবির ক্ষেদোক্তি এভাবে প্রকাশ পেয়েছে; ‘যার হস্ত ভ্রাতার রক্তে হয়েছে রঞ্জিত, বলুন কি করে রাখি তাকে শ্রদ্ধা ভক্তি চিতে সঞ্চিত’। না, সম্ভব নয়, একটা নরঘাতি ব্যক্তিকে শ্রদ্ধাভক্তি করা। আমরা ইতিহাস ভুলে যাই অতি সহজে, আবার সত্যিকারের ইতিহাস জানাও থাকে না, ক্ষেত্র বিশেষে প্রকাশ করাও সম্ভব হয়ে ওঠে না। কোনো অত্যাচারী রাজার জীবদ্দসায় তার দুষ্কর্মের ইতিহাস লেখা সম্ভব হলেও জনসম্মুখে প্রকাশ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই তাদের কুকীর্তির বর্ণনা রাজ–রাজাদের অবর্তমানে জানতে পারি। ততক্ষণে কেল্লামাত হয়ে যায়।
ইতিহাসে একজন জেন্দাপীরের বর্ণনা রয়েছে, অবশ্য মোঘল যুগে যে কিনা তার ভাইদের কতল করে গদি নিষ্কন্টক করেছিল। তা যে কোনো শাহেনশার কথাই বলুন না কেন, যে যদি পিতা মাতার ঔরষজাত হয়ে থাকে তবে সে অবশ্যই কলঙ্কিত হয়ে আছে পাপাচারে। কেবল মানুষ খুন করাই একমাত্র পাপ নয়, কোনো মানুষকে বকাঝকা করা, তাদের সামান্য হলেও ক্ষতি সাধন করা পাপাচারের সমতুল্য। বিশ্বের যাবতীয় যোদ্ধাদের ইতিহাস জানতে চেষ্টা করুন, আপনার ভ্রান্তি ও অন্ধমোহ অবশ্যই কেটে যাবে।
মানুষ মাত্র একটি জাতি। স্থান–কাল–পাত্র ভেদে, তথা রুজি–রুটি পেশাভিত্তিক কাজের জন্য একজন থেকে আর একজন আলাদা হতে বাধ্য, তবে উভয়ই মানুষ, ভিন্ন কোনো জাত নয়। মানুষে মানুষে ভাষাভেদ হয়েছে ব্যবিলন টাওয়ার গড়তে গিয়ে, মানুষের মধ্যে সৃষ্ট অহংকার মানুষের পতন বয়ে আনে। তাই বলে ভাষাভেদের ফলে বস্তুজগতের কোনো পরিবর্তন হয় নি। যেমন জলের আর এক নাম জীবন। তৃষ্ণার্ত ব্যক্তি জলের যে নামই বলুক না কেন তাতে কিছু এসে যায় না, উক্ত দ্রব্য পান করার সাথে সাথে তার তৃষ্ণা মিটে যাবে।
সৃষ্টির ইতিহাস থেকে আমরা সহজেই বুঝতে পারি, আমরা গোটা বিশ্ববাসি একই আদমের ঔরষজাত সন্তান, তবে ছড়িয়ে পড়েছি বিশ্বজুড়ে, অবশ্য খোদার পরিকল্পনা হলো বিশ্ব আবাদ করা। মানব জাতিতে ভরে তোলা। যারা মাবুদের গুণকীর্তনে থাকবে সদা মুখরীত। মানুষ মানুষের জন্য, মানুষের কল্যাণ বয়ে আনার জন্য থাকবে সদা প্রস্তুত, খোদার মুল পরিকল্পনা হলো তা–ই। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, তাদের যাত্রারম্ভে অভিশপ্ত ইবলিসের ধোকায় পরে, খোদার উপর একচ্ছত্র তথা শতভাগ বিশ্বাস ও নির্ভরতা হারিয়ে বসেছে; ফলে মানব জাতি খোদার প্রতিনিধিত্ব না করে অভিশপ্ত ইবলিসের তাবেদারি করে চলছে। অপরাধ অপরাধের জন্ম দেয়। চাই মানুষের সমাজে খোদার প্রত্যক্ষ আবির্ভাব; মানুষের কৃত পাপের কাফফারা বা প্রায়শ্চিত্ত পরিশোধ দেবার মত মানুষের নিজেদের হাতে কোনো পুণ্যের বালাই নেই। খোদার রহমত ব্যতিত আজ আমরা সকলে নিরুপায়। মেহেরবান মাবুদ প্রেমের আতিসহ্যে স্বীয় কালাম ও রূহ মানবরূপে জগতে পাঠিয়েছেন, তিনি হলেন ঈসা রূহুল্লাহ বা ঈসা কালেমাতুল্লা, তিনি কোরবানির মেষ হিসেবে গোটা বিশ্বের পাপের কাফফারা শোধ দেবার জন্য কোরবানি হলেন। বেগুনাহ মসীহ গুনাহগার ব্যক্তিদের জন্য হলেন কোরবানী, যারাই বিশ্বাসহেতু উক্ত কোরবানি নিজেদের কোরবানি হিসেবে কবুল করলেন তারাই হতে পারলেন মুক্তপাপ। খোদার কাছে গ্রহণযোগ্য হলো অনুতপ্ত ভগ্নচূর্ণ হৃদয়, আর তাদের পাপের প্রায়শ্চিত্ত পরিশোধ দেয়া হলো বেগুনাহ মসীহের জীবন দিয়ে।
মসীহ ধরাপৃষ্ঠে আবির্ভূত হয়েছেন গুনাহগার ব্যক্তিদের গুনাহমুক্ত করার জন্য। চোখ থেকে ছানি কেটে দিলে ব্যক্তি যেমন পুনরায় পরিষ্কার দেখতে পায়, তেমনই মানুষের কলুষিত হৃদয়ের পরিবর্তন করে দিলে পুনরায় সে ন্যায়, সত্য, সুন্দরের পথে স্বাচ্ছন্দে চলতে শুরু করে। মানুষের হৃদয়ের পরিবর্তন করে তার চরিত্রের পরিবর্তন তথা ধ্যান–ধারণার পরিবর্তন। মসীহের মধ্য দিয়ে আমরা হতে পারি নতুন সৃষ্টি তথা খোদার সন্তান। “প্রথমেই কালাম ছিলেন, কালাম আল্লাহর সংগে ছিলেন এবং কালাম নিজেই আল্লাহ ছিলেন। আর প্রথমেই তিনি আল্লাহর সংগে ছিলেন। সব কিছুই সেই কালামের দ্বারা সৃষ্ট হয়েছিল, আর যা কিছু সৃষ্ট হয়েছিল সেগুলোর মধ্যে কোন কিছুই তাঁকে ছাড়া সৃষ্ট হয় নি। তাঁর মধ্যে জীবন ছিল এবং সেই জীবনই ছিল মানুষের নূর। সেই নূর অন্ধকারের মধ্যে জ্বলছে কিন্তু অন্ধকার নূরকে জয় করতে পারে নি। আল্লাহ ইয়াহিয়া নামে একজন লোককে পাঠিয়েছিলেন। তিনি নূরের বিষয়ে সাক্ষী হিসাবে সাক্ষ্য দিতে এসেছিরেন যেন সকলে তাঁর সাক্ষ্য শুনে ঈমান আনতে পারে। তিনি নিজে সেই নূর ছিলেন না কিন্তু সেই নূরের বিষয়ে সাক্ষ্য দিতে এসেছিলেন। সেই আসল নূর, যিনি প্রত্যেক মানুষকে নূর দান করেন, তিনি দুনিয়াতে আসছিলেন। তিনি দুনিয়াতেই ছিলেন এবং দুনিয়া তাঁরা দ্বারা সৃষ্ট হয়েছিল, তবু দুনিয়ার মানুষ তাঁকে চিনল না। তিনি নিজের দেশে আসলেন, কিন্তু তাঁর নিজের লোকেরাই তাঁকে গ্রহণ করল না। তবে যতজন তাঁর উপর ঈমান এনে তাঁকে গ্রহণ করল তাদের প্রত্যেককে তিনি আল্লাহর সন্তান হবার অধিকার দিলেন” (ইউহোন্না ১ : ১–১২)