লেখক: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক।
এ বছরের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের দাবির মুখে তাদের অনুষ্ঠিত না হওয়া বাকি পরীক্ষাগুলো সরকার বাতিল করেছে। পরীক্ষা আর না নেওয়ার দাবিতে কয়েক দিন ধরেই শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছিল। পরীক্ষা বাতিলের সরকারি সিদ্ধান্তে এককথায় বলতে পারি, আমার প্রতিক্রিয়া মিশ্র।
পরীক্ষা বাতিলই কি সর্বোত্তম বিকল্প? আর কি কোনো পথ খোলা ছিল না? আমি আমাদের পরীক্ষার্থী, যারা এবার এইচএসসি দিচ্ছিল, তাদের আগামীর পথচলা নিয়ে চিন্তিত। তাদের শিখন ঘাটতি পূরণ কীভাবে হবে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়ে তারা যে অপরিসীম আত্মত্যাগ করেছে, তা নজিরবিহীন। তারা জীবন দিয়েছে, রক্ত দিয়েছে, আহত হয়েছে, পঙ্গুত্ববরণ করেছে। শারীরিক, মানসিক ক্ষতির পাশাপাশি তাদের আরও যে বড় ক্ষতি হয়েছে, তা হলো তাদের শিক্ষার ক্ষতি হয়েছে। শিখন ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে।
আমাদের শিক্ষার্থীরা অনেকে ট্রমার মধ্যে ছিল। গণঅভ্যুত্থান ও এর পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ একটা সময় তারা পরীক্ষা নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এখন সরকার থেকে একটা সিদ্ধান্ত পাওয়া গেল।
বিষয়টি নিয়ে আমি অনেক অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলেছি। আমি দেখেছি, অভিভাবকরা পরীক্ষা না নেওয়ার সিদ্ধান্তে খুশি নন। বেশির ভাগ অভিভাবক মনে করেন, পরীক্ষা নেওয়া হলেই বেশি ভালো হতো। সে ক্ষেত্রে আরও বেশি সময় দিয়ে ধীরেসুস্থে পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যেতে পারত। তারা মনে করেন, তাদের সন্তানদের কাঁধে অটো পাসের অপবাদ এসে পড়ুক, সেটি তারা চান না।
পড়াশোনা করতে না পারা, পরীক্ষা না দেওয়ার কারণে এ শিক্ষার্থীদের যে শিখন ঘাটতি তৈরি হবে, তা কীভাবে পূরণ করা হবে– এটিই আমার মনে বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে বিজ্ঞানের বিষয়গুলোর শিখন ঘাটতি নিয়ে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা কীভাবে আগামীর দিনগুলো পাড়ি দেবে? ব্যবহারিক পরীক্ষাগুলোরই বা কী হবে?
কেবল এইচএসসির বাকি পরীক্ষাগুলো না দেওয়াই শেষ কথা নয়। আমাদের এই শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু ভর্তি পরীক্ষা নেবেই। সেখানে তাদের এই অর্ধেক প্রস্তুতি নিয়ে তারা কতটা সামাল দিতে পারবে, আমি শঙ্কিত। তারা যদি সফল হয়, তবে তো খুবই ভালো। নতুন প্রজন্ম অনেক কিছুই পারে। আমি শুধু চাই, তারা যেন ভবিষ্যৎ জীবনে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
পরীক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখের মতো, আন্দোলনে তাদের মধ্যে কতজন আহত হয়েছে? আহত সবাই কি এ বছরের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিল? পরীক্ষা বাতিল ছাড়া আর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া যেত কিনা ভাবার ছিল। শিক্ষার্থীদের শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া ও তাদের আগামীর পথচলা কীভাবে মসৃণ হবে, সেটি নিশ্চিত হওয়া গেলে ভালো হতো।