বিধান বা ব্যবস্থাপত্র যিনি প্রস্তুত করেন তাকে অবশ্যই জ্ঞানি বলে মেনে নিতে হয়, আর যাদের জন্য উক্ত ব্যবস্থাপত্র প্রদান করা হয়ে থাকে তারা সাধারণত প্রাসঙ্গিক বিষয়ে থাকে অনভিজ্ঞ। রোগের ক্ষেত্রে বিজ্ঞ চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র লিখে দেয়, রোগী যেন উক্ত নিয়মানুযায়ী সেবন ও পানাহার করে সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে পারে।
ধর্মীয় বিধানাবলী অবশ্যই আসতে হবে প্রকৃত ধার্মিক ব্যক্তির তরফ থেকে। একজন পতীত গুনাহগার তার সহযাত্রী আর এক গুনাহগারকে পারে না হেদায়েত করতে। তেমন প্রচেষ্টা হবে কেবল হাস্যোদ্দীপক। নেশাগ্রস্থ ব্যক্তি নিজেকে নেশামুক্ত না করা পর্যন্ত অন্যকে কেমন করে ক্ষতিকারক নেশা থেকে অবমুক্ত করার ফলপ্রসূ পরামর্শ দিবে?
আজ আমাদের যথাযথ সময় এসেছে বিশ^ব্রহ্মান্ডের দিকে নজর দেয়া ও শিক্ষা গ্রহণ করার। ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়, গুনাহগার ব্যক্তিরা হামলে পড়েছে একক বেগুনাহ ব্যক্তির উপর; তাকে নিশ্চিহ্ন না করা পর্যন্ত ক্ষান্ত হয় নি। বলছি, মানব সমাজে আবির্ভূত ঐশি মানব খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসীহের বিষয়। তাকে নিষ্ঠুর সলীবে টাঙ্গিয়ে হত্যা করে স্বস্তির নিঃশ^াস নিল। দুর্বৃত্তরা এতটাই অন্ধ, ওরা বুঝতেই পারলোনা, কেবল মাটির দেহটাই সবকিছু নয়। আমি বলব, মাটির দেহ কোনো অর্থই বহন করে না; মাটির দেহে যতক্ষণ পর্যন্ত প্রাণের সঞ্চারণ না থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত থাকে তা জড় পদার্থমাত্র। যদিও মসীহকে হত্যা করলো দুষ্কৃতিকারীরা, কিন্তু মসীহ যে মাটির দেহে খোদার রূহ বিরাজমান ছিলেন, তাকে অর্থাৎ পাকরূহেক নিষ্কৃয় করার ক্ষমতা পার্থীব মানুষের কারো হাতে নেই। মাটির দেহের কোনো ক্ষতি হোক, সে বিষয়ে আমাদের অনাহুত উদ্বীগ্ন থাকার কোনো কারণ নেই। কালামের শিক্ষা রয়েছে আমরা যেন আমাদের সকল ভাবনা চিন্তার ভার মাবুদের উপর সমর্পণ করি, কেননা, সদাসর্বদা তিনি রয়েছেন আমাদের প্রতি নেগাবান “তোমাদের সব চিন্তা–ভাবনার ভার তাঁর উপর ফেলে দাও, কারণ তিনি তোমাদের বিষয়ে চিন্তা করেন” (১পিতর ৫ : ৭)।
খোদা হলেন রূহ ও সত্য; তাই যারাই তাঁর এবাদত করবে অবশ্যই তাদের সত্যে ও রূহানী পর্যায়ে তাদের সে ভজনা করতে হবে। এক্ষেত্রে অঙ্গভঙ্গি বা অঙ্গবিন্যাসের কোনো প্রয়োজন পড়ে না। পার্থীব কোনো বস্তুর বিনিময়ে খোদাকে তৃপ্ত করা সম্ভব নয়।
সুতরাং, সর্বপ্রকার ঐশি বিধানাবলী আসতে হবে খোদ মাবুদের কাছ থেকে। খোদার কালামে কোনো জোড়াতালি দেয়া চলবে না “যে লোক এই কিতাবের সমস্ত কথা, অর্থাৎ আল্লাহর কালাম শোনে আমি তার কাছে এই সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, কেউ যদি এর সংগে কিছু যোগ করে তবে আল্লাহও এই কিতাবে লেখা সমস্ত গজব তার জীবনে যোগ করবেন। আর এই কিতাবের সমস্ত কথা, অর্থাৎ আল্লাহর কালাম থেকে যদি কেউ কিছু বাদ দেয় তবে আল্লাহও এই কিতাবে লেখা জীবন–গাছ ও পবিত্র শহরের অধিকার তার জীবন থেকে বাদ দেবেন” (প্রকাশিত কালাম ২২ : ১৮–১৯)।
খোদা হলেন মেহেরবান, তিনি জগতকে এক চুড়ান্ত মূল্যে প্রেম করেছেন। অনুতপ্ত ব্যক্তি যখনই খোদার কাছ থেকে মাগফেরাত কামনা করে খোদা সাথে সাথে তাকে ক্ষমা করেন, ব্যক্তির অতীতের ক্রীত সর্বপ্রকার পাপ অভিশাপ চিরদিনের জন্য মুছে ফেলেন ও ভুলে যান। যেমন কালামপাকে রয়েছে মাবুদ নিজের কারণে আমাদের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেন। “আমি, আমিই আমার নিজের জন্য তোমার অন্যায় মুছে ফেলি; আমি তোমার গুনাহ্ আর মনে আনব না” (ইশাইয়া ৪৩ : ২৫), “দুষ্ট লোক তার পথ ত্যাগ করুক আর খারাপ লোক তার সব চিন্তা ত্যাগ করুক। সে মাবুদের দিকে ফিরুক, তাতে তিনি তার উপর মমতা করবেন; আমাদের আল্লাহর দিকে ফিরুক, কারণ তিনি সম্পূর্ণভাবেই মাফ করবেন” (ইশাইয়া ৫৫ : ৭)।
রাহমানুর রাহেমিন মাবুদের নামে যারা মানুষ কতল করে এবং তেমন অনুমোদন দেয়, আসলে তারা সকলেই হলো খোদাদ্রোহী ইবলিসের তাবেদার, যা আমরা দেখতে পাই প্রথম ভ্রাতৃঘাতি যুদ্ধের মাধ্যমে। যে লোক নিজে মানুষ খুন করেছে এবং তার হস্তকৃত গ্রন্থে তেমন আজ্ঞা রয়েছে লিপিবদ্ধ, তা অবশ্যই বিরচিত হয়েছে অভিশপ্ত ইবলিসের অনুপ্রেরণায়। খোদা মেহেরবান, প্রেমের আঁধার, ক্ষমাশীল, স্বীয় সৃষ্টি অদ্যাধিক মহব্বত করেন।
পাককালাম থেকে কয়েকটি আয়াত তুলে দিচ্ছি যা নিয়ে ধ্যান করা হলে হৃদয়ে প্রশান্তি জাগবে।
“সেজন্য আমি তাদের অন্যায় মাফ করব, তাদের গুনাহ আর কখনও মনে রাখব না।” (ইব্রানী ৮ : ১২), “মাবুদ আরও বলছেন, “এখন এস, আমরা বোঝাপড়া করি। যদিও তোমাদের সব গুনাহ্ টক্টকে লাল হয়েছে তবুও তা বরফের মত সাদা হবে; যদিও সেগুলো গাঢ় লাল রংয়ের হয়েছে তবুও তা ভেড়ার লোমের মত সাদা হবে” (ইশাইয়া ১ : ১৮), “আমি আমার ও আমার গোলাম দাউদের জন্য এই শহরটা ঘিরে রেখে তা রক্ষা করব ” (ইশাইয়া ৩৭ : ৩৫), “অবশ্য আমার ভালোর জন্যই আমি এই ভীষণ যন্ত্রণা ভোগ করেছি, কিন্তু ধ্বংসের গর্ত থেকে তোমার মহব্বতে তুমি আমাকে উদ্ধার করেছ। আমার সব গুনাহ্ তুমি পিছনে ফেলে দিয়েছ” (ইশাইয়া ৩৮ : ১৭), “মেঘের মত করে তোমার সব অন্যায় আর সকাল বেলার কুয়াশার মত করে তোমার সব গুনাহ্ আমি দূর করে দিয়েছি। তুমি আমার কাছে ফিরে এস, কারণ আমিই তোমাকে মুক্ত করেছি” (ইশাইয়া ৪৪ : ২২), “সেই সময়ে ইসরাইলের অন্যায়ের খোঁজ নেওয়া হবে কিন্তু একটাও থাকবে না, এহুদার গুনাহের খোঁজ করা হবে কিন্তু একটাও পাওয়া যাবে না, কারণ আমি যাদের বাঁচিয়ে রাখব তাদের আমি মাফ করব” (ইয়ারমিয়া ৫০ : ২০), “তোমার মত আল্লাহ আর কেউ নেই যিনি তাঁর বেঁচে থাকা লোকদের গুনাহ ও অন্যায় মাফ করে দেন। তুমি চিরকাল রাগ পুষে রাখ না বরং তোমার অটল মহব্বত দেখাতে আনন্দ পাও। তুমি আবার আমাদের উপর মমতা করবে; তুমি আমাদের সব গুনাহ পায়ের তলায় মাড়াবে এবং আমাদের সব অন্যায় সাগরের গভীর পানিতে ফেলে দেবে। (মীখা ৭ : ১৮–১৯)।
খোদা হলেন মেহেরবান, চিরকালের জন্যই মেহেরবান! তাঁর দয়া ও রহমত অনন্তকালস্থায়ী। যদিও মানুষ গুনাহগার, তা সত্যেও তারা যখন স্বীয় পাপের জন্য অনুতপ্ত হয়ে খোদার কাছে মাগফেরাত কামনা করে, অমনি তিনি তাদের ক্ষমা করেন। কালামপাকে তাই যথার্থ বর্ণীত রয়েছ, “আল্লাহর রহমতে ঈমানের মধ্য দিয়ে তোমরা নাজাত পেয়েছ। এটা তোমাদের নিজেদের দ্বারা হয় নি, তা আল্লাহরই দান। এটা কাজের ফল হিসাবে দেওয়া হয় নি, যেন কেউ গর্ব করতে না পারে। আমরা আল্লাহর হাতের তৈরী। আল্লাহ মসীহ ঈসার সংগে যুক্ত করে আমাদের নতুন করে সৃষ্টি করেছেন যাতে আমরা সৎ কাজ করি। এই সৎ কাজ তিনি আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন, যেন আমরা তা করে জীবন কাটাই” (ইফিষীয় ২ : ৮–১০)।
ঐশি বিধান হলো প্রেম ও ক্ষমা। আমাদের প্রতি খোদার চুড়ান্ত প্রেম প্রকাশ পেয়েছে রূহানি মানুষ খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসীহের মাধ্যমে। তিনি আমাদের ক্রীত পাপের কাফফারা পরিশোধ করেছেন আপন পূতপবিত্র রক্তের মূল্যে। তিনি হলেন আমাদের জন্য খোদার হুবহু প্রকাশ। তিনিই হলেন গুনাহগারদের জন্য একমাত্র পথ, সত্য ও জীবন। “প্রথমেই কালাম ছিলেন, কালাম আল্লাহর সংগে ছিলেন এবং কালাম নিজেই আল্লাহ ছিলেন। আর প্রথমেই তিনি আল্লাহর সংগে ছিলেন। সব কিছুই সেই কালামের দ্বারা সৃষ্ট হয়েছিল, আর যা কিছু সৃষ্ট হয়েছিল সেগুলোর মধ্যে কোন কিছুই তাঁকে ছাড়া সৃষ্ট হয় নি। তাঁর মধ্যে জীবন ছিল এবং সেই জীবনই ছিল মানুষের নূর” (ইউহোন্না ১ : ১–৪), তবে যতজন তাঁর উপর ঈমান এনে তাঁকে গ্রহণ করল তাদের প্রত্যেককে তিনি আল্লাহর সন্তান হবার অধিকার দিলেন” (ইউহোন্না ১ : ১২)। “যদি কেউ মসিহের সংগে যুক্ত হয়ে থাকে তবে সে নতুনভাবে সৃষ্ট হল। তার পুরানো সব কিছু মুছে গিয়ে নতুন হয়ে উঠেছে। এই সব আল্লাহ থেকেই হয়। তিনি মসীহের মধ্য দিয়ে তাঁর নিজের সংগে আমাদের মিলিত করেছেন, আর তাঁর সংগে অন্যদের মিলন করিয়ে দেবার দায়িত্ব আমাদের উপর দিয়েছেন। এর অর্থ হল, আল্লাহ মানুষের গুনাহ না ধরে মসীহের মধ্য দিয়ে নিজের সংগে মানুষকে মিলিত করছিলেন, আর সেই মিলনের খবর জানাবার ভার তিনি আমাদের উপর দিয়েছেন। সেজন্যই আমরা মসিহের দূত হিসাবে তাঁর হয়ে কথা বলছি। আসলে আল্লাহ যেন নিজেই আমাদের মধ্য দিয়ে লোকদের কাছে অনুরোধ করছেন। তাই মসিহের হয়ে আমরা এই মিনতি করছি, “তোমরা আল্লাহর সংগে মিলিত হও।” ঈসা মসিহের মধ্যে কোন গুনাহ ছিল না; কিন্তু আল্লাহ আমাদের গুনাহ তাঁর উপর তুলে দিয়ে তাঁকেই গুনাহের জায়গায় দাঁড় করালেন, যেন মসিহের সংগে যুক্ত থাকবার দরুন আল্লাহর পবিত্রতা আমাদের পবিত্রতা হয়” (দ্বিতীয় করিন্থীয় ৫ : ১৭–২১)।