আজ আশুরা, মহররম মাসের ১০তারিখ হিজরী বা যে বৎসর ইসলামের নবী মক্কা থেকে মদিনা হিযরত করেছিলেন, সেই দিনটিকে কেন্দ্রে রেখে যে বৎসরগণনা শুরু হয়ে হয়েছে, উক্ত বৎসরকে হিজরী বৎসর বলে গণনা শুরু হয়েছে।
মানুষ যুগকলাপ পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে না; তবে তারা যা কিছু করে চলছে তা হলো, অখন্ডকাল খন্ড খন্ড করে সাধারণ মানুষের কাছে উপস্থাপন করা। বলতে পারেন কিছুটা হাত ছাপাইয়ের প্রক্রিয়ার অবতারণা।
আপনাদের হয়ত জানা রয়েছে, অনন্ত অসীম প্রেমময় অদৃশ্য খোদা স্বীয় সুরতে মানুষ সৃষ্টি করার চিন্তা করলেন, সিদ্ধান্ত নিলেন,বাস্তবায়ন করলেন, স্বীয় সুরতে মানুষ নির্মাণ করলেন যেন তারা হতে পারে অদৃশ্য খোদার দৃশ্যমান প্রতিভু।
কেউ কি উক্ত দিনটিকে কষ্মিনকালেও উৎযাপন করেছে? বিশ্বব্যাপী সকলেই বাধ্য তেমন একটি দিন জাঁকালোভাবে পালন করায়। গোটা বিশ্বের জন্মদিন!
বলছিলাম, আজ আশুরার মাতম প্রকাশ করে ফিরছে একটি সম্প্রদায়, যেমন ঈদে মিলাদুন্নবী, বড়দিন, রথযাত্রা, ঈদুল ফেসাখ এমনিতর শত শত দিন উদযাপন করে ফিরছে গোটা বিশ্ববাসি। এর তাৎপর্য, আমাদের সম্যক বুঝে নেয়া উচিৎ।
শত শত বৎসর পূর্বে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা স্মরণ করার যথার্থ কারণ আছে বলে আমি মনে করি। নতুবা মানুষ ইতিহাস ভুলে যাবে যে, তবে তেমন ঘটনাগুলো, বর্তমান প্রেক্ষাপটে, একটি বাস্তবমুখী প্রভাব ফেলবে বলেই অতীতের তেমন শোকদিবস তথা আনন্দের মুহুর্তগুলো ঘটাকরে উৎযাপন করে থাকে।
মনে করুন, কোনো লোক সুন্দরবনে ভ্রমন করতে গিয়ে বাঘের আক্রমনে মারা গেল। আপনি তেমন ঘটনাটি নাটকের মঞ্চে উপস্থাপন করলেন, বাস হয়ে গেল, বাঘের আক্রমনে মানুষের মৃত্যুর নাটক মঞ্চায়ন!
ভ্রাত: নাটক আর বাস্তব ঘটনা থাকে যোজন যোজন দূরে, বাস্তবতা আর নাটক কখনোই এক হতে পারে না অথবা দুটোকে গুলিয়ে একাকার করা চলবে না।
ইয়াজিদের হাতে হাসান হোসেন নৃশংশভাবে হত হয়েছে, তেমন ঘটনার নাটক আজ পর্যন্ত শোক মাতমের মাধ্যমে জনতার দৃষ্টি কেড়ে চলছে; বেশ ভালো কথা। প্রশ্ন রাখি তখনকার ইয়াজিদ কি বর্তমান সমাজে বিরাজ করছে না? যদি তা না হতো, সমাজের সকল লোক যদি সাধুসন্তে পরিণত হতে পারতো, তবে উক্ত ঘটনাগুলোর অবতারণা করে জনগণকে হুশিয়ার সাবধান করে দেবার প্রয়োজন পড়তো না।
অতীতের ঘটে যাওয়া প্রত্যেকটি ঘটনা, সাক্ষি দেয়, ন্যায় অন্যায়ের মধ্যে বিরোধ। যা দুটি মেরুর মত স্বস্বস্থানে অনড় অবস্থায় রয়েছে দাঁড়িয়ে। যেমন হিমালয় পর্বতের সুউচ্চ শৃঙ্গগুলো, যুগ যুগ ধরে স্বগর্বে ঘোষণা দিয়ে ফিরছে নিজেদের অস্তিত্বের কথা। আপনার মনে হয়, ওগুলো কখনো মিলে মিশে এক হয়ে যাবে? তবে আমরা অনেকেই বিশ্বাস করি, ইস্রাফিলের শিঙ্গা ফুকে দেবার সাথে সাথে সবকিছু চুরমার একাকার হয়ে মিলেমিশে হয়তোবা একটি মন্ডে পরিণত হবে, আর একই বংশে জাত সকল মানুষ একই প্লাটফর্মে অর্থাৎ মসিহের সুশীতল ছায়াতলে শান্তির নীড়ে মিলেমিশে একাকার হবার সুযোগ পাবে।
মানুষের ক্ষেত্রে কথাটা সম প্রযোজ্য। সকল মানুষ উৎপন্ন হয়েছে মাত্র একজন মানুষের মাধ্যমে; সেই সুবাদে মানুষের মধ্যে ঐক্য স্থাপন কোনো আকাশ-কুশুম কল্পনা বলে মনে করি না। যদিও মানুষ প্রথমেই খোদার অবাধ্য হলো, পদাঙ্ক অনুসরণ করলো কুলাঙ্গার ইবলিসের, যার নতিজা, মানুষ হয়েও মানুষের চরম সর্বনাশ করে ফিরছে সেই যাত্রারম্ভ থেকে, কাবিল স্বীয় ভ্রাতা হাবিলকে নৃশংশভাবে খুন করে বসলো। খুনের কৃষ্টি চালু হয়ে গেল মানব সভ্যতায়। যেমন ‘মুক্তি দিবস’ আর ‘স্বাধীনতা দিবস’ শাব্দিক অর্থে এক হলেও খুঁজে দেখা হলে মৌল ঘটনা কিছুটা ভিন্নতর নজরে পড়বে। ইসরায়িল জাতি মিশরে ফেরাউনের কবলে নির্যাতিত নিষ্পেশিত হচ্ছিল বছরের পর বছর। তাদের কান্না খোদার দরবারে পৌছালো, দয়ালু খোদা একজন ব্যক্তিকে বাছাই করলেন, যিনি ফেরাউনের কব্জা থেকে ইসরাইল জাতিকে মুক্ত করবেন। খোদার হুকুমে মনোনীত মূসা নবী ফেরাউনের কাছে তাদের মুক্তির বিষয় প্রস্তাব করলেন, জোর দাবি তুললেন। বলে রাখা ভালো মূসা নবী নিজেও ইসরাইল বংশের লোক। ফেরাউন কোনোভাবেই রাজী হলো না দাসদের মুক্তি দানের বিষয়ে। খোদা মূসা নবীর মাধ্যমে ফেরাউনকে বার বার আঘাত দিলেন, যেন মূসার প্রস্তাবে, ইসরাইল জাতিকে অবমুক্ত করার জন্য রাজী হয়। শেষতক ফেরাউন রাজী হলো ইসরাইল জাতিকে মুক্তিদানের জন্য। মূসার নেতৃত্বে ইসরাইল জাতি ফেরাউনের কয়েদ দশা থেকে হতে পারলো অবমুক্ত। এ দিনটি হলো মুক্তির দিন, খুশির দিন। হিব্রু ভাষায় বলা হয় ঈদুল ফেসাখ।
প্রশ্ন হলো, মুক্তিপ্রাপ্ত জনতা অবশ্যই মুক্তজীবন যাপন করবে, যা হলো সকলের স্বাভাবিক প্রত্যাশা। আজকে আমি গোটা বিশ্ববাসি নিয়ে আলোকপাত করতে চাই। আদমের অবাধ্যতার ফলে মানুষ হলো পতিত। পাপের কুফল হলো ভয়াভহ! পতনের দৃষ্টান্ত দেয়া চলে একটি কাঁচের পাত্র পাষাণের উপর ফেলে দেবার মাধ্যমে। যেহেতু কাঁচের দ্রব্য, তাই স্বাভাবিক কারণে, পতনের ফলে ওটা অগণিত খন্ডে টুকরো টুকরো হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য। যার ফলে কেউ আর পাত্রটিকে ব্যবহার করতে পারবে না। অধিকন্তু উক্ত পাত্রের খন্ডিতাংশগুলো পরষ্পর থেকে বিচ্ছিন্ন ও বিরুপাকৃতির অবয়বে অবস্থান করবে। মসিহ এক্ষেত্রে একটি আজ্ঞা দিয়েছেন, “তারা যেন এক হয়” তাদের পারষ্পরিক ঐক্য-মিলন-ভ্রাতৃত্ব দেখে সকলে বুঝতে পারবে, তারা আবার সঠিক আকৃতি লাভ করেছে আর তা সম্ভব হয়েছে খোদার রহমতে, খোদার হাতে। মানুষ ইবলিসের ভুল শিক্ষায় খোদার পরিকল্পনা ও শিক্ষাকলাপ তুচ্ছজ্ঞান করে চলছে। তিনি মানুষের কল্যাণ বৈ কোনো অকল্যাণ কামনা করেন না। মানুষের ক্ষতি ঘটে চলছে কেবল ইবলিসের দ্বারা। ইবলিসই ব্রত নিয়েছে মানুষের সার্বিক ক্ষতি করার জন্য।
আপনি যা কিছু করুন না কেন, তেমন কর্মের অবশ্যই একটা প্রভাব থাকবে নিজের তথা অন্যের জীবনে। কথায় আছে, পিছনের ঢেউ সম্মুখের ঢেউ সামনে ঠেলে দেয়। আদম থেকে শুরু করে অদ্যবধি আমরা সকলে নিরবধি প্রানান্তকর যুদ্ধ করে চলছি ইবলিসের বিরুদ্ধে। মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা, এই সুন্দর বিশ্বে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকা, আর অভিশপ্ত ইবলিসের ব্রত হলো মানুষের বিনাশ করা, কালামপাকে তাই পরিষ্কার বর্ণীত রয়েছে, চোর (ইবলিস) আসে চুরি, খুন ও নষ্ট করার জন্য আর আমি (মসিহ) আসিয়াছি যে তারা জীবন পায়, আর তা যেন পরিপূর্ণ হয় (ইউহোন্না ১০:১০)।
আমাদের সর্বাগ্রে মনে রাখতে হবে, আমরা যা কিছুই প্রজেক্সন উৎক্ষেপন ও প্রকাশ করি না কেন, যত প্রকার শোডাউন দেখাই, তেমন কর্মকান্ডের মৌল অর্থ যেন সর্বপ্রথমে আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তি জীবনে বাস্তবায়িত হয়, আমরা ব্যক্তি জীবনের সার্বিক কর্মকান্ড দিয়ে তার প্রতিফল দেখাতে পারি যা হবে আমাদের জন্য ফলপ্রসু প্রচার। মোমের ক্ষেত্রে নিজে জ্বলে উঠলে অন্য মোম জ্বালানো সহজ হয়।
সর্বোপরি একটি কথা পুণ:পুণ: বলতে চাই,মানুষ একই আদমের বংশধর। মানুষের থেকে মানুষকে পৃথক করা বা তাদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করা হলো খোদার চির দুষমন ও মানুষের জনমের শত্রু ইবলিসের একমাত্র আরাধ্য সাধনা। আমাদের অবশ্যই জেনে রাখা প্রয়োজন, খোদার কাজ আর ইবলিসের কাজের মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান রয়েছে, যেন আমরা নিজেদের খোদার হাতে অর্থাৎ পাকরূহের হাতে নিবেদিত রাখি। (গালাতীয় ৫:১৯-২১; ৫:২২-২৪)
আমরা অদ্যাবধি বেঁচে আছি কেবল খোদার অশেষ রহমতে। মানুষের ধার্মিকতা খোদার কাছে ন্যাকড়া সমতুল (ইশাইয়া ৬৪:৬)। মানুষ বাঁচে খোদার রহমতে (ইফিষীয় ২: ৮-১০)