নেত্রকোনা দুর্গাপুর উপজেলার আত্রাইখালী নদীর এখন অস্তিত্ব নেই। বর্ষাকালে সামান্য পানি থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে এই নদীতে থাকে না এক ফোঁটা পানি। ধীরে ধীরে এই নদী বেদখল হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে নদীটি বালু ব্যবসায়ীদের হাতে পড়েছে। বালু ব্যবসায়ীরা আত্রাইখালী নদীর উৎসমুখে বাঁধ দিয়ে বালু পরিবহণের সড়ক তৈরি করেছে। সেখানে চলছে বালুবাহী ট্রাকের বহর। নদীর বুকে বসেছে ছোট ছোট দোকান।
আত্রাইখালী নদীটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের খাতায় আত্রাখালী লেখা থাকলেও লোকজন আত্রাইখালী বলেই জানে। এটিকে কেউ কেউ সোমেশ্বরীর ঢালা বলে থাকে। বাংলাদেশের উত্তর সীমান্তের গারো পাহাড় এলাকা থেকে নেমে আসা সোমেশ্বরীর একটি শাখা নদী এটি। এই নদীর দৈর্ঘ্য ২০ কিলোমিটার বা ১২ মাইল। আর প্রস্থ হচ্ছে ৫১ মিটার। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, আত্রাখালী নদীটি সুসং দুর্গাপুর বাজারের উত্তর দিক দিয়ে সোমেশ্বরী নদী থেকে পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়েছে। নদীটি কয়েক কিলোমিটার গিয়ে আবার সোমেশ্বরীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে।
আত্রাইখালী তেমন খরসে তা না হলেও সারা বছরই এই নদীতে পানি থাকত। আর পানি থাকার কারণেই আত্রাইখালীর লোকজন দুর্গাপুর আসা– যাওয়ার জন্য নৌকা ব্যবহার করত। পরে ১৯৯১ সালে এই নদীর ওপর একটি পাকা সেতু নির্মাণ করা হয়। ফলে এই এলাকার লোকজনের যাতায়াতেও সুবিধা হয়। কিন্তু গত কয়েক বছর যাবত্ এই নদীতে পানি থাকছে না। এরপর নদী থেকে বালি আহরণের জন্য জেলা প্রশাসন কিছু এলাকা লিজ দেয়। ফলে বালু পরিবহণের জন্য লিজের মালিকরা নদী বরাবর বাঁধ দিয়ে সড়ক তৈরি করে। ফলে পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। গত সপ্তাহে এই আত্রাইখালী এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, নদীর বুক দিয়ে দিন রাত ২৪ ঘণ্টা শতশত বালিবাহী ট্রাক চলাচল করছে। আর নদীর বুকে বসেছে ছোট ছোট খাবারের দোকান। এই সমস্ত দোকানে খাওয়া দাওয়া করে ট্রাকচালক আর লেবাররা। কিন্তু আত্রাইখালী নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এলাকার পরিবেশ যেমন বিনষ্ট হয়েছে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জীববৈচিত্র্য।
এই ব্যাপারে দুর্গাপুর উপজেলার বিশিষ্ট সমাজকর্মী মোহন মিয়া বলেন, বালুর ব্যবসার কারণে এই নদীটি এখন বিলুপ্ত হতে চলেছে। শত শত মেশিন দিয়ে দিনরাত নদী থেকে বালি তোলা হচ্ছে। এই বালি পরিবহণ করছে শতশত ট্রাক। বিঘ্নিত হচ্ছে পরিবেশ। দুর্গাপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র শুভেন্দু সরকার পিন্টু বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড উদ্যোগ নিলে নদীটিকে বাঁচানো যাবে। সোমেশ্বরীর সঙ্গে পুনরায় সংযোগ করে দিলে নদীটি পুনরুজ্জীবিত হতে পারে।
নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সারওয়ার জাহান বলেন, আত্রাইখালীর উৎসমুখ বন্ধ থাকায় এই নদী দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে না। বর্ষাকালে পানির প্রবাহ থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে পানি থাকে না। তবে দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদী, আত্রাখালী নদী খনন করা এবং নদী তীরবর্তী বাঁধগুলো সংস্কারের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি টিম গত মঙ্গলবার এলাকা জরিপ করেছে। জরিপের পর প্রকল্প তৈরি করার পর নদী খননসহ অন্যান্য কার্যক্রম হাতে নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
নেত্রকোনা জেলা নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক শাহেদ পারভেজ বলেন, ‘শুধু আত্রাইখালি বা সোমেশ্বরী নয়, জেলার সব নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনা এবং নদীগুলোকে দখল মুক্ত করার জন্য ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নেত্রকোনার মগড়া নদীর অনেক এলাকা উদ্ধার করা হয়েছে। তবে দুর্গাপুরের নদী দুটি জরিপের কাজ চলছে, এরপর সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।