পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের (পিসিটি) মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর এরই মধ্যে প্রবেশ করেছে ল্যান্ডলর্ড বা জমিদারি মডেলে। ৬ ডিসেম্বর সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ের সঙ্গে পিসিটি পরিচালনার চুক্তি স্বাক্ষর হয়। চুক্তি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি অনেকটা ল্যান্ডলর্ড পদ্ধতিতে শর্তসাপেক্ষে চট্টগ্রাম বন্দরের নতুন নির্মিত এ টার্মিনাল পরিচালনা করবে। দায়িত্ব পাওয়া বিদেশি প্রতিষ্ঠানটি দুই বছরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ হ্যান্ডলিংয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বছরে প্রায় ৫ লাখ টিইইউএস (২০ ফুট সমমান) কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা যাবে এ টার্মিনালের মাধ্যমে। বন্দরসংশ্লিষ্টরা বলেন, বিশ্বের উন্নত বন্দরগুলো পরিচালিত হচ্ছে ল্যান্ডলর্ড পোর্ট মডেল অনুসরণ করে। এ পদ্ধতিতে বন্দরের জমিতে স্থাপনা তৈরি ও চ্যানেল ব্যবহার করে বেসরকারি খাত পণ্য হ্যান্ডলিং করে। বন্দর সেখান থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ হ্যান্ডলিং ও অন্য চার্জ পায়। চুক্তির সময়সীমা শেষ হলে পুরো স্থাপনা বা টার্মিনালের মালিকানা পেয়ে যায় বন্দর কর্তৃপক্ষ। এতে স্থাপনা নির্মাণে সরকারকে বড় রকমের বিনিয়োগ করতে হয় না। তুলনামূলক কম বিনিয়োগে বন্দরের আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ পদ্ধতিতে সরকার শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকায় থাকে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে ‘টুল পোর্ট পদ্ধতিতে। এতে বন্দর পরিচালনার প্রায় সব দায়িত্ব থাকে সরকারের হাতে।
ল্যান্ডলর্ড মডেলে ঝোঁকার পর থেকে চট্টগ্রামে বন্দরে বিনিয়োগ করতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা। এক্ষেত্রে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে বিশ্বের খ্যাতনামা বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্যে আরএসজিটি একটি টার্মিনাল (পতেঙ্গা) পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। বন্দরের এ যাবতকালের সবচেয়ে বড় প্রকল্প বে–টার্মিনাল ও লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালে চারটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান এবং একটি দেশি–বিদেশি যৌথ বিনিয়োগ প্রস্তাব আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান শুধু বে–টার্মিনালে আগামী বছরের মধ্যে সাড়ে ৭ থেকে ৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এছাড়া লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে ডেনমার্কভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান।
রূপকল্প ২০৪১ সামনে রেখে আগামী বছর বন্দরে ব্যাপক উন্নয়ন শুরু হবে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের টার্মিনাল নির্মাণকাজ ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে মার্চ–এপ্রিলে শুরু হবে। চট্টগ্রাম বন্দরের অগ্রাধিকার প্রকল্প বে–টার্মিনালের অধীনে থাকবে চারটি টার্মিনাল। এর মধ্যে মাল্টিপারপাস টার্মিনালের নির্মাণকাজ ২০২৪ সালের মাঝামাঝি শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এ টার্মিনাল নির্মাণের জন্য আবুধাবি পোর্ট গ্রুপ (এডি পোর্টস) ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রস্তাব দাখিল করেছে। বে–টার্মিনালের কনটেইনার টার্মিনাল–১ ও ২ নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য যথাক্রমে পিএসএ সিঙ্গাপুর ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আগামী বছর চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বে–টার্মিনালের চতুর্থ টার্মিনাল হিসাবে গ্যাস ও অয়েল টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এ টার্মিনালের পরিকল্পনা আগে ছিল না। এটি নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ টার্মিনাল নির্মাণের জন্য একটি দেশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে আগ্রহ প্রকাশ করে ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব করেছে। আগামী বছরের মধ্যে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। এর বাইরে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রস্তাবিত লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের জন্য ডেনমার্কের বিশ্ববিখ্যাত টার্মিনাল অপারেটর প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস প্রস্তাব দিয়েছে, যা বর্তমানে পিপিপি প্রকল্প হিসাবে প্রক্রিয়াধীন। ৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ–ডেনমার্ক যৌথ প্ল্যাটফরম সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হবে। এ টার্মিনাল নির্মাণের কাজও আগামী বছর শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ সোহায়েল বলেন, বে–টার্মিনালের জন্য আমরা ব্যাপক বিনিয়োগের প্রস্তাব পাচ্ছি। অনেক দেশ ও বিদেশি বড় বড় প্রতিষ্ঠান আমাদের প্রস্তাব দিচ্ছে। তারা বিনিয়োগ করতে চায়। বে–টার্মিনাল একসময় স্বপ্ন ছিল। এখন আর এটা শুধু স্বপ্ন নয়। বাস্তব রূপ পেতে চলেছে। আগামী বছরের জুন–জুলাইয়ে বে–টার্মিনালের অংশ একটি টার্মিনালের নির্মাণকাজ শুরু হবে। শুধু বে–টার্মিনালেই সাড়ে ৭ থেকে ৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আসবে। বে–টার্মিনাল ও সংলগ্ন এলাকার বিভিন্ন প্রকল্পে আগামী বছর সাড়ে ১১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আসতে পারে। তিনি আরও বলেন, বিশ্বের অন্য বন্দরের মতো ল্যান্ডলর্ড পদ্ধতিতে এ বন্দরও পরিচালিত হবে।