পেশা যেমন মানুষকে বহুভাগে বিভক্ত করে রেখেছে, পার্থক্য সৃষ্টি করে দিয়েছে মান–মর্যাদার, তদ্রুপ ধর্ম ঐ একই কাজে রয়েছে ব্যস্ত। শ্রম ও পেশার ক্ষেত্রে বলা হয়, শ্রমের মর্যাদা থাকবে সর্বোপরি, আর ধর্মের ক্ষেত্রে ফতোয়া দেয়া হয়, ধার্মিক ব্যক্তিদের মধ্যে থাকতে পারে না জাত–পাত, উঁচু–নিচুর বালাই। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে কিতবের উক্তি থাকে একদিকে আর মানুষের তথা সমাজের চলন–বলন থাকে বিপরীতে। কথায় বলে, দিবসে বেজায় আলো, আর রাতে ঘন কালো; তা মানুষের জীবনটা অবশ্যই প্রভাবিত হচ্ছে প্রকৃতির হাতে।
প্রাণী জগতের মধ্যে মানুষ অন্যতম। মানুষকে বলা হয় সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। উৎকৃষ্ট আর নিকৃষ্ট, বড় ও ছোট, সাদা–কালো শব্দগুলো মূলত: একই শ্রেণিতে হয়ে থাকে পর্যবসিত। কোনো মানুষ অসামাজিক কাজে যুক্ত হলে এবং তা যখন সমাজে চাউর হয়ে পড়ে, তখন সমাজ তাকে ঘৃণা করে, এড়িয়ে চলে। হয়ে গেল সমাজ দ্বিখন্ডিত, অন্তত: সূত্রপাত। তখনও দোষি ব্যক্তিটা সমাজের আর দশজনের মতোই জৈবিক দিক দিয়ে অভিন্ন। তাই আজকের ভাগাভাগি কেবল মনের, চিন্তা–চেতনার, বাস্তব জীবনে তেমন প্রভাব কার্যকর হতে পারে না। আজ আমরা হলাম মানব সমাজ, গোটা বিশে^র সকল মানুষ অত্র সমাজের আইনানুগ সদস্য। যদি আমরা মানব সমাজ বলে ঘোষণা দেই তখন আমাদের এ ঘোষণা যাবতীয় ভৌগলিক সীমা–পরিসীমা উর্দ্বে বা অতিক্রম করে তবে তেমন দাবিটি হবে অর্থবহ। আবার কোনো দেশের উপর ভিত্তি করে যদি সমাজ গণনা শুরু করেন তবে উক্ত দেশের বাইরের যাবার কারো সুযোগ, থাকবে না তেমন সমাজের সদস্য হবার। মানুষের জন্য নির্মিত হয়েছে যাবতীয় বিষয় নদ–নদী, খাল–বিল, গাছ–পালা পার্থিব দৃশ্য–অদৃশ্য যাবতীয় সৃষ্টি; সকল মানুষ মিলেমিশে তা ভোগ–দখল করবে, যা হলো মহান নির্মাতার সুদূর–প্রশারি পারিকল্পনা।
সৃষ্টি কল্যাণে রচিত এমন সুন্দর পরিকল্পনার অন্যথা কে করতে পারে অভিশপ্ত ইবলিস ছাড়া? একবার ভেবে দেখুন! কার হাতে ভ্রাতার রক্ত ক্ষরিত হতে পারে, একটু কল্পনা করুন! যার সাথে রয়েছে মহান মাবুদের নিয়ত আন্তরিক মধুময় সম্পর্ক, তেমন ব্যক্তির পক্ষে মানুষের ক্ষতি করার চিন্তা, কষ্মিনকালেও আসতে পারে না। কালামপাকে আমরা পরিষ্কার দেখতে পাই, খোদা মানুষকে মহব্বত করেছেন এক অনন্তকালীন মহব্বতের দ্বারা। খোদার হলেন চিরকল্যাণকর মহান সত্ত্বা।
আর বিপরীতক্রমে অভিশপ্ত ইবলিস প্রথম দিন থেকেই সৃষ্টি বিনাশ করে আসছে। মানুষকে বিভ্রান্ত করা, ভুল পথে ঠেলে দেয়া, পরিশেষে হত্যা ও ধ্বংস করে স্বীয় হীনচরিত্রের প্রকাশ ঘটানো।
যে ব্যক্তি মানুষ হত্যা করতে পারে সে তো পরিষ্কার নরাধম, কোনো মতেই নরকুলপতি হতে পারে না। ধর্ম ও সামাজিকতা বাস্তবায়নের জন্য আপনি যতকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করুন না কেন, তাতে কোনো আক্ষেপ করার কারণ দেখি না। চলার পথে ভুলত্রæটি ঘটতেই পারে, তবে সত্য চেতনা লাভ ও সত্য পথে উপনিত হবার পরে স্বেচ্ছায় কোনো ব্যক্তি আবার ভুল পথে নেমে যেতে পারে কি? হাত–পা–চোপ বেঁধে যদি আপনাকে অথৈই সাগরে অথবা বহ্নিমান চিতার মধ্যে ফেলে দেয়া হয় তবে আপনার করার তো কিছু রইল না। আপনার দেহটিকে গ্রেপ্তার করতে পারে, পোড়াতে পারে, থেতলে দিতে পারে, কিন্তু আপনার মন বা হৃদয়ে উপর প্রভাব ফেলার ক্ষমতা অভিশপ্ত ইবলিস আদৌ রাখে কি? যে নরপশু ভ্রাতৃহন্তা নিজ হাতে মানুষ খুন করে মানব হত্যার রেওয়াজ সৃষ্টি করেছে, তার অনুসারিরা অদ্য পর্যন্ত তেমন অপকর্মে রয়েছে লিপ্ত, আর তা চলছে চরদখল, ঘর দখলের উদ্দেশ্যে, বাহ্যত লেফাফা হলো ধর্মের সেবা। কতগুলো মূর্খমানব আজ নানা ভাবে নানা কৌশলে রক্তের নেশায় রয়েছে উম্মাদ। অতীত ও বর্তমান বিশে^ মানব হত্যার যতগুলো দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হয়েছে, সঠিকভাবে ক্ষতিয়ে দেখা হলে প্রমাণিত হবে, প্রত্যেকটি যুদ্ধবিগ্রহ, খুনাখুনি ঘটে চলছে পার্থিব সম্পদ ও মাংসিক কামনা–বাসনা চরিতার্থ করার অন্ধ মোহে। এরা সকলে নরকের কীট। আর এদের প্রশংসায় সমচরিত্রের লোকজন থাকে নিয়ত পঞ্চমুখ। কথায় বলে চোরে চোরে মাসতুত ভাই।
কতগুলো শ্লোক নিয়ম করে ক্ষণেক্ষণে উচ্চারণ করার মধ্যে ধার্মিকতার কি কোনো বালাই থাকতে পারে? বাস্তব জীবনে রয়েছে যখন অগণিত ইল্লতের দাগ, আর তা এতটাই মারাত্মক, যেথা পট্টি, মলম বা ঔষধ প্রয়োগ করার অবকাশ পর্যন্ত নেই। সকলে পাপ করেছে, প্রত্যেকের ধার্মিকতা জনিত কর্মকান্ড খোদার কাছে ছেড়া নেকড়া যোগ্য, যা তিনি ঘৃণাভরে থুথুর মতো করে ফেলে দেন। তিনি হলেন মহাপবিত্র, তাঁর সাথে সহভাগিতা পেতে হলে ব্যক্তিকে শতভাগ পবিত্র হতে হবে। তিনি পরিষ্কার জানান দিয়েছেন, “আমি পবিত্র বলে তোমরাও পবিত্র হও” (লেবীয় ১১ : ৪৪)।
মুখে বলা হয় ‘শ্রমের মর্যাদা, আসলে কথাটা কি কেবল বলার জন্যই বলা না বাস্তবতাও রয়েছে এমন ধারণার পিছনে। আমরা অবশ্যই আন্তরিকভাবে পেশা ও শ্রমের মর্যাদা দেব, তবে পেশাগত কারণে মানুষের অবমাননা কোনোভাবেই মেনে নেয়া চলবে না, মনে রাখতে হবে, ‘সবার উপর মানুষ সত্য, মানুষ হলো অদৃশ্য খোদার দৃশমান প্রতিভু, কেবল ইবলিস ও ইবলিসাশ্রিত ব্যক্তিবর্গ মানুষের ক্ষতি করার প্রবণতায় ভুগে চলছে। খোদা মানুষের কল্যাণ কামনা করে চলেন সদা–সর্বদা।
মতবাদের কথায় আসুন, যে মতোবাদ মানুষকে মানুষের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলে তা অবশ্যই ইবলিসের শেখানো মন্ত্র, সর্বাবস্থায় অবশ্যই তা পরিত্যাজ্য। মানুষের কল্যাণ সাধন করা হলো খোদার কাজ, আর বিপরীতক্রমে মানুষের ক্ষতি সাধন করা হলো অভিশপ্ত ইবলিসের কারসাজি।
আসুন, সকল মানুষকে সম্মান ও মর্যাদা দিয়ে উন্নত মানব সমাজ গড়ে তুলি।