গত ছয় বছরে (২০১৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত) দেশে দারিদ্র্যের হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে আগের মতো শহরের চেয়ে গ্রামাঞ্চলে এই হার এখনো বেশি। গ্রামাঞ্চলে ৬ বছরে দারিদ্র্যের হার কমেছে ৫ দশমিক ৯ ও শহরাঞ্চলে ৪ দশমিক ২ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ১৭তম হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে (এইচআইইএস) প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের ৩৭ শতাংশ মানুষ এখনো ঋণ করে সংসার চালাচ্ছেন।
গতকাল বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিবিএস ভবনে মূল প্রতিবেদনটি তুলে ধরেন প্রকল্পটির পরিচালক মহিউদ্দিন আহমেদ। বিবিএস মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। এ ছাড়া ব্র্যাকের চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব ড. শাহনাজ আরেফিন, সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. মো. কাউছার আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৪ হাজার ৪ শতাধিক পরিবারের ১২ মাসের তথ্যের ভিত্তিতে জরিপ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০১৬ সালে ছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ। পল্লী অঞ্চলে দারিদ্র্যের হার ২০ দশমিক ৫ শতাংশ ও শহরাঞ্চলে ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০১৬ সালে ছিল ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ ও ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ।
বিবিএস জরিপ বলছে, ২০২২ সালে সর্বোচ্চ দারিদ্র্য হার পাওয়া গেছে বরিশাল বিভাগে। আগে কুড়িগ্রামে সর্বোচ্চ দারিদ্র্য হার থাকলেও এবার সেটি বরিশালে গেছে। জরিপ অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে ২১ দশমিক ১১ শতাংশ ব্যক্তি মাঝারি বা মারাত্মক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ছিলেন। যেখানে ২০২২ সালে পল্লী এলাকায় এ হার ছিল ২২ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং শহর এলাকায় ১৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ। দেশে ২০২২ সালে ১ দশমিক ১৩ শতাংশ মানুষ মারাত্মক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ছিলেন। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, একটি পরিবার মাসে গড় আয় করে সাড়ে ৩২ হাজার টাকা। আয়ের বিপরীতে একটি পরিবারের ব্যয় হয় সাড়ে ৩১ হাজার টাকা। অর্থাৎ একটি পরিবার মাসে এক হাজার টাকার মতো সঞ্চয় করে।
বিবিএস প্রতিবেদনে জানায়, দেশের প্রতিটি খানার (বিবিএসের সংজ্ঞানুযায়ী যে কয়জন ব্যক্তি একই রান্নায় খাওয়াদাওয়া করেন, তাদের একত্রে একটি খানা বা হাউজহোল্ড বলা হয়) গড় আয় বেড়েছে। জরিপ অনুযায়ী খানার মাসিক গড় আয় ৩২ হাজার ৪২২ টাকা। যা ২০১৬ সালের জরিপে ছিল ১৫ হাজার ৯৮৮ টাকা। এ ছাড়া খানার মাসিক ব্যয়ও বেড়েছে। বর্তমানে একটি খানার মাসিক ব্যয় ৩১ হাজার ৫০০ টাকা, যা ২০১৬ সালে ছিল ১৫ হাজার ৭১৫ টাকা।
জরিপে দেখা গেছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ ঋণ করে সংসার চালাচ্ছেন। বর্তমানে জাতীয় পর্যায়ে একটি পরিবারের গড় ঋণ ৭৩ হাজার ৯৮০ টাকা। ঋণগ্রস্ত পরিবার হিসেবে এই অঙ্ক আরও অনেক বেশি। বিশেষ করে শহরের মানুষকে বেশি ঋণ করতে হচ্ছে।
তথ্য–উপাত্ত নিরীক্ষণে জরিপে দেখা যায় খানায় খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত ব্যয়ের ধারায় পরিবর্তন হয়েছে। খাদ্যবহির্ভূত ব্যয় ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ২০২২ সালে খাদ্য ব্যয়ের শতকরা হার ৪৫.৮ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত ব্যয় ৫৪.২ শতাংশ। যেখানে ২০১৬ সালে খাদ্যের জন্য ব্যয় ছিল ৪৭.৭ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত ব্যয় ৫২.৩ শতাংশ। ২০২২ সালে চালের দৈনিক মাথাপিছু গড় ভোগের পরিমাণ ছিল ৩২৮.৯ গ্রাম, যা ২০১৬ সালে ছিল ৩৬৭.২ গ্রাম এবং ২০১০ সালে ছিল ৪১৬.০ গ্রাম। এ ছাড়া সবজি ও মাংসের ব্যবহার ধীরে ধীরে বেড়েছে বলে জানায় বিবিএস।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রোটিন গ্রহণের গড় পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। জরিপ অনুযায়ী দৈনিক মাথাপিছু প্রোটিন গ্রহণের পরিমাণ ৭২.৫ গ্রাম, যা ২০১৬ সালে ছিল ৬৩.৮ গ্রাম।