হরতাল–অবরোধের কারণে রাঙামাটির পর্যটনে মারাত্মক ধস নেমেছে। এখন রাঙামাটিতে পর্যটনের ভরা মৌসুম। জেলার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ পর্যটন কমপ্লেক্সের মনোরম ঝুলন্ত সেতুটি প্রায় দেড় মাস যাবত কাপ্তাই হ্রদের পানিতে ডুবে থাকার পর ভেসে উঠলে ২০ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে পর্যটনের এ ভরা মৌসুম।
কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই বিএনপি–জামায়াতসহ সমমনা দলগুলোর আন্দোলনে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা তৈরি হওয়ায় নিমিষেই রাঙামাটি পর্যটন খাতে ভাটা পড়ে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২৮ অক্টোবরের বিএনপির মহাসমাবেশের সঙ্গে সঙ্গেই হরতাল অবরোধের কারণে রাঙামাটির পর্যটন ব্যবসায় একেবারে ধস নেমেছে। বর্তমানে এখানকার পর্যটন স্পটগুলোতে পর্যটকশূন্যতা বিরাজ করছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে পুরোটা মৌসুমজুড়ে পর্যটন ব্যবসায় বিশাল লোকসান গুনতে হবে বলে আশঙ্কা করছেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
পর্যটনসংশ্লিষ্টরা জানান, এ মৌসুমে হ্রদ, ঝরনা, পাহাড়ের প্রকৃতি আর মেঘমালার লুকোচুরি উপভোগে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাঙামাটি ছুটে আসেন ভ্রমণপিপাসু মানুষ। ছুটে যান মেঘ–পাহাড়ের সীমান্ত সাজেকভ্যালি পর্যন্ত। কিন্তু এ মৌসুমে দেশে চলমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ভ্রমণপিপাসু মানুষের আগমন অবরুদ্ধ করেছে। ফলে বর্তমানে রাঙামাটির পর্যটন স্পটগুলো দৃশ্যত পর্যটকশূন্য।
রাঙামাটির পর্যটনের আকর্ষণীয় ও দৃষ্টিনন্দন স্পটগুলোর মধ্যে রয়েছে– রাঙামাটি পর্যটন মোটেল ও হলিডে কমপ্লেক্সের মনোরম ঝুলন্ত সেতু, মনোমুগ্ধকর সুবলং ঝরনা স্পট, রাজবন বিহার, চাকমা রাজার বাড়ি, জেলা প্রশাসকের বাংলো, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফের সমাধি, বালুখালী কৃষি খামার, জেলা পুলিশের সুখী নীলগঞ্জ, পলওয়েল পার্ক, আরণ্যক, বড়গাঙ স্পট, রাঙামাটির লাভ পয়েন্ট, টুকটুক ইকোভিলেজ, আসামবস্তি সেতু, চাংপাং রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন স্থান ও পাহাড়ি গ্রাম এবং পাহাড়িদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা।
এছাড়াও রাঙামাটি শহরের বাইরে রয়েছে বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকের মনোরম পর্যটন স্পট ও রিসোর্ট, কাপ্তাই উপজেলার কর্ণফুলী নদীর তীরে গড়ে ওঠা আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, কর্ণফূলী পেপার মিল ও কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান, কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়ার বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট কমপ্লেক্স, বেতবুনিয়া চা বাগান ইত্যাদি।
রাঙামাটি সরকারি পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্স জানায়, গত বছর নভেম্বর মাসে পর্যটন ঝুলন্ত সেতুতে ভ্রমণ করেছেন ২৬ হাজার পর্যটক। কিন্তু এ বছর কাপ্তাই হ্রদের পানি বেড়ে যাওয়ায় ৩ সেপ্টেম্বর থেকে পর্যটনের ঝুলন্ত সেতুটি ডুবে যায়। দেড় মাস পর তা ভেসে উঠলে ২০ অক্টোবর পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হয়। এরপর মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে কয়েক হাজার পর্যটক ঝুলন্ত সেতুতে ভ্রমণ করেছেন। এতে তুলনামূলকভাবে দেখা যায় গত বছরের চেয়ে এ বছর পর্যটকের আগমন বাড়ে রাঙামাটিতে। কিন্তু ২৮ অক্টোবর থেকে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা দেখা দিলে হঠাৎ পর্যটক আগমন বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে পর্যটন স্পটগুলোতে অনেকটাই শূন্যতা বিরাজ করছে।
রাঙামাটি শহরের আবাসিক হোটেল সাংহাই ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপক মো. রনি জানান, তাদের হোটেলে বর্তমানে সবগুলো কক্ষ খালি পড়ে আছে। কোনো পর্যটক নেই। ২৮ অক্টোবরের আগে ৩০ শতাংশ কক্ষ বুকিং থাকলেও সব বাতিল করে দেওয়া হয়েছে।
মতিমহল আবাসিক হোটেলের ব্যবস্থাপক চন্দন দাশ জানান, তাদের হোটেলে ৮০ শতাংশ কক্ষ বুকিং ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ২৮ অক্টোবর সেগুলো বাতিল করা হয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে মারাত্মক লোকসান গুনতে হবে।
বাঘাইছড়ির সাজেকের হিলভিউ রিসোর্টের মালিক ইন্দ্র চাকমা জানান, বর্তমানে সাজেক পর্যটন এলাকায় পর্যটকের সংখ্যা একেবারে কম। দেশের পরিস্থিতির কারণে পর্যটকের আগমন আর নেই। তবে দেশে চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটলে সামনে ডিসেম্বর মাসে সাজেকে পর্যটকদের ভ্রমণ বাড়বে বলে আশা করছি।
রাঙামাটি আবাসিক হোটেল মালিক সমিতির সভাপতি মঈন উদ্দীন সেলিম জানান, আগের বছরের তুলনায় এ বছর রাঙামাটিতে পর্যটকদের ভালোই সাড়া যায়; কিন্তু হরতাল অবরোধে তাতে মারাত্মক ভাটা পড়েছে।
রাঙামাটি পর্যটন মোটেল ও হলিডে কমপ্লেক্স ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা বলেন, বর্তমানে পর্যটনের ভরা মৌসুম চলছে; কিন্তু হরতাল অবরোধ কর্মসূচিসহ দেশে চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এখন পর্যটকের আগমন নেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে মারাত্মক লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে। মৌসুম শুরুর দিকে ৬০ শতাংশ অগ্রিম বুকিং পাওয়া যায়। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সব বুকিং বাতিল হয়ে গেছে।