ছাতিমের গন্ধ সবার ভালো লাগে না। এ ফুল কিছুটা উগ্রগন্ধী। কারও কারও নাকে এসে লাগতেই মাথা ধরে। গাছের আশপাশ দিয়েও যেতে চান না তারা। আবার অনেকে ভীষণ পছন্দ করেন। ছাতিম ফুল ফুটতেই উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন। তবে দুই ধরনের অনুভূতির বাইরেও ছাতিম নিয়ে আছে নানা গল্প। একটি গল্প তো সবার জানা, বলা হয়ে থাকে ছাতিম গাছে ভূত থাকে! কেউ কেউ আবার বলেন, শয়তানের বাস সেখানে! এ কারণে গ্রামের ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা, এমনকি বড়দের অনেকে গাছটির নিচ দিয়ে হেঁটে যেতে ভয় পান। হ্যাঁ, গ্রামেই বেশি হয় ছাতিম গাছ। যে কটা গাছ খুব করে গ্রামের কথা মনে করিয়ে দেয়, ছাতিম সেগুলোর অন্যতম।
গল্প বা উপন্যাসে গ্রামীণ জীবন ও প্রকৃতির কথা বলতে গিয়ে জনপ্রিয় লেখকরা এ গাছের কথা বারবার তুলেছেন। কবিতায় এসেছে ছাতিম। রবীন্দ্রনাথের কথাই আগে বলা যাক, কবিগুরু লিখেছেন, ওই যে ছাতিম গাছের মতোই আছি/সহজ প্রাণের আবেগ নিয়ে মাটির কাছাকাছি।’ শুধু তাই নয়, শান্তিনিকেতনে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ছাতিমের পাতা উপহার দেওয়ার রীতি প্রচলিত ছিল বলে জানা যায়। সেখানে আলাদাভাবে আছে ছাতিমতলাও। বিভূতিভূষণের রচনায় ছাতিমের কথা বারবার এসেছে। তার লেখা বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আরণ্যক’ পড়া আছে নিশ্চয়ই।
সেখানে ছাতিমের প্রতি মুগ্ধতা প্রকাশ করে তিনি লিখেছেন, ‘পাহাড়ের ওপরে ঘন বন ঠেলিয়া কিছুদূর উঠিতেই কিসের মধুর সুবাসে মনপ্রাণ মাতিয়া উঠিল, গন্ধটা অত্যন্ত পরিচিত–প্রথমটা ধরিতে পারি নাই, তারপরে চারিদিকে চাহিয়া দেখি–ধন্ঝরি পাহাড়ে যে এত ছাতিম গাছ তাহা পূর্বে লক্ষ্য করি নাই–এখন প্রথম হেমন্তে ছাতিম গাছে ফুল ধরিয়াছে, তাহারই সুবাস।’ একই লেখক তার অন্য লেখায় ফুলের গন্ধকে ‘উগ্রসুবাস’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ছাতিম ফুল গুচ্ছাকারে ফোটে। দেখে মনে হয় পুষ্পস্তবক। প্রতিটি পুষ্পগুচ্ছ চার থেকে সাতটি পাতা দ্বারা বেষ্টিত থাকে। এ কারণে গাছটি সপ্তপর্ণ বা সপ্তপর্ণা নামেও পরিচিত। ছাতিম নামকরণের মূলেও রয়েছে এর পাতা। পাতাগুলো একসঙ্গে বিশাল ছাতার মতো। যতদূর তথ্য, ছাতা থেকেই ছাতিম নামকরণ করা হয়েছে। আর বৈজ্ঞানিক নাম অ্যালস্টনিয়া স্কলারিস। বাংলাদেশসহ চীনের গুয়াংজু প্রদেশ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো ছাতিমের আদি নিবাস।
ছাতিম ফুলের বর্ণনা দিতে গিয়ে উদ্ভিদবিদ দ্বিজেন শর্মা লিখেছেন, ‘ফুলেরা অনুজ্জ্বল, সবুজাভ সাদা, অনাকর্ষী, তবু ছত্রাকৃতি মঞ্জরির প্রাচুর্যে পুষ্পিত ছাতিম সুশ্রী। অত্যুগ্র গন্ধে নেশার ঝাঁজ রয়েছে।’ পরের বলাটি আরও চমৎকার, তিনি লিখেছেন, ‘এমন প্রখর বলিষ্ঠ আত্মঘোষণার সামর্থ্য খুব কম গাছেরই আছে।’