তৈরি পোশাক খাতে সর্বনিম্ন মজুরি নিয়ে মালিক–শ্রমিক দুই মেরুতে অবস্থান নিয়েছে। সময় যতই গড়াচ্ছে, দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ ততই বাড়ছে। সর্বশেষ বৈঠকে এই বিরোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে। এদিকে, এবার ন্যায্য মজুরির দাবিতে শ্রমিক সংগঠনগুলো কঠোর অবস্থান নিয়েছে। আলোচনার পাশাপাশি রাজপথেও আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে শ্রমিকরা। তাই জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে শ্রমিক অসন্তোষের বিষয়ে দুশ্চিন্তায় সংশ্লিষ্টরা।
এর আগে, সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের চতুর্থ বৈঠকে মালিকপক্ষ ১০ হাজার ৪০০ টাকা সর্বনিম্ন মজুরির প্রস্তাব দিয়েছে। তবে শ্রমিকপক্ষ দিয়েছে দ্বিগুণ অর্থাৎ ২০ হাজার ৩৯৩ টাকা। অন্যদিকে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ন্যূনতম মজুরি ১৭ হাজার ৫৬৮ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে। তিন পক্ষের প্রস্তাব নিয়ে চাপে রয়েছে বোর্ড। বিশেষ করে মালিক–শ্রমিকদের প্রস্তাবে ‘ব্যবধানটা অনেক বেশি হয়ে গিয়েছে’ বলে মন্তব্য করেছেন ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী মোল্লা।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকরা এখনো সর্বনিম্ন মজুরি পাচ্ছে। ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারত, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন এবং পাকিস্তান বর্তমানে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের বড় প্রতিযোগী।
শ্রমিক পক্ষের প্রস্তাবনায় বলা হয়, ভিয়েতনামে ১৯১ ডলার, ভারতে ১৬৫ ডলার, মিয়ানমারে ১৫৭ ডলার, কম্বোডিয়ায় ২০০ ডলার, ইন্দোনেশিয়ায় ২৪৩ ডলার এবং পাকিস্তানে ১১০ ডলার বেতন পায় শ্রমিকরা। সেখানে বাংলাদেশে মাত্র ৭৫ ডলার।
তবে মালিক পক্ষ বলছেন, ভিন্ন কথা। ক্রেতাদের পক্ষ থেকে দর না বাড়ালে মালিকদের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শ্রমিকদের চাহিদা মতো মজুরি দেওয়া সম্ভব না। এ জন্য আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সহযোগিতা চায় মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)। বর্তমানে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি আট হাজার টাকা। ২০১৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নতুন এই মজুরি ঘোষণা দেওয়া হয়। ওই ঘোষণা অনুযায়ী, শ্রমিকের মূল বেতন চার হাজার ১০০ টাকা, বাড়ি ভাড়া এক হাজার ৫০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা ৬০০ টাকা, যাতায়াত ভাতা ৬০০ টাকা এবং বাকি টাকা খাদ্য ও অন্যান্য খাতে ধরা হয়। এর আগে ২০১৩ সালে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল পাঁচ হাজার ৩০০ টাকা।
শ্রম আইন অনুযায়ী, প্রতি পাঁচ বছর পর পর মজুরি কাঠামো পর্যালোচনা করতে হয়। সর্বশেষ ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে মজুরি কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন করে নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। সেই হিসাবে সেপ্টেম্বরেই নতুন মজুরি নির্ধারণের কথা ছিল। পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পর্যালোচনায় গঠিত বোর্ডের চতুর্থ সভায় মালিক– শ্রমিকপক্ষ যে প্রস্তাব দিয়েছে, দুই প্রস্তাবে মজুরির ব্যবধান ১০ হাজার টাকা।
এদিকে, তৈরি পোশাক খাতের কর্মীদের জন্য ন্যূনতম মজুরি ১৭ হাজার ৫৬৮ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে সিডিপি। এক জরিপের মাধ্যমে পোশাককর্মীদের চাহিদা ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন এই বেতন কাঠামোর সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। পোশাক খাতের ক্রেতারা প্রতি পিস পোশাকের জন্য ৭ সেন্ট অতিরিক্ত দিলে শিল্প মালিকরা নতুন এই মজুরি বাস্তবায়নে চাপে পড়বেন না বলে মনে করে সংস্থাটি।
সিপিডির গবেষণা মতে, ২২৮ জন শ্রমিক ও ৭৬টি কারখানায় জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, অনেক কারখানায় শ্রমিকরা ২০১৮ সালে ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি পায় না। এমনকি শ্রমিকরা কোনো গ্রেডে কাজ করছেন, তারা জানেন না, পদোন্নতি পেতে ঊর্ধ্বতন গ্রেডে যেতে কতদিন সময় লাগে, তাও জানেন না। বেতন না পেলে কোথায় অভিযোগ জানাতে হবে, তাও শ্রমিকরা জানে না বলে গবেষণায় পাওয়া গেছে।
শ্রমিক ও মালিকপক্ষ যে দাবিই করুক না কেন, শ্রমিকদের মজুরি শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হবে নিম্নতম মজুরি বোর্ডে। চলতি বছরের মধ্যেই পোশাক খাতের এসব শ্রমিকদের জন্য নতুন মজুরি নির্ধারণের লক্ষ্য রয়েছে মজুরি বোর্ডের। সেটি হলে পাঁচ বছর পর আবার পোশাক শ্রমিকদের বেতন বাড়তে যাচ্ছে। এর আগে সর্বশেষ ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে বাড়ানো হয়েছিল পোশাক শ্রমিকদের বেতন, যা কার্যকর হয়েছিল ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে। সেই হিসাবে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে নতুন বেতন কার্যকর হওয়ার আশায় রয়েছে শ্রমিকরা।
কিন্তু দুই পক্ষের প্রস্তাবে যে মতপার্থক্য রয়েছে, এতে সহসা দুই–একটি বৈঠকে এর সমাধান হবে বলে মনে করছেন না সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে মালিক–শ্রমিক দুইপক্ষই তাদের প্রস্তাবের বিষয়ে অনড়।
বোর্ডের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী মোল্লা বলেন, ‘আমাদের চতুর্থ বোর্ড সভায় শ্রমিক ও মালিকপক্ষ উভয়ই তাদের প্রস্তাব দাখিল করেছেন। এটা নিয়ে আমরা প্রিলিমিনারি আলোচনা করেছি। পরবর্তী বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হবে। মজুরি প্রস্তাব মালিকপক্ষ দিয়েছে সর্বনিম্ন ১০ হাজার ৪০০ টাকা এবং শ্রমিকপক্ষ দিয়েছে ২০ হাজার ৩৯৩ টাকা।’
তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে আগামী ১ নভেম্বর বিস্তারিত আলোচনা করে একটা ঐকমত্যে পৌঁছাব। এর মধ্যে আমরা বলেছি, উভয়পক্ষের প্রস্তাবের ব্যবধানটা অনেক বেশি হয়ে গিয়েছে। সেটা কাছাকাছি নিয়ে আসার কথা বলেছি। একটা রিজনেবল গ্রাউন্ডে এলে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে। মালিকপক্ষের প্রতিনিধি ও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, তৈরি পোশাক খাত শ্রমঘন একটি শিল্প। এখানে অটো মেশিনে কাজ চলে না। তাই ইচ্ছামতো বেতন বাড়ালেই হবে না। মালিকদেরও টিকে থাকতে হবে। এই খাত ছাড়াও আরও ফরমাল সেক্টর আছে, সেখানে কোনো নজরদারি নেই। শুধু গার্মেন্টে কেন। মূল্যস্ফীতি অনুযায়ী আমরা প্রস্তাব দিয়েছি। এই একটি মাত্র সেক্টর দেশকে কিছু দিচ্ছে। সেই সেক্টর যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে সবাইকে নজর রাখতে হবে।
শ্রমিকদের প্রতিনিধি বাংলাদেশ জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি বলেন, বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করে বোর্ডের সভায় এই প্রস্তাবনা তুলে ধরেছি। জীবনযাপনের ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, এর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে এবার প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়েছে। এ বছরের মধ্যেই নতুন বেতন কাঠামো চূড়ান্ত দেখতে চায় শ্রমিকরা, যাতে জানুয়ারি থেকে বাস্তবায়ন করা যায়। পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে ছয় সদস্যের কমিটির চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী মোল্লা। বোর্ডের নিরপেক্ষ সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ব্যবসায় বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর মো. কামাল উদ্দীন।
মালিকদের প্রতিনিধি হিসেবে আছেন বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের উপমহাসচিব মকসুদ বেলাল সিদ্দিকী। বোর্ডে শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্বকারী সদস্য জাতীয় শ্রমিক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুলতান আহম্মদ। তৈরি পোশাক খাতের মালিকদের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান। আর পোশাক শিল্পে নিযুক্ত শ্রমিকদের প্রতিনিধি জাতীয় গার্মেন্ট শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি।