ভোগ্যপণ্যের বর্তমান বাজারে ক্রেতা অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে সবজির দাম। চাহিদার প্রায় শতভাগ উৎপাদন সক্ষম খাতটিতে ক্রেতার ব্যয় ছাড়িয়েছে অতীতের সব রেকর্ড। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক ধাপে চাঁদাবাজি, পরিবহণ ব্যয়, বৈরী আবহাওয়া ও বাজার তদারকি না থাকায় অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে সবজির দাম। আর এই বাড়তি দামের পুরোটাই গুনতে হচ্ছে ভোক্তাকে অন্যদিকে লোকসানে সাধারণ কৃষক।
দীর্ঘদিন ধরেই খুচরা বাজারে বাড়তির দিকেই রয়েছে সব ধরনের সবজির দাম। যা কোনো উৎসব, ছুটির দিন কিংবা একটু বৃষ্টি হলেই ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। তবে চলতি মাস জুড়েই অস্বাভাবিক দাম বিরাজ করছে রাজধানীর সবজি বাজারগুলোতে। কিছু কিছু পণ্য বিক্রি হচ্ছে উৎপাদন খরচের চেয়ে ৮ থেকে ১০ গুণ বেশি দামে। দেখা গেছে বাজারের সবচেয়ে কম দামে বিক্রীত সবজি কাঁচা পেঁপে খুচরা বাজারে বিক্রি হয় ৫ গুণ বেশি দামে। অন্যদিকে ৯ টাকা উৎপাদন খরচের প্রতি কেজি বেগুন বিক্রি হয় ১২ গুণেরও বেশি দামে।
এ সপ্তাহে রাজধানীর বাজারে প্রতি কেজি লম্বা বেগুন বিক্রি হয়েছে ১শ’ টাকা, গোল বেগুন ১৪০ টাকা, করোল্লা ১২০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৬০ টাকা; ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা, শসা, ঢেঁড়শ, ধুন্দল, কাকরোলসহ বেশিরভাগ সবজিই ৮০ টাকার উপরে।
অথচ কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী চলতি বছরে এসব সবজির উৎপাদন খরচ গড়ে প্রতি কেজিতে মাত্র ৮ থেকে ১০ টাকা। এর মধ্যে বেগুনের উৎপাদন ব্যয় ১০ টাকা, পেঁপে ৯ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৭.২২ টাকা, পটোল ৯.৬৯ টাকা, ঢেঁড়স ১২.৪০ পয়সা, শসা ১০.৮৪ পয়সা, চিচিঙ্গা ১১.৪৭ টাকা, কাঁচামরিচ ৪০.১৭ টাকা করে। সে হিসাবে খুচরা বাজারে এসব সবজি ক্রেতা কিনছেন ১০ গুণেরও বেশি দামে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর বাজারে প্রতিটি সবজিবাহী ট্রাকে দফায় দফায় চাঁদা দিতে হয়। যার পরিমাণ দূরত্বভেদে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা। আগের থেকে প্রায় ৩০–৪০ শতাংশ বেড়েছে পরিবহণ ব্যয় ও শ্রমিকের মজুরি। এছাড়াও বেড়েছে স্থানীয় আড়ৎসহ রাজধানীর আড়তের কমিশন ব্যয়। অন্যদিকে পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজারে পণ্য পৌঁছাতে প্রতি কেজিতে স্বাভাবিকের থেকে বাড়তি ব্যয় হয় আরও ৫ থেকে ৭ টাকা। ফলে ১০ টাকার প্রতিকেজি বেগুন ক্রেতাকে কিনতে হয় ১শ’ টাকার উপরে।
তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, সবজির দাম বাড়লেও তাদের মুনাফা বাড়েনি। কারওয়ান বাজারের খুচরা বিক্রেতা মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ৮০ টাকা দরে বেগুন বিক্রি করলে যে পরিমাণ লাভ হয়, দেড়শ’ টাকা বিক্রি করলেও একই লাভ হয়।
রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বর পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ী মেজবাহ উদ্দিন জানান, কুষ্টিয়া থেকে এক ট্রাক সবজি পরিবহণে ব্যয় হয় প্রায় ১৮ হাজার টাকা। এর বাইরে রশিদের মাধ্যমে বিভিন্ন পয়েন্টে দিতে হয় আর ৩ হাজার টাকা। সবশেষ রাজধানীর পাইকারি বাজারে দিতে হয় আরও ১ হাজার টাকা। অন্যদিকে স্থানীয় বাজারে কয়েক হাত ঘুরে সবজি আড়তে আসে। ফলে সেখানেও কয়েক ধাপে দাম বৃদ্ধি পায়। ফলে ১০ টাকা কেজির পটোল রাজধানীর পাইকারি বাজারে এসে ৬০ টাকায় বিক্রি হয়। যা আবার ২০ টাকা বেড়ে খুচরা বাজারে ৮০ টাকা বিক্রি হয়।
খুচরা বিক্রেতারা জানান, পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজারে সবজি আনতে প্রতি ভ্যানে ব্যয় হয় দূরত্বভেদে ৫শ’ থেকে ১ হাজার টাকা। এছাড়াও ভ্যানের সিরিয়ালে ব্যয় হয় আর ১শ’ টাকা। এমনকি খুচরা বাজারে ভাড়ার পাশাপাশি দিতে হয় দৈনিক চাঁদা। কল্যাণপুর কাঁচাবাজারের সবজি বিক্রেতারা জানান, পরিবহণ ও স্থান ভাড়া ছাড়াও তাদের প্রতিদিন বাড়তি দিতে হয় আরও ২শ’ টাকা।
এদিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ২ মাস ধরে সাড়ে ১২ শতাংশের উপরে রয়েছে, যা গত ১১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। দেখা গেছে, মুদ্রাস্ফীতি ও বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের কারণে কৃষক ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে অন্যদিকে আয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ খাদ্যে ব্যয় করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। কিন্তু মুনাফা লুটে নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘দেশের বাজার ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে যেন মধ্যস্বত্বভোগীদের জন্য। এখানে কৃষক ও ভোক্তার স্বার্থ সব সময় উপেক্ষিত থাকে। তা না হলে, ১০ টাকার বেগুন কীভাবে ১৪০ টাকায় বিক্রি হয়। কিন্তু কেউ কিছুই বলছে না। নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর ন্যূনতম সদিচ্ছা থাকলে বাজারে এই অরাজকতা থাকত না।’
তিনি বলেন, ভোক্তা ও কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় উদ্যোগ নিতে হবে। কিন্তু এমন কোনো লক্ষণ সরকারের নেই। এছাড়াও কৃষককে দেয়া বিভিন্ন সুযোগ–সুবিধা যেমন কৃষি ঋণ ও প্রণোদনা অর্থ স্বচ্ছতার সঙ্গে বিতরণ প্রয়োজন। তা না করা হলে কৃষক বাঁচবে না। তখন সব কিছুই আমদানি করতে হবে। অন্যদিকে ভোক্তার স্বার্থে আইনের প্রয়োগ বাড়াতে হবে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা প্রয়োজন।