‘বাড়ীর পাশে আরশীনগর সেথা একঘর পড়শী বসত করে, আমি একদিনও না দেখিলাম তাঁরে..’ ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়..’ কিংবা ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে, লালন বলে জাতের কী রূপ দেখলাম না এ নজরে..’। এমনই অসংখ্য সব মরমি গানের স্রষ্টা, আধ্যাত্মিক সাধক বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ’র ১৩৩তম তিরোধান বা মৃত্যু দিবস পয়লা কার্তিক আজ। লৌকিক বাংলার কিংবদন্তি সাধক লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালনের আখড়াবাড়ি চত্বরে বসছে জমজমাট সাধুরহাট। ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি..’ লালনের অমর এ বাণীকে স্মরণ করে দিনটি পালন উপলক্ষে এবারও লালনের চারণভূমি কুষ্টিয়ায় আয়োজন করা হয়েছে ১৭ থেকে ১৯ অক্টোবর তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠান।
এ অনুষ্ঠানকে ঘিরে পুরো ছেঁউড়িয়া গ্রাম এখন উৎসবের পল্লি। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা এবং লালন একাডেমির আয়োজনে প্রতিদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে অনুষ্ঠানে থাকছে লালন মেলা, লালনের জীবনদর্শন ও স্মৃতিচারণমূলক আলোচনা ও লালন সংগীতানুষ্ঠান। ১ কার্তিক মঙ্গলবার সন্ধ্যালগ্নে ‘রাখাল সেবা’র মধ্য দিয়ে শুরু হবে সাধুদের দেড় দিনের মূল উৎসব। চলবে ৩ কার্তিক বৃহস্পতিবার বিকেলে ‘অষ্টপ্রহর সাধুসংঘ’ বা ‘পুণ্য সেবা’ গ্রহণ পর্যন্ত। লালন একাডেমি ও জেলা প্রশাসন দিনটিকে মৃত্যুবার্ষিকী, তিরোধান বা প্রয়াণ দিবস হিসেবে পালন করে। তবে লালন ভক্ত–অনুরাগী, সাধু–গুরু–গোঁসাইরা দিনটিকে পালন করেন ‘উফাত দিবস’ হিসেবে। লালনের এ উৎসবকে কেন্দ্র করে সাধু–ভক্তদের মিলন মেলায় পরিণত হচ্ছে ‘আখড়াবাড়ি’।
এদিকে ‘উফাত দিবস’ উপলক্ষে সাঁইজির টানে মানুষ দলে দলে ছুটে আসছেন লালনধামে। যেখানে মিলন ঘটতে যাচ্ছে, নানা ধর্ম ও বর্ণের মানুষের। তাদের কণ্ঠ ধ্বনিত–প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সাঁইজির অমরবাণী–মরমি সংগীত, ‘বাড়ীর পাশে আরশীনগর সেথা একঘর পড়শী বসত করে, আমি একদিনও না দেখিলাম তাঁরে..’ কিংবা ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে..’ আধ্যাত্মিক সব গান। সাধুসঙ্গের নিয়ম সম্পর্কে সাধুদের একাধিক সূত্র জানায়, শ্রদ্ধাভরে দিনটি স্মরণ করতে প্রথম দিন মঙ্গলবার বিকেলের মধ্যেই সাধু–গুরু (খেলাফতধারী) তাদের সেবাদাসী এবং লালন ভক্ত অনুসারীদের সঙ্গে নিয়ে সাঁইজির পুণ্যভূমি ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে নিজ নিজ পাটে (আসন) বসবেন।
একমাত্র খেলাফতধারী সাধু–গুরু ছাড়া ভক্ত–অনুসারীরা কেউ ‘আসনে’ বসার যোগ্যতা রাখেন না। ভক্ত–অনুসারীরা বসবে সাধু–গুরুর আশপাশে। আসনে বসা সাধু–গুরুদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ভক্তি–শ্রদ্ধার বিষয়। এই আসনে বা পাটে বসার সুনির্দিষ্ট কোনো নিয়ম নেই। যার যেমন সামর্থ্য অনুযায়ী কেউ সাদা বা রঙিন কাপড়ের টুকরার ওপর, কিংবা শীতল পাতার মাদুর, এমনকি গামছা বিছিয়েও বসতে পারেন। সাধুসঙ্গের নিয়ম অনুযায়ী লগ্ন আসে সন্ধ্যার পর। পাটে বসে ‘রাখাল সেবা’ গ্রহণের পর থেকে ২৪ ঘণ্টার অষ্টপ্রহর সাধুসঙ্গের আগ পর্যন্ত সাধু–গুরু তাদের ভক্ত–শিষ্যদের নিয়ে ধ্যানে বসে তপজপ করেন। তবে লালন একাডেমির অনুষ্ঠান তিনদিন হলেও সাধুদের মূল অনুষ্ঠান দেড়দিনেই শেষ হয়ে যায়।
মঙ্গলবার সন্ধ্যালগ্নে ‘রাখাল সেবা’ অর্থাৎ মুড়ি, চিড়া, খাগড়াই মিশ্রিত শুকনা খাবার গ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হবে এবং শেষ হবে বৃহস্পতিবার বিকেলে ‘অষ্টপ্রহর সাধুসংঘ’ বা ‘পুণ্য সেবা’ গ্রহণের মধ্য দিয়ে। পুণ্য সেবায় সাধুদের খেতে দেওয়া হয় মাছ, ভাত, সবজি বা ঘন্ট, ডাল আর দই। এই সেবা গ্রহণের মধ্য দিয়ে শেষ হবে বাউলদের ‘অষ্টপ্রহরের সাধুসংঘ’ এবং ভেঙে যাবে সাধুর হাট। তখন সাঁইজির পুণ্যভূমি ছেড়ে নিজ নিজ আশ্রমের দিকে চলে যেতে শুরু করবেন সাধুরা। লালন একাডেমি সূত্র জানায়, লালনের সাধন–ভজনের তীর্থস্থান এখন উৎসবমুখর। সাধু–গুরু, বাউল–বাউলানী, ভক্ত–অনুসারী ও দর্শক–শ্রোতার পদচারণায় মুখরিত লালনের আখড়াবাড়ি। বসেছে সাধুদের মিলনমেলা।
ছোট ছোট কাপড়ের টুকরার ওপর, শীতল পাতার মাদুর, এমনকি মাটিতে গামছা বিছিয়ে বসেছে খণ্ড খণ্ড গানের আসর। ছোট ছোট দলে দলে বিভক্ত হয়ে একতারায় লালনের গানের সুর তুলছেন শিল্পী–ভক্তরা। প্রথমদিন সন্ধ্যায় লালন একাডেমির সভাপতি ও কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক মো. এহেতেশাম রেজার সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ এমপি। এই উৎসবকে সফল করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সবরকম প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে জনকণ্ঠকে জানান, লালন একাডেমির সভাপতি ও কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক মো. এহেতেশাম রেজা। তিনি বলেন, ‘সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুরো এলাকা সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে।
পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে অনেকগুলো টিম গঠন করা হয়েছে। একাধিক স্বেচ্ছাসেবক টিমও গঠন করা হয়েছে।’ কুষ্টিয়া পুলিশের এডিশনাল এসপি ক্রাইম পলাশ কান্তি নাথ বলেন, ‘অনুষ্ঠানকে ঘিরে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে নিñিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সামনে নির্বাচন তাই আমরা কোনো অবহেলা বা রিস্ক নেব না। কোনোরকম নিরাপত্তা বিঘিœত না হয় তার জন্য মঞ্চ, আশপাশ ও লালনের মাঠে নিরাপত্তা তল্লাশি ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে পারবে না।’ লালনের তিরোধান দিবসকে ঘিরে দেশের দূর–দূরান্ত থেকে নারী–পুরুষ সমন্বয়ে গুরু, শিষ্য, লালনভক্ত–অনুসারীরা ছুটে আসছেন সাঁইজির পুণ্যভূমি ছেঁউড়িয়ায়। তাদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে আখড়াবাড়ি চত্বর।
লালন একাডেমির সাবেক সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) সেলিম হক বলেন, প্রতিবারের মতো এবারও বাউলদের অর্ধাবাস, বাল্যসেবা ও পুণ্যসেবা’র ব্যবস্থা করা হয়েছে লালন একাডেমির পক্ষ থেকে। আধ্যাত্মিক সাধক লালন ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর বাংলা ১২৯৭ সালের ১ কার্তিক ১১৬ বছর বয়সে দেহত্যাগ করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি শিষ্য–ভক্ত পরিবেষ্টিত থেকে গান–বাজনা করেন। লালন আজ নেই। কিন্তু রয়ে গেছে তাঁর অমর সৃষ্টি। যার মধ্য দিয়ে তিনি বেঁচে আছেন এবং বেঁচে থাকবেন বাঙালির মরমি মানসপটে।