ডব্লিউএইচও’র মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস বুধবার (৬ সেপ্টেম্বর) এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, বাংলাদেশে এপ্রিলে প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে ডেঙ্গুতে অন্তত ৬৫০ জন প্রাণ হারিয়েছে। এর মধ্যে শুধু আগস্টেই মারা গেছেন ৩শ’ জন। একই সময়ে আরও ১ লাখ ৩৫ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন ডেঙ্গুতে।
এদিকে হাসপাতালগুলোর ডেঙ্গু ওয়ার্ডে বিপুল সংখ্যক রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক–নার্সেরা। হাসপাতালগুলোতেও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। তবে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক রোগী ভর্তি হয়েছে মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে।
চলতি সপ্তাহে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ‘বিপুল সংখ্যক’ ডেঙ্গু রোগির এমন সংক্রমণ বাড়ায় স্বাস্থ্য খাতের ওপর চাপ বেড়েছে।
বুধবার (৬ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় (গতকাল মঙ্গলবার সকাল আটটা থেকে আজ বুধবার সকাল আটটা পর্যন্ত) ডেঙ্গুতে ঢাকায় ১০ জন ও ঢাকার বাইরে ৪ জন মারা গেছেন। এ সময় ডেঙ্গু নিয়ে ২ হাজার ১১৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ৮৩৩ এবং ঢাকার বাইরের হাসপাতালগুলোয় ১ হাজার ২৮২ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
চলতি বছর ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে মোট ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ২২ জন। তাঁদের মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ৬৩ হাজার ২৭৩ এবং ঢাকার বাইরে ৭৪ হাজার ৭৪৯ জন রয়েছেন।
দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড হয়েছিল গত বছর—২৮১ জন। চলতি বছর অনেক আগেই সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এ ছাড়া ডেঙ্গুতে ২০১৯ সালে মৃত্যু হয়েছিল ১৭৯ জনের। ২০২০ সালে ৭ জন এবং ২০২১ সালে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় ১০৫ জনের।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) মেডিকেল কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার টেলিগ্রাফকে বলেন, ‘অনেক রোগী মেঝেতে ঘুমাচ্ছেন, অনেক রোগী এবং শয্যা খুব কম। ঢাকাজুড়ে একই অবস্থা। খুবই কঠিন মুহূর্তে রয়েছি।’
এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, চলতি বছর ছিল ‘অস্বাভাবিক’। আক্রান্তের সংখ্যা শুধু শুরুর দিকেই শুরু হয়নি, এটি শহর ছাড়িয়ে বাংলাদেশের সব জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। এবং শূন্য দশমিক ৪৮ শতাংশ, মৃত্যুর হার আগের পাঁচ বছরের গড় শূন্য দশমিক ২৯ শতাংশের তুলনায় বেশি।
আইসিডিডিআরবি‘র স্বাস্থ্য গবেষণা কেন্দ্রের সংক্রামক রোগ ইউনিটের বিজ্ঞানী ডাঃ মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, আমাদের হাসপাতাল গুলোতে বেড সীমিত, চিকিৎসক সীমিত, নার্স সীমিত। হঠাৎ রোগীদের এমন চাপ হলে পুরো হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসা সামগ্রীর ওপর প্রভাব পরে। ডেঙ্গুর এমন এমন পরিস্থিতি পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলেছে।
পরিস্থিতি করোনা পরিস্থিতিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে গত মাসেই সতর্ক করেছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষ এখন ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে রয়েছে। কেন ডেঙ্গুর এ প্রকোপ–তার কারণ সম্পর্কে সংস্থাটি জলবায়ু পরিবর্তনের দিকেই ইঙ্গিত করেছে। বিশ্বব্যাপী গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপগ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ুতে ডেঙ্গুর এ প্রাদুর্ভাব। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মধ্যে মালয়েশিয়ায় ৪৪ হাজার, ফিলিপাইনে ৪০ হাজার, শ্রীলঙ্কায় ৩৭ হাজার, ভিয়েতনামে ৩২ হাজার রোগী শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি সিঙ্গাপুর, আফগানিস্তান, লাওস, কম্বোডিয়া, চীন, অস্ট্রেলিয়া, ফিজি, মালদ্বীপসহ অন্তত ১০০টি দেশে ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে।
১৯৭০–এর দশকে, এটি মাত্র নয়টি দেশে ছিল ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব। এখন, নগরায়ণ, আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে, আরও অনেকে দেশে এটি দেখা দিয়েছে।