রোগীর চাপে বেসামাল হয়ে পড়েছে যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা। শয্যার চেয়ে দেড় গুণ রোগীতে নাস্তানাবুদ অবস্থা চিকিত্সক, নার্সসহ সংশ্লিষ্টদের। হাসপাতালের এমন নাজুক অবস্থায় চিকিৎসা নিতে এসে রোগী ও তাদের স্বজনরাও দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, হাসপাতালের অভ্যন্তরে স্বাভাবিক চলাচলেরও জায়গা নেই। বারান্দা থেকে করিডর, সিঁড়ি সবখানেই রোগীতে ঠাসা। নারী মেডিসিন ওয়ার্ডের অবস্থা সবচেয়ে করুণ। সেখানে শয্যার চেয়ে ১১ গুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে করোনাকালীন একটি টিনশেডে ঘরে ৩০ জন রোগীর বিছানার ব্যবস্থা করার কাজ চলছে, যদিও এটা ফ্লোরে।
গত বৃহস্পতিবার ২৫০ শয্যার হাসপাতালে রোগী ভর্তি ছিল ৬৭৬ জন। গত জুন মাস থেকে রোগীর চাপ শুরু হয়েছে। এরমধ্যে মহিলা ও মেডিসিন ওয়ার্ডে গড়ে ১২০ জন করে রোগী ভর্তি থাকছেন। ওয়ার্ড দুটিতে অতিরিক্ত রোগী ও স্বজনদের উপস্থিতিতে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এতে চিকিৎসাসেবা। তবে অতিরিক্ত রোগী ভর্তি হওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে হাসপাতালের অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া আয়া, ওয়ার্ড বয় ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের পোয়াবারো। সেবা দেওয়ার বাহানায় দেদারসে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে তারা। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হারুন অর রশিদ বলেন, কী করে সম্ভব বলেন, এত রোগীর চাপ সামলানো! তিন জন সিস্টার কী করে পারবে ১২০ জন রোগীকে সামাল দিতে? মহিলা ও মেডিসিন ওয়ার্ডে সবচেয়ে বেশি পীড়াদায়ক অবস্থা। আমরা দিশেহারা হয়ে যাচ্ছি। রোগীর কেন এত চাপ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জুন থেকে সেপ্টেম্বর আবহাওয়াগত কারণে রোগীর চাপ বেশি থাকে। গরম এখানে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। শীতে কিন্তু রোগী কমে যায়।
একই কথা বলেন সিভিল সার্জন ডা. বিপ্লব কান্তি বিশ্বাস ও ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুস সাদেক রাসেল। তারা বলেন, গরমে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়ার প্রকোপ বেড়ে যায়। সিজন চেঞ্জের সময়ও গ্রোআপ বেশি হয়। এজন্য শীতপ্রধান দেশের তুলনায় আমাদের অসুস্থতার হার বেশি।
আউটডোরেও বেসমাল অবস্থা :ভর্তি রোগীর পাশাপাশি হাসপাতালে রয়েছে ১৬টি বিভাগ বর্হিবিভাগ। এখানকার অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। ২ হাজারের বেশি রোগী দেখেন চিকিত্সকরা। ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী বিনা মূল্যে ওষুধও দেওয়া হয় হাসপাতাল থেকে। এজন্য গরিব মানুষরা দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসেন চিকিৎসার ভরসাস্থল হিসেবে সুপরিচিত ২৫০ শয্যা হাসপাতালে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হারুন অর রশিদ বলেন, অর্থোপেডিক্সে দুই জন এবং মেডিসিনে চার জন চিকিত্সক বসেন আউটডোরে। এই দুই বিভাগে ৭০০–৮০০ করে রোগী আসেন চিকিৎসা নিতে। অর্থোপেডিক্সে তো এক জন ডাক্তারকে ৪০০ পর্যন্ত রোগী দেখতে হয়। কীভাবে সম্ভব বলেন!
ঘরে ঘরে জ্বরের রোগী :যশোরের ঘরে ঘরে এখন জ্বরের রোগী। প্রতিদিনই শত শত মানুষ জ্বরের লক্ষণ নিয়ে সরকারি হাসপাতালগুলোতে ছুটছেন। ইনফ্লুয়েঞ্জা, সর্দিজ্বরের পাশাপাশি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তের হারও চাপ তৈরি করছে চিকিৎসাসেবায়। যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে বর্হিবিভাগে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগীদের বড় অংশেরই মধ্যে জ্বরের রোগীরা রয়েছে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হারুন অর রশিদ জানান, হাসপাতালে ডেঙ্গু জ্বরের সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা জ্বরের রোগীও প্রচুর আসছে। প্রতিদিন বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেওয়া রোগীর দশ ভাগের বেশি জ্বরের রোগী। তাদের যথাযথ চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে। প্রয়োজনমাফিক ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হচ্ছে। এছাড়া চিকিত্সকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরনের ওষুধ সেবন না করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুস সাদিক রাসেল বলেন, যশোরে ডেঙ্গু আক্রান্তের প্রবণতা থাকায় জ্বরের রোগীদের তৃতীয় দিনে এনএস–১ পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়ার জন্য পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আর সাধারণ জ্বরে আক্রান্ত অসুস্থ ব্যক্তিকে শুধু প্যারাসিটামল সেবন এবং চিকিত্সকের পরামর্শ ছাড়া অন্য কোনো ওষুধ না খাওয়ার জন্য বলা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে পানি, তরল খাবার এবং ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।