খোদাবন্দ হযরত ঈসা কালেমাতুল্লাহ তদানীন্তন সমাজপতি আলেম ও ফরিসীদের লক্ষ্য করে ধিক্কারের সুরে একটি কথা বলেছেন, ধর্মের অযুহাতে তারা সাধারণ মানুষের কাঁধে দুর্বিসহ বোঝা চাপিয়ে দিয়ে রেখেছে, অথচ নিজেরা আঙ্গুল দিয়েও তা ছুয়ে দেখে না (মথি ২৩ অধ্যায় ৪পদ)।
বর্তমান বাংলাদেশে শিক্ষামন্ত্রণালয় একটি অভিনভ উপায় চালু করতে যাচ্ছে; যা হবে শিক্ষার নামে কচিকাচাদের উপর বহনের অধিক বোঝা অপসারণ করে দেয়া। যে বিষয়গুলো নেহায়েত অত্যাবশ্যক কেবল সেগুলোকেই পাঠ্যক্রম হিসেবে মনোনয়ন করা; ফলে তারা সাচ্ছন্দে শিক্ষা-দীক্ষায় বৃদ্ধি পেতে পারবে।
কলোনির শিক্ষা ব্যবস্থা আর স্বাধীন সার্বভৌম দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য থাকতে হবে। ২০০ বৎসর বৃটিশ কলোনী থেকে উত্তরণ ঘটে পাকিস্তানী কলোনী প্রায় ২৫ বৎসর পুরো সময়টা জুড়ে দাসত্বের বোঝা আমাদের বহন করতে হয়েছে।
যেকোনো ফার্মেসীতে অনেক ধরণের ঔষধ থাকে, তাই বলে একজন রোগীর সুস্থ্য হবার জন্য মাত্র ২/১টি ঔষুধের প্রয়োজন পড়ে। বলতে পারেন রোগীর জন্য যে কোন ঔষধ প্রয়োজন পড়বে তা তো বিজ্ঞ চিকিৎসক নির্ধারণ করে দিবেন।
মানব জাতির ইতিহাস শুরু হয়েছে প্রথম মানুষ হযরত আদম থেকে। কালামের আলোকে দেখা যায়; অদৃশ্য সার্বভৌম খোদা নিজের সুরতে স্বীয় প্রতিনিধি করে নিজ হাতে মাত্র একজন আদম সৃষ্টি করলেন, তাকে দোয়া করলেন, ক্ষমতা দিলেন প্রজাবন্ত ও বহুবংশ উৎপন্ন করে সৃষ্ট বিশ্ব ভরে তুলবে, ভোগদখল করবে এবং বাতেনী খোদার মহিমায় নিজেদের জীবন আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ ও প্রতিষ্ঠা করবে খোদার মনোবাসনা। জনমনে থাকবে সুখ, শান্তি ও ভ্রাতৃপ্রেম যা হবে খোদার সৃষ্টির মহান পরিকল্পনা।
দুঃখজনক হলেও সত্য ও বাস্তবতা; মানুষ খোদার দুষমন ইবলিসের মন্ত্রে হলো প্রতারিত; খোদার কথায় স্থির থাকতে আর পারলো না, হলো খোদাদ্রোহী, নিজেদের পায়ে হানল কুঠারাঘাত; ঐশি প্রাধিকার হারিয়ে পথের ফকিরে পরিণত হলো; পারষ্পারিক মধুর সম্পর্কের পরিবর্তে সাপ নেউলে পরিণত হল। মানুষের হাতে মানুষ হল কতল যা আজ পর্যন্ত উম্মাদবেগে গোটা বিশ্ব, নগর-জনপদ বিরান হয়ে চলছে।
আদম কুলে আর কাওকে খুঁজে পাওয়া গেল না, যে কিনা নির্দোষ অথবা ইবলিসের কুপ্রভাব থেকে থাকতে পেরেছে মুক্ত। কালামে তাই পরিষ্কার বর্ণীত রয়েছে, সকলেই পাপ করেছে এবং খোদার গৌরব নষ্ট করেছে (রোমীয় ৩ অধ্যায় ২৩)।
কালের স্তুপিকৃত পুথি পুস্তক পর্যালোচনা করে যে সারমর্ম খুঁজে পাওয়া যায়, তাহলো, মানুষের এহেন করুন দশা থেকে তথা আজন্ম লালিত পাপের গøানী থেকে অবমুক্ত করার উপায় কারো হাতে নেই। পাপ হলো ঋণ যা কোনো গুনাহগারের পক্ষে পরিশোধ করা আদৌ সম্ভব নয়। আদম থেকে অদ্যাবধি এমন কেউ নেই যে দাঁড়িয়ে বলতে পারে, সে নিজেকে ঋণমুক্ত বা পাপমুক্ত করতে পেরেছে। পাককালামে যথার্থ বর্ণীত রয়েছে, মানুষের ধার্মিকতা খোদার কাছে অথবা খোদার পরিবত্রতার তুলনায় ঘৃণীত ন্যাকড়াতুল্য। খোদা যথার্থ বলেছেন, তিনি পবিত্র, তাই তার সাথে যুক্ত হতে চাইলে ব্যক্তিকে অবশ্যই পূতপবিত্র হতে হবে (লেবীয় ১১ : ৪৪)। অবশ্য খোদা হলেন এক রূহানী সত্ত্বা; তাই তাঁর এবাদত আদায় করতে হবে রূহানী পর্যায়ে উপনীত হয়ে এবং পরিপূর্ণ সত্যে বসমবাস করে (ইউহোন্না ৪ : ২৪)। খোদা হলেন প্রেম, সুতরাং যিনি খোদার সাথে মধুময় সম্পর্ক স্থাপন করার আন্তরিক আগ্রহ পোষণ করেন, হৃদয়ে তাঁর অবশ্যই থাকতে হবে প্রেম; জানেন তো, হিংসা আর প্রেম এক হৃদয়ে বাস করতে পারে না; যেমন মিষ্টিজল আর তেতোজল একউ উৎস ও শ্রোতোধারা থেকে প্রবাহিত হতে পারে না। যে হৃদয়ে ইবলিস জুড়ে রেখেছে তার মধ্যে পাকরূহের বাস সম্ভব হবে কি করে?
কালামপাকে খোদা অবশ্য অভয়বাণী ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি আমাদের কলুষিত হৃদয তাঁর পূতপবিত্র হৃদয় দিয়ে প্রতিস্থাপন করে দিবেন; ফলে আমাদের হবে নতুন জন্য। ঠিক তখন আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে নতুনভাবে খোদাই জীবন-যাপন করা। কালামপাকে যথার্থ ঘোষণা দেয়া হয়েছে, যদি কেউ মসিহের সাথে যুক্ত হয় তবে সে এক নতুন মানুষে হলো পরিণত (২করিন্থীয় ৫ অধ্যায় ১৭ থেকে ২১)।
প্রিয় ভ্রাতা, এই নতুনত্ব হলো তার হৃদয়ের পরিবর্তন; তাঁর চাওয়া পাওয়ার পরিবর্তন, ধ্যান মননের পরিবর্তন; এই পৃথিবীতে সে যে একজন প্রবাসী তা ব্যক্তি সম্যক উপলব্ধি করতে সক্ষম হতে পেরেছে। সে বুঝতে পেরেছে তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার সাথে সাথে তাকে সরিয়ে ফেলা হবে সমাজ থেকে। এবং যত দ্রুত সম্ভব লাশটি সরানো যায় তেমন প্রচেষ্টা সকলে নিয়ে থাকে। কোনো মুমুর্ষ ব্যক্তির জন্য কেউ প্রাণ দেয় না। যমুনা বসুন্ধরা কোম্পানীর মালিক ধনকুবের বাবুল মিয়া করোনাঘাতে মৃত্যু বরণ করেন; হাসপাতালে থাকাকালীন তার আত্মজা কেউই তাকে দেখতে যায় নি। সে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্য। তবে একথাও মনে রাখতে হবে, কোনো মানুষ কোনো মানুষের কোনো কাজে আসে না, কেননা সকলেই পাপ করেছে এবং জামিনদার হবার বা সুপারিশ করার অধিকার হারিয়ে ফেলেছে। সুপারিশ করার জন্য ব্যক্তিকে অবশ্যই হতে হবে সম্পূর্ণ বেগুনাহ। মানবের প্রতি প্রেমের আধিক্যে মাবুদ মাওলা নিজেই তেমন এক ব্যক্তিকে জগতে প্রেরণ করলেন; স্বীয় কালাম ও পাকরূহের মাধ্যমে, মানবরূপে।
মানুষকে বাঁচানোর রহস্য রয়েছে এখানেই লুকায়িত। অবশ্য আদমের অবাধ্যতা ও পতনের সাথে সাথে তিনি তেমন এক ঘোষণা দিয়েছেন যা আমরা দেখতে পাই পয়দায়েশ তৃতীয় অধ্যায় পনেরো পদে। ইবলিসের মস্তক চূর্ণ-বিচূর্ণ করার এবং মানবজাতিকে পাপের গ্লানী থেকে অবমুক্ত করার অমোঘ ঘোষণা রয়েছে উক্ত ভবিষ্যদ্বাণীর মধ্যে।
প্রিয় শুধী, বিশ্বচরাচর এবং মানুষ সৃষ্টির বিষয় নিয়ে খোদার যে সুমহান পরিকল্পনা রয়েছে তা জানার কি কোনো কুতুহল আপনার হৃদয়াভ্যন্তরে অনুভব করেন। তেমন অনুভূতির জন্য আপনাকে বিশারদ পন্ডিত হতে হবে না। খোদার প্রতি বিশ্বাস ভক্তি ভালোবাসা থাকাটাই হলো প্রধান সূত্র। খোদা হলেন এক রূহানী সত্ত্বা, যিনি থাকেন সর্বত্র বিরাজমান; অবশ্যই তিনি সর্বদর্শী ও কুদরতের কাজ করেন মানুষকে বাঁচিয়ে তোলেন বিপন্ন দশা থেকে। আচমকা বিপদে পড়ার সাথে সাথে স্বতস্ফুর্তভাবে মানুষ তাঁর নাম মুখে নেয়, এবং তা নিজ মাতৃভাষায়।
খোদা মানুষ সৃষ্টি করেছেন। যদিও পাপ ও ভ্রান্তির কারণে মানুষ পরষ্পর থেকে আজ বহুদূরে সরে গেছে, তবুও তারা মৌলিক দিক দিয়ে মানুষ্ই রয়ে গেছে এবং আমৃত্যু তারা মানুষই থাকবে। মানুষের মধ্যে বৈষম্য কেবল অর্থ-বিত্ত, শিক্ষা-দীক্ষা, পেশা-আভিজাত্য তথা মনুষ্যকল্পিত ক্ষণস্থায়ী ধারণা সমূহ মানুষ থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়। যে শিক্ষা মানুষকে মানুষ থেকে দূরীকৃত করে সে শিক্ষা অবশ্যই হবে কুশিক্ষা। তেমনি মিথ্যা দম্ভ মানুষকে শুধুই কষ্ট দেয়। ধর্মীয় বাণী এক্ষেত্রে ঘোষিত হয়েছে মানুষের মধ্যে মিলন ও ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি ও প্রতিষ্ঠার জন্য। মানুষ মানুষকে প্রেম করবে যা বয়ে আনে ধর্মের উৎকর্ষতা।
বেগুনাহ মেষ নামে খ্যাত খোদাবন্দ হযরত ঈসা মসিহ প্রেমের তাগিদে নিজের পূতপবিত্র প্রাণ পর্যন্ত দিলেন কোরবান; মানুষের পাপের কাফফারা পরিশোধ করার জন্য তথা বিচ্ছিন্ন বিবদমান মানুষকে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ত্বে উপনীত করার জন্য; কেবল বিশ্বাসহেতু আজ সকলেই পেয়ে গেল খোদার সাথে পুনর্মিলনের একক সুযোগ। অনেকেই নিজেদের কিতাবী সম্প্রদায় বলে দাবি করে থাকে, তাদের কাছে কিতাবের বয়ান নিয়ে প্রশ্ন করা হলে কোনো সদুত্তর দিতে পারে না।
এক হাতে তথাকথিত কালাম আর এক হাতে শানীত তরবারি যা হলো ধর্মের বিকাশ। খোদা মানুষ রক্ষা করেন আর অভিশপ্ত ইবলিস করে মানুষ কচুকাটা, যা ভক্তবৃন্দগণ অবম্যই বুঝে নিবেন।
আমাদের সমাজ অবশ্যই সুশিক্ষিত হবে এবং উক্ত অর্জীত শিক্ষা নিজেদের জীবনে প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন করে সমাজে ফিরিয়ে আনবে মিলন ও ভ্রাতৃত্ব, সার্বিক শিক্ষার যা হবে একক অভিপ্রায়। যদিও আজ মানুষ মিথ্যাচার ও অন্ধকার অশিক্ষা কুশিক্ষার মধ্যে তালগোল পাকিয়ে দিশেহারা, তবুও তাদের জন্য সুনিশ্চিত রয়েছে পুনরায় মানুষ এবং খোদার নয়নের মণিতুল্য হবার একক উপায় যা কেবল খোদার অনুপম ব্যবস্থায় বিশ্বাস স্থাপনের মাধ্যমে হবে সহজলভ্য। কোনো খুনি নরঘাতকের উপর আস্থা স্থাপনের কথা বলা হয় নি। ব্যক্তি জেনেশুনে নিজেই নিজের সিদ্ধান্ত বেছে নিবেন যা কারো অনুরোধে লাভ হবার নয়। ব্যক্তির হৃদয় মন জুড়ে উদয় হবে তেমন এক মহার্ঘ উপলব্ধি, যা ব্যক্তির তনুমনে দৃষ্ট হবে পরিবর্তনের প্রভাব। বিষয়টি হলো খোদ পাককালাম ও পাকরূহের প্রভাব। তখনই ব্যক্তি পৌছে যেতে শুরু করে পূর্ণ সত্যের অভিমুখে। আর তা সম্ভব হয়ে ওঠে পাকরূহের অভিশেকে ফলে (ইউহোন্না ১৬ অধ্যায় ১৩)।
প্রিয় পাঠক, আপনি কি জানেন কে কোন কারণে আপনাকে সৃষ্টি করেছেন এবং এতদূর পর্যন্ত বহন করে আসছেন? মাবুদ বলেন, কেবল কল্যাণের জন্যই তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন (যিরিমীয় ২৯ অধ্যায় ১১ পদ)। খোদার মহব্বত থেকে আপনি কি পালাতে চাচ্ছেন? তেমন চিন্তা হবে ক্ষণিকের ভ্রান্তি; পরক্ষণেই পস্তাতে হবে। যেমন আমার লেখা একটি গানে রয়েছে, “প্রভুর ছিলাম, প্রভুর হলাম, মাঝখানে দু’দিন জ্বলে পুড়ে মরলাম”। ঠিক আমিও জ¦লেছি অবর্ণনীয় জ্বালায়; অবশ্য এই বৃদ্ধ বয়সেও অথর্ব দেহ বিপাকে ফেলতে চায়, তবে জোড় বরাত হলো, অতি উচ্চ মূল্যে অর্থাৎ তাঁর রক্তের মূল্যে তিনি আমাকে কিনে নিয়েছেন; ফলে আমি আজ তাঁর বাহুবন্ধনিতে রয়েছি সুরক্ষিত (রোমীয় ৮ : ৩১-৩৪)।
যতদিন অন্ধ ছিলাম ততদিন বুঝতে অক্ষম ছিলাম, আমি কার, আর কে আমার। মাবুদের বয়ান ছিল আমার কাছে অনাগ্রহের কারণ; যেমন জন্মান্ধের কাছে পাতাবাহারের রংরূপ কি পারে কোনো অনুভুতি সৃষ্টি করতে? যিনি চক্ষুষ্মান, তিনি উক্ত পাতাবাহার মূল্য দিয়েও সংগ্রহ করে।
প্রত্যেকটি মানুষের কাছে ঐশি কালাম হলো জীবন বিধান, খোদা আদমের নাশিকায় যে রূহ (প্রাণ বায়ু) ফুকে দিয়েছিলেন, ফলে মাটির মূর্র্তী পরিণত হলেন প্রজ্ঞাময় ঐশি প্রতিনিধি। ঠিক একইভাবে ভীত সন্ত্রস্থ সাহাবীদের উপর মসিহ যখন পাকরূহ ফুঁকে দিলেন অমনি তারা রূপান্তরিত হলেন অকুতোভয় বিশ্ববিজেতা পরাশক্তিতে; যাদের প্রথম দিনের ভাষণে তিন হাজার ব্যক্তি মুক্তি পেল, ফিরে পেল জীবন ও হারানো অধিকার (প্রেরিত ২ : ২)। প্রত্যেক মানুষের রয়েছে জন্মাধিকার অর্থাৎ জন্মাধিকার সূত্রে সকল মানুষ খোদার সুরতে গড়া (পয়দায়েশ ১ অধ্যায় ২৬ থেকে ২৮)।
কেবল ইবলিসের কুটচালে ধরা খেয়ে হয়েছে বিনষ্ট। খোদার অশেষ রহমতে ঈসা মসিহের কোরবানির উপর বিশ্বাস স্থাপনের ফলে প্রত্যেকে ফিরে পেল উক্ত হারানো অধিকার; মসিহের মাধ্যমে আজ আমরা হতে পেরেছি খোদার রূহানী সন্তান; পেয়েছি পবিত্রতা, ধার্মিকতা ও মুক্তি। “মসিহ ঈসার সংগে তোমরা যে যুক্ত আছ তা আল্লাহ থেকেই হয়েছে। ঈসা মসিহই আমাদের কাছে আল্লাহর দেওয়া জ্ঞান; তিনিই আমাদের ধার্মিকতা, পবিত্রতা ও মুক্তি। এজন্য পাক-কিতাবের কথামত, “যে গর্ব করে সে মাবুদকে নিয়েই গর্ব করুক।” (১করিন্থীয় ১ অধ্যায় ৩০ থেকে ৩১)।