দিন চলে না গাইবান্ধার বাগুড়িয়ার আলোচিত এক টাকার মাস্টার লুৎফর রহমানের। শিক্ষার্থীদের দেওয়া ১ টাকার ওপর নির্ভরশীল দেশের এ ব্যতিক্রমী মাস্টারের জীবন থমকে যাওয়ার অবস্থা। টাকার অভাবে তার এখন কোনোরকমে চলছে নুন-মরিচের পান্তায়। এক টাকায় পড়ান বলেই গ্রামে গ্রামে তার নাম ছড়িয়ে পড়েছে ১ টাকার মাস্টার হিসাবে।
বাগুড়িয়ার পল্লি চিকিৎসক সামসুল ডাক্তার এ প্রতিবেদককে বলেন, আমাদের এলাকায় এক টাকার মাস্টার খুব জনপ্রিয় মানুষ। তিনি দীর্ঘদিন গরিব মানুষের সন্তানদের পড়ালেখা শেখান। সদর উপজেলার ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে বাগুড়িয়া গ্রামে বসবাস করেন লুৎফর মাস্টার। এর আগে ফুলছড়ির উড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন তিনি। স্বাধীনতার আগে ব্রহ্মপুত্র নদী তার ঘরবাড়ি, জমিজমা ভেঙে নিয়ে যায়। এরপরও তিনি অতিকষ্টে ১৯৪৮ সালে গুনভড়ি স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। অভাব-অনটনে তিনি পড়ালেখায় এগোতে পারেননি।
১৯৭২ সালে বন্যায় দ্বিতীয়বার বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়ে গেলে তিনি কয়েকটি টিন নিয়ে এসে বাগুড়িয়া বাঁধের জায়গায় ঠাঁই নেন। তখন তার স্ত্রী, ২ ছেলে ও ১ মেয়েসহ ৫ জনের সংসার। তাদের খাবার জোগাতে তিনি শহরের ব্রিজ রোডে একটি কাপড় ধোলাইয়ের দোকানে আয়রনম্যান হিসাবে কাজ করতে থাকেন। কয়েক বছর পর বুঝতে পারেন এ টাকায় তার সংসার চলবে না। তাই এ কাজ বাদ দিয়ে গ্রামের প্রাইমারি স্কুল পর্যায়ের দরিদ্র ও নদীভাঙনের শিকার শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়ানো শুরু করেন। এক সময় তিনি কয়েক জায়গায় প্রাইভেট পড়ানো শুরু করেন। কিন্তু গ্রামের দরিদ্র মানুষের সন্তানদের পড়ালেখা শিখিয়ে যা আয় হয় তাতেও তিনবেলা খাবার জোটে না। কারণ প্রাইভেট পড়িয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে প্রতিদিন ১ টাকা করে নেন। কোনোদিন ৫ জায়গায় প্রাইভেট পড়ানো থেকে আসে এক-দেড়শ টাকার মতো। কোনো কোনো শিক্ষার্থী তাকে ১ টাকাও দিতে পারে না।
এরপরও লুৎফর রহমান জানান, তিনি শিশুদের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে চান। পয়সার জন্য গরিব ঘরের ছেলেমেয়ের পড়ালেখা হবে না, তা হতে পারে না। সেই কাকডাকা ভোর থেকে তার পড়ানো শুরু হয়। স্কুলের ঝরে পড়া ও পিছিয়ে পড়া দরিদ্র শিক্ষার্থীদের নিয়ে ভাষারপাড়া, চন্দিয়া, খোলাহাটি, সৈয়দপুর ও বাগুড়িয়া গ্রামের নদীর তীরে ৫টি কেন্দ্রে পড়ানোর স্থান হিসাবে বেছে নিয়েছেন তিনি। মাটিতে চট বিছিয়ে চারপাশে গোল হয়ে বসে শিক্ষার্থীরা। তিনি এক কোণে বা মাঝখানে বসে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা দেখিয়ে দেন। এ ৫টি স্থানে প্রায় ১০০ শিক্ষার্র্থী পড়িয়ে ১ টাকা হিসাবে মোট ১০০ টাকা আয় হয় তার। এ টাকায় তার সংসারে চাল-ডালের জোগান হয়। কষ্টেশিষ্টে চলে তার সংসার। লুৎফর মাস্টারের স্ত্রী লতিফুন বেগম জানান, বড় ছেলে মোরশেদুল ইসলাম বিয়ে করে আলাদা থাকেন। আরেক ছেলে শশিউর রহমানকে মাদ্রাসায় ভর্তি করে দিয়েছেন। এক টাকার মাস্টারের এক সময়ের ছাত্র জাহেদুল ইসলাম একটা কলেজে চাকরি করেন। তিনি বলেন, স্যার এখন বিপাকে আছেন। তার হাতে টাকা-পয়সাও নেই। অতিরিক্ত গরমে এক টাকার মাস্টারের স্কুল বন্ধ। তাই প্রতিদিন যে টাকা আসত সেটাও বন্ধ। তিনি খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছেন।
মাস্টার লুৎফর রহমান বলেন, আলুভর্তা দিয়ে পান্তা খেয়ে আর কতদিন থাকা যায়? এছাড়া কোনোদিন তাও জোটে না। ধারদেনা করে খাবার জোগাড় হয়। আমার ছাত্রদের কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, পুলিশ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু আমার মতো এক টাকার মাস্টারের কিছুই হয়নি।