বাংলা চলচ্চিত্রের ‘মিয়াভাই’খ্যাত অভিনেতা ফারুক। তিনি শুধু একজন অভিনেতাই নন, বীর মুক্তিযোদ্ধাও। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে ছয় দফা আন্দোলনে যোগ দেন এ অভিনেতা। ঊনসত্তরের গণআন্দোলন, সত্তরের নির্বাচন ও ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর ডাকে অংশগ্রহণে কোনো রক্তচক্ষু তাকে আটকে রাখতে পারেনি। চলচ্চিত্রে আসার কারণ হিসেবে এই কিংবদন্তি অভিনেতা বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে বলেন, ছাত্রলীগ করার কারণে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার আমার বিরুদ্ধে ৩৭টি হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করে। এসব মামলা থেকে বাঁচতে বন্ধুবান্ধবের পরামর্শে চলচ্চিত্রে আসি। বঙ্গবন্ধুও আমাকে সিনেমা করার জন্য বলেন। অভিনয়ের জন্য ঢাকায় সিনেমায় গ্রামীণ পটভূমির গল্পে তার সমকক্ষ্য কেউ ছিলেন না।
১৯৮৭ সালে মিয়া ভাই চলচ্চিত্রের সাফল্যের পর তিনি চলচ্চিত্রাঙ্গনে মিয়া ভাই হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ২০১৬ সালে আজীবন সম্মাননায়ও ভূষিত হয়েছেন। ক্যারিয়ারের ৮ নম্বর ছবি ‘লাঠিয়াল’ (১৯৭৫) দিয়ে এ অভিনেতা ব্যাপকভাবে দর্শকের মাঝে জনপ্রিয়তা লাভ করেন। তবে এইচ আকবর পরিচালিত ‘জলছবি’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে ঢাকাই সিনেমায় তার অভিষেক। প্রথম সিনেমায় তার বিপরীতে ছিলেন কবরী। পরবর্তীতে এ জুটির ‘সারেং বউ’, ‘সুজন সখী’, ‘দিন যায় কথা থাকে’সহ আরও কিছু সিনেমা সে সময় দারুণ জনপ্রিয়তা পায়।কবরীর বাইরে শাবানা, ববিতা, রোজিনা, সুচন্দা, অঞ্জনা ও সুনেত্রাসহ আরও অনেকের সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করেন। তার অভিনীত সিনেমার সংখ্যা প্রায় শতাধিক। ১৯৮০ সালে ‘সখী তুমি কার’ ছবিতে শাবানার বিপরীতে শহুরে ধনী যুবকের চরিত্রে অভিনয় করে সমালোচকদের প্রশংসা লাভ করেন। এছাড়া ববিতার সঙ্গে প্রায় ত্রিশটির মতো সিনেমা তাকে দেখা যায়। এ জুটি ‘আবার তোরা মানুষ হ’, ‘গোলাপি এখন ট্রেনে’, ‘নয়নমণি’, ‘আলোর মিছিল’, ‘লাঠিয়াল’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘মিয়াভাই’সহ ৩০টির বেশি ছবিতে কাজ করেছেন। সেসবের মধ্যে বহু সিনেমাই ছিল সুপারডুপার হিট। একইরকম রোজিনার সঙ্গে জুটি বেঁধেও প্রায় ২০টির মতো সিনেমা তিনি উপহার দেন। তার মধ্যে ‘হাসু আমার হাসু’, ‘মান অভিমান’, ‘সুখের সংসার’, ‘সাহেব’, ‘শেষ পরিচয়’ ও ‘চোখের মণি’।
অভিনয়ের বাইরে সিনেমার উন্নয়নের জন্যও তিনি কাজ করেছেন। কয়েক বছর আগে চলচ্চিত্রের ১৮ সংগঠন নিয়ে ঘটিত চলচ্চিত্র পরিবারের আহ্বায়ক তিনি। চলচ্চিত্রে এক সময় যখন ধস নামে তখন সবার আহ্বানে চলচ্চিত্রকে বাঁচাতে তিনি পরিবেশক সমিতির নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিপুল ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং চলচ্চিত্রের অন্য সংগঠনগুলোকে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে নানা পদক্ষেপ নিয়ে এই ধস দূর করেন। এছাড়া চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি। এ সমিতি প্রতিষ্ঠা করলেও নিজে এর সভাপতি না হয়ে নায়করাজ রাজ্জাককে তিনি সভাপতি হতে প্রস্তাব রাখেন। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি রাজনীতিতেও সমানভাবে সক্রিয় ছিলেন। ১১তম সংসদ নির্বাচনে ঢাকা ১৭ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন।
আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকটি অঙ্গ সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতিও ছিলেন তিনি। গেল ১৫ মে সোমবার মৃত্যুবরণ করেন তিনি। সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সর্বশেষ ২০২১ সালের ৪ মার্চ নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য সিঙ্গাপুরে যান তিনি। সে সময় পরীক্ষায় রক্তে সংক্রমণ ধরা পড়ে। এর পর থেকেই শারীরিকভাবে অসুস্থতা অনুভব করছিলেন অভিনেতা। চিকিৎসকের পরামর্শে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। হাসপাতালে ভর্তির কয়েকদিন পর তার মস্তিষ্কেও সংক্রমণ ধরা পড়ে। সেখানে তার চিকিৎসা চলছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা ব্যর্থ হয়।
১৯৪৮ সালের ১৮ আগস্ট ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন ফারুক। তার জন্ম হয় ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওরে। তবে তিনি মানিকগঞ্জের ঘিওরে জন্মগ্রহণ করলেও বেড়ে উঠেছেন পুরান ঢাকাতে। তিনি পুরান ঢাকার অলিতে-গলিতে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন শৈশবে। এ অভিনেতার পুরো নাম আকবর হোসেন পাঠান দুলু, ডাক নাম দুলু ও মিয়াভাই।