চট্টগ্রামে বিদ্যুতের লোডশেডিং জনজীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। চট্টগ্রামে বিদ্যুতের দৈনিক বরাদ্দ নিয়ে বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। লোডশেডিংয়ের কারণে মানুষ নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে। দিনের চেয়ে রাতে লোডশেডিং বেশি হচ্ছে। চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে চাহিদা থেকে প্রায় ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হয়ে থাকে। কিন্তু লোডশেডিং করা হচ্ছে দৈনিক ৩০০ মেগাওয়াটের বেশি। এতে চট্টগ্রামে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে নিয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রামে লোডশেডিং বেড়েছে। শহরের চেয়ে গ্রামের অবস্থা আরো খারাপ। টানা কয়েক ঘণ্টার লোডশেডিং করা হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের কারণে বাজারে প্রতিটি আইপিএসের দাম ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা বেড়ে গেছে।
প্রচণ্ড দাবদাহের মধ্যে বিদ্যুতের লোডশেডিং জনজীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। দিনের চেয়ে রাতে লোডশেডিং বেশি করা হচ্ছে। সন্ধ্যার পর থেকে রোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়ে যায়। রাত ১২টার পর থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত একাধিক বার লোডশেডিং করা হচ্ছে। এতে মানুষ ঘুমাতে পারছে না। এখন এসএসসি পরীক্ষা চলছে। লোডশেডিংয়ের কারণে পরীক্ষার্থীদের পড়ালেখা মারাত্মক ভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, লোডশেডিং নিয়ে তাদের কোনো হাত নেই। লোড ডেসপাস থেকে যেভাবে বরাদ্দ পাচ্ছে তা বিতরণ করছেন। লোডশেডিং নিয়ে আগাম কোনো সময় নির্ধারণ করা হয় না। ফলে যখনই লোডশেডিং করতে বলা হচ্ছে তখন বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের কন্ট্রোল রুম থেকে বিভিন্ন ফিডারে লোডশেডিং করা হচ্ছে।
পিডিবির সাব স্টেশনের কর্মকর্তারা জানান, রাতের লোডশেডিং নিয়ে মানুষ বেশি অভিযোগ করছে। মানুষের নিদ্রা ব্যাহত হচ্ছে। সারা দিন মানুষ পরিশ্রম করে রাতে ঘুমাতে পাচ্ছে না। একের পর এক ফোন করছেন গ্রাহকরা। গ্রাহকদের মন্দ কথা শুনতে হচ্ছে। নগরীর ঘাসিয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা স্কুলশিক্ষক আলী হোসেন জানান, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৩টায় বিদ্যুৎ চলে যায়। আসে এক ঘণ্টা পর। ভোর ৬টায় আবার চলে যায় বিদ্যুৎ। এতে রাত সাড়ে ৩টায় ঘুম ভেঙে আর ঘুম হয়নি। চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার বাসিন্দা প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইকবাল জানান, রাত ১২টার পর লোডশেডিং মানুষকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। রাত ২/৩টার পর লোডশেডিং হলে মানুষ কীভাবে ঘুমাবে।
চট্টগ্রাম, তিন পার্বত্য জেলা ও কক্সবাজার জেলা নিয়ে পিডিবি চট্টগ্রাম জোন গঠিত। পিডিবি চট্টগ্রামের সেন্ট্রাল কন্ট্রোল রুম থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, চট্টগ্রামে বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা ১ হাজার ৪০১ মেগাওয়াট। চট্টগ্রামে সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে দৈনিক বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ১ হাজার ৩২৬ মেগাওয়াট। জাতীয় গ্রিড থেকে ১০১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বরাদ্দ নিয়ে চট্টগ্রামে বিতরণ করা হচ্ছে। পিডিবির হিসাবে চট্টগ্রাম জোনে গত মঙ্গলবার ১২৪ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়েছে। কিন্তু লোডশেডিংয়ের ভয়াবহতা দেখে পিডিবির তথ্যের সঙ্গে বাস্তবে মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তারা তথ্য গোপন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পিডিবি চট্টগ্রাম জোনের প্রধান প্রকৌশলী (বিতরণ) মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, জাতীয়ভাবে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে। এতে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়েছে। লোডশেডিং নিয়ে আমাদের কোনো হাত নেই। বরাদ্দ যখন যা পাচ্ছি, বিতরণ করছি। রাতে দিনে যখনই লোডশেডিং করতে বলা হচ্ছে তখনই লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম জেলায় তিনটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিতরণ করা হয়। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ সরওয়ার জাহান বলেন, আমাদের সমিতির এলাকায় বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা ১০৫ মেগাওয়াট। আমরা মদুনাঘাট, হাটহাজারী ও চন্দ্রঘোনা গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নিয়ে থাকি। গ্রিড থেকে যা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে তা বিতরণ করা হচ্ছে। প্রতি ঘণ্টায় বরাদ্দ বাড়ানো কমানো হচ্ছে। এতে লোডশেডিংয়ের সময় নির্ধারণ করা যাচ্ছে না।
বিদ্যুতের লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় মানুষের মধ্যে আইপিএসের চাহিদা বেড়েছে। নগরীর দোকানগুলোতে চড়া দামে আইপিএস বিক্রি হচ্ছে। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বাজারে ভালো মানের আইপিএসের সংকট দেখা দিয়েছে। কোম্পানিগুলো চাহিদা অনুপাতে যথাসময়ে সরবরাহ দিতে পারছে না। প্রতিটি আইপিএসের ব্যাটারি ও মেশিনে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সুযোগে বাজারে নিম্নমানের আইপিএস মেশিন ও ব্যাটারি কিনে মানুষ প্রতারিত হচ্ছে। একটি আইপিএসের ব্যাটারি ১ থেকে দেড় বছরের বেশি ওয়ারেন্টি দেওয়া হয় না। নগরীর কাপাসগোলা এলাকার আইপিএস ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, লোশেডিংয়ের কারণে আইপিএসের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়েছে। ব্যাটারি ও মেশিনে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা বেড়েছে। ভালো মানের আইপিএসের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। নষ্ট একটি ব্যাটারি আগে ৫ হাজার টাকার বেশি বিক্রি হতো না। এখন নষ্ট ব্যাটারি ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।